পলাশ সেই অবস্থাতেই বাচ্চাটার চুলের মুঠি চেপে ধরল। আর মিমো গোঙানির মতো একটা চাপা চিৎকার করে কামড় বসিয়ে দিল পলাশের পেটে।
যন্ত্রণায় ঝাঁকিয়ে উঠল পলাশ। মিমোকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হল। মিমো ছাড়া পেয়েই কোনওরকমে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ছুট লাগাল মায়ের দিকে। সীমন্তিনী ওকে পাগলের মতো জাপটে ধরল। কাঁদতে কাঁদতেই ওর কপালে-গালে-মাথায় চুমু খেতে লাগল। আর বারবার বলতে লাগল, বাবুসোনা, তোর লাগেনি তো! বাবুসোনা, তোর লাগেনি তো!
দ্বৈপায়নের কাজ তখনও শেষ হয়নি। ও ফ্লেক্সিবারটাকে লাঠির মতো ব্যবহার করতে লাগল। ধোপারা যেভাবে মুগুর পিটিয়ে কাপড় কাঁচে, ও ফ্লেক্সিবার দিয়ে পলাশকে সেভাবে কাচতে লাগল।
এত হইচই চেঁচামেচিতে বাসন্তী আবার ড্রইং স্পেসে চলে এসেছিল। মিমোর হাতে রক্ত দেখে ও কেঁদে ফেলল। শান্তনু মিমোর কাছে এসে ওর হাতটা পরীক্ষা করে বুঝল, মিমোর কিছু হয়নি। পলাশের রক্ত ওর গায়ে লেগেছে।
ওরা চারজন এক জায়গায় জড়ো হয়ে দ্বৈপায়নের কীর্তি দেখছিল। ওর ইস্পাতের মতো দেহটা নমনীয় হয়ে যেভাবে খুশি বেঁকে যাচ্ছিল, আর পলাশকে আড়ং ধোলাই দিচ্ছিল। কখনও ওর হাত চলছিল, কখনওবা পা। রোলার স্কেটস-এর এইরকম অমানুষিক অপব্যবহার কেউ কোনওদিন কল্পনাও করেনি।
পলাশের সারা শরীরে রক্ত। পোশাক-আশাক নানা জায়গায় ছিঁড়ে গেছে। ওর অসাড় দেহটা একতাল কাদার মতো টিভি-র কাছে পড়ে আছে। কান্না ও যন্ত্রণা মেশানো একটা চাপা গোঙানি বেরিয়ে আসছে ওর মুখ থেকে। শুধু তাতেই বোঝা যাচ্ছে ও এখনও খতম হয়নি।
দ্বৈপায়ন বোধহয় পাগল হয়ে গিয়েছিল। ওর মাথার ভেতরে আগুন জ্বলছিল। সীমা আর মিমোকে যে গায়ে আঁচড় কাটে দ্বৈপায়নের হাতে তার নিস্তার নেই।
রাস্তায় মোটর বাইক রেখে বাড়িতে ঢোকার সময় ও শক্তিমানের ছবিটা দেখতে পায়। ও অবাক হয়ে ওটা হাতে তুলে নিয়েছিল। এটা রাস্তায় ফেলে দিল কে? চোখ তুলে সীমাদের ফ্ল্যাটের জানলার দিকে তাকিয়েছিল দ্বৈপায়ন। সীমা কি মিমোর ওপর চটে গেছে? না কি অন্য কোনও বিপদ দেখা দিয়েছে সেখানে? যে-ছবিটা গুটের প্রাণ সেটা কেন অবহেলায় রাস্তায় পড়ে আছে?
শক্তিমানের ছবিটা হাতে নিয়ে ওপরে উঠে এসেছিল দ্বৈপায়ন। তারপর ফোন করেছিল শান্তনুদের ফ্ল্যাটে। ফোনের ঘন্টি বেজেই চলল, কিন্তু কেউ ফোন ধরল না। অথচ দ্বৈপায়ন স্পষ্ট দেখেছে, ওদের ফ্ল্যাটে আলো জ্বলছে।
দ্বৈপায়নের সন্দেহটা ক্রমশ গাঢ় হচ্ছিল। ওর মাথার ভেতরে ব্যাগাটেলির গুলি দৌড়তে শুরু করল। কী করা উচিত এখন?
কয়েকমিনিট ধরে নানান চিন্তা করার পর দ্বৈপায়ন লালবাজারে বিজয় মিত্রের দেওয়া ফোন নম্বরে ফোন করেছে। বিজয় মিত্রের নামে ইমারজেন্সি মেসেজ দিয়ে দিয়েছে আর-একজন অফিসারের কাছে। তারপর আবার ভাবতে বসেছে। শান্তনুদের ফ্ল্যাটে গিয়ে কি ও নক করবে? নাকি আগেভাগেই শোরগোল তুলে ফ্ল্যাটের দরজা ভেঙে ফেলবে? কিন্তু তারপর যদি দ্যাখে যে, সেরকম কিছুই হয়নি!
এইরকমের বহু উলটোপালটা চিন্তার পর শেষ পর্যন্ত দ্বৈপায়ন যা ভালো বুঝেছে তাই করেছে।
সীমন্তিনী আর শান্তনুর চিৎকারে দ্বৈপায়নের ঘোর কাটল। সীমা ছুটে এসে ওর হাত চেপে ধরলঃ ঢের হয়েছে, দিপু! আর না। এবার থামো। লোকটা বোধহয় মরেই গেছে।
দ্বৈপায়ন থামল। ফ্লেক্সিবারে লাঠির মতো ভর দিয়ে ও হাপরের মতো হাঁপাতে লাগল। একটু দম নিয়ে বলল, লালবাজারে ফোন করে দিয়েছি। ওরা এখুনি হয়তো এসে পড়বে। এই লোকটাকে এখানে আটকে রেখে তোমরা আমাদের ফ্ল্যাটে চলো–
সীমার সঙ্গে-সঙ্গে মিমোও চলে এসেছিল দ্বৈপায়নের কাছে। দ্বৈপায়ন ওকে হাত বাড়িয়ে কাছে টেনে নিল। এক হাতে বাচ্চাটাকে জড়িয়ে ধরে বলল, গুটে, তোর আর কোনও ভয় নেই…।
বাচ্চাটা দ্বৈপায়নের কোমরের কাছে মুখ গুঁজে রইল। একটু পরে আড়চোখে তাকাল নিশ্চল হয়ে পড়ে থাকা পলাশের দিকে। ইতস্তত করে বলল, এই…এই লোকটা মা-মার্ডারার?
দ্বৈপায়ন হেসে বলল, হ্যাঁ, মার্ডারার।
কাল সকালে আমাকে রোলার এস্কেট শেখাবে তো?
হ্যাঁ, শেখাব। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল দ্বৈপায়ন।
ঠিক সেই মুহূর্তে বাসন্তী চাপা চিৎকার করে উঠল। কারণ, পলাশের নড়াচড়া ও প্রথম লক্ষ করেছে।
শান্তনুও ব্যাপারটা দেখেছিল, কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে।
পলাশ মেঝেতে দেড় পাক গড়িয়ে চোখের পলকে চলে এল মিমোর কাছে। ওর পা ধরে এক প্রচণ্ড হ্যাঁচকা মারল। দ্বৈপায়নের আলতো বাঁধন ছিঁড়ে মিমো শব্দ করে আছড়ে পড়ল মেঝেতে। চিতাবাঘ যেভাবে হরিণ ধরে, পলাশ সেইরকম হিংস্র ক্ষিপ্র ঢঙে মিমোকে এক টান মেরে নিয়ে এল নিজের কাছে। তারপর, মেঝেতে শোওয়া অবস্থাতেই, ও কোথা থেকে যেন বের করে নিল লুকোনো ছুরিটা। অমানুষের মতো নিষ্ঠুরভাবে ওটার বাঁকানো ফলা মিমোর গলায় চেপে ধরল। ফাঁসফেঁসে চাপা গলায় খেঁকিয়ে উঠল, সবাই দূরে সরে যা। কেউ চেঁচাবি না। তা হলে সত্যি-সত্যি এটার গলা কেটে দেব।
পলাশকে বীভৎস দেখাচ্ছিল। মুখের নানা জায়গায় রক্তের ছোপ। জামাকাপড় বিধ্বস্ত। চশমা না থাকায় চোখ দুটো কেমন অচেনা লাগছে। আর মিমো কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গেছে।
নতুন করে ভয় আর আশঙ্কা নেমে এল ঘরের ভেতরে।
