শান্তনু, সীমন্তিনী আর দ্বৈপায়ন পলাশের নির্দেশমতো কয়েক পা দুরে সরে গেল।
পলাশ কোনওরকমে উঠে দাঁড়াল। মিমোকেও টান মেরে দাঁড় করাল। ছুরিটা ওর ডান চোয়ালের নীচে গলায় সামান্য চাপ দিয়ে বসানো। ছুরির ধারালো ডগার চাপে গলার নরম চামড়া কেটে গিয়ে রক্তের বিন্দু দেখা যাচ্ছে।
পলাশ পাগলের মতো ভয়ঙ্কর উদভ্রান্ত চোখে ওদের চারজনকে একে-একে দেখে নিল। চশমা না থাকায় মুখগুলো ঝাপসা দেখাচ্ছে, তবে এ ছাড়া আর কোনও অসুবিধে হচ্ছে না।
বাসন্তীকে লক্ষ করে খিঁচিয়ে উঠল পলাশ, দরজায় খিল-ছিটকিনি ভালো করে এঁটে দে। যে-কেউ হাজার ডাকলেও দরজা খুলবি না।
বাসন্তী ভয়ে ঝাঁকিয়ে উঠে ছুটে গিয়ে দরজার খিল আর ছিটকিনি ভালো করে এঁটে দিল।
দ্বৈপায়নের দিকে আঙুল তুলে শান্তনুর দিকে তাকিয়ে পলাশ জানতে চাইল, এই লোকটা কে? ঠিক-ঠিক জবাব দিবি। নইলে তোর ছেলের ছুটি করে দেব। স্কুলে ওর ক্লাসে একটা সিট খালি হয়ে যাবে।
শান্তনু হোঁচট খাওয়া গলায় বলল, ও দ্বৈপায়ন–আমাদের সামনের ফ্ল্যাটে থাকে।
মিমোর চুলের মুঠি ধরে পলাশ ওকে টেনে নিয়ে গেল একটা শো-কেসের কাছে। নিষ্ঠুরভাবে মাথাটা ঠুকে দিল শো-কেসের গায়ে। তারপর শান্তনুর দিকে তাকিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠে দাঁতে দাঁত ঘষে বলল, সত্যি করে বল, এই লোকটা কে! পলাশ তখনও হিংস্রভাবে বাচ্চাটার চুলের মুঠি ধরে রয়েছে। চোখে পাগলের মরিয়া দৃষ্টি।
সীমন্তিনী কেঁদে উঠে ভাঙা জড়ানো গলায় সব বলল পলাশকে। বারবার করে অনুরোধ করল, আপনি যা বলবেন তা-ই শুনব। বাচ্চাটাকে ছেড়ে দিন প্লিজ।
ছেড়ে দেব! ও হল আমার ফিক্সড ডিপোজিট। মিমোর চুলের মুঠি ছেড়ে দিয়ে ওকে আঁকড়ে ধরল পলাশ। তারপর দ্বৈপায়নের দিকে তাকিয়ে বলল, হিরো, ওই ফ্লেক্সিবারটা আমার দিকে ছুঁড়ে দে।
দ্বৈপায়ন চুপচাপ কথা শুনল। বারটা আলতো করে ছুঁড়ে দিল পলাশের পায়ের কাছে।
এমন সময় দরজায় কলিং বেল বেজে উঠল।
আচমকা কলিং বেলের শব্দে ওরা সবাই চমকে উঠল।
কোনও শালাকে ফ্ল্যাটে ঢোকাবি না! চাপা গর্জন করল পলাশ, সীমাসুন্দরী, তুমি শিগগির যাও দরজা না খুলে চেঁচিয়ে যা-হোক বলে উটকো পাবলিককে ফোটাও। জলদি! কুইক!
দরজার কাছে যাওয়ার আগে ছেলের দিকে একবার তাকাল সীমা। চোখ-মুখের কী অবস্থা হয়েছে ওর! ভয়ে যেন ঠান্ডা পাথর হয়ে গেছে। কান্নার একটা ভাঙা টুকরো বেরিয়ে এল সীমার গলা চিরে। ও দরজার কাছে গিয়ে ডেকে উঠল, কে?
মিসেস সেনগুপ্ত, আপনাদের ফ্ল্যাটে কোনও গোলমাল হয়েছে নাকি?
গলাটা চেনা-চেনা মনে হল সীমার। চারতলার মিস্টার সিনহা হতে পারেন।
ও যতটা সম্ভব স্বাভাবিক গলায় চেঁচিয়ে বলল, না, না,–সেরকম কিছু না। আমাদের নিজেদের ব্যাপার।
ও, আচ্ছা। ঠিক আছে। যা হোক করে একটু মানিয়ে-টানিয়ে নিন।
দরজার ওপারে আর কোনও সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না।
পলাশ ছুরিটা বাঁ হাতে চালান করে দিয়ে ফ্লেক্সিবারটা ডান হাতের শক্ত মুঠোয় তুলে নিয়েছিল। ছুরিটা মিমোর বাঁ চোয়ালের নীচে চেপে ধরে ও দ্বৈপায়নকে এবার কাছে ডাকল– ঠিক যেভাবে লোকে পোষা কুকুরকে ডাকে ও আ যা, মেরে হিরো, আ যা! আঃ, তু তু তু…।
রোলার স্কেটস পরা পায়ে মেঝেতে শব্দ করে কয়েক পা এগিয়ে এল দ্বৈপায়ন। ও পলাশের চোখে তাকিয়ে বুঝতে চাইছিল পাগল খুনিটা ঠিক কী করতে চায়।
এবার মেঝেতে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়! কুইক! কড়া গলায় হুকুম দিল পলাশ, নইলে এই ছোঁড়াটাকে খালাস করে দেব। নে, শুয়ে পড়, জলদি!
স্কেকট পরা পায়ে শুয়ে পড়তে একটু অসুবিধে হল বটে কিন্তু দ্বৈপায়ন মুখ বুজে পলাশের কথা মেনে নিল। অবশ্য না মেনে কোনও উপায়ও ছিল না।
উপুড় হয়ে শুয়ে ও ভাবতে লাগল প্রথম আঘাতটা ঠিক কীভাবে আসবে। আচ্ছা, ইন্সপেক্টর বিজয় মিত্র কি ওর দেওয়া ইমারজেন্সি মেসেজটা পেয়েছেন? ওঁরা খবর পেয়ে আসবেন তো?
শালা, শুয়োরের বাচ্চা! মুখ খিস্তি করে মেঝেতে থুতু ছেটাল পলাশ ও থুঃ! তারপরই ফ্লেক্সিবারটা প্রবল বেগে শূন্যে ঘুরিয়ে বসিয়ে দিল দ্বৈপায়নের মাথার পিছনদিকে। প্রচণ্ড সংঘর্ষে ফাইবারের হাতলের একটা অংশ ভেঙে ছিটকে বেরিয়ে গেল।
দ্বৈপায়ন যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠে বোধহয় জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। কিন্তু পলাশের মাথায় তখন খুন চেপে গেছে। এক হাতে মিমোকে জাপটে রেখে অন্য হাতে ও দ্বৈপায়নের শুয়ে থাকা শরীরটাকে পেটাতে লাগল। আর অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করতে লাগল।
সীমন্তিনী চিৎকার করে মারতে বারণ করে ছুটে আসতে চাইছিল, কিন্তু পলাশ দাঁত খিঁচিয়ে মিনোর গলায় আলতো করে ছুরির আঁচড় টেনে দিল। রক্তের রেখা ফুটে উঠল ওর গলায়। আর বাচ্চাটা প্রাণভয়ে মা! মা! বলে চেঁচিয়ে কেঁদে উঠল।
শান্তনু আর সহ্য করতে পারছিল না। ও মনে-প্রাণে জ্ঞান হারাতে চাইছিল। শুকনো খসখসে গলায় ও পলাশকে আর্ত প্রার্থনা জানাল, মিমোকে ছেড়ে দে, ভাই। তুই যা চাস সব নিয়ে নে– ।
পলাশ দ্বৈপায়নকে পেটানো থামিয়ে শান্তনুর দিকে ঘুরে তাকাল। হেঁচকি তুলে খলখল করে হাসল ও দ্যাখ, শালা! ওই হিরো দ্বৈপায়নের দিকে আঙুল দেখাল পলাশ : আর আমি ভিলেন নিজের বুকে হাত ঠুকল এবার : দেখি, হিরোর প্রাণভোমরা বডি ছেড়ে বেরোয় কি না! ফ্লেক্সিবার বাগিয়ে ধরে আবার তৈরি হল পলাশ।
