…জোনেক্স কোম্পানির রোলার স্কেটস একেবারে চ্যাম্পিয়ান। এই মডেলটার দাম সাতশো পঞ্চাশ টাকা, তবে আমরা এখন একটা স্পেশাল ডিসকাউন্ট দিচ্ছি–দুশো টাকা। মানে, এখন নিলে সাড়ে পাঁচশো পড়বে। এটা মিস্টার সেনগুপ্তও পরতে পারবেন…। বলে শান্তনু আর পলাশের দিকে ধন্দের চোখে তাকাল ও। যেন বুঝতে চাইছে, কে মিস্টার সেনগুপ্ত।
সীমার বড়-বড় শ্বাস পড়ছিল। পলাশের শক্ত মুঠোয় ধরা ছুরিটার কথা ও ভোলেনি। দিপু তো ছুরিটার কথা জানে না! কী হবে এখন?
এইসব উথালপাথাল ভাবনার মধ্যেও দ্বৈপায়নের কথাগুলো ওর কানে ঢুকল। ও তাড়াতাড়ি বলে উঠল, ইনি হলেন শান্তনু সেনগুপ্তআমার হাজব্যান্ড। আর ইনি আমাদের গেস্ট–পলাশ সান্যাল। আর ও অচ্যুতকে দেখাল সীমা ও আমাদের ছেলে-অচ্যুত। রোলার স্কেটসটা আমরা ওর জন্যেই চেয়েছি।
দিপুদাকে আচমকা ঘরে ঢুকতে দেখে গুটের মনটা নেচে উঠেছিল। কিন্তু কেমন একটা চাপা ভয় ওকে পাথর করে রেখেছিল। বারবার হেঁচকি মতন উঠছিল। মনে হচ্ছিল, ভেতর থেকে কেউ যেন গলা টিপে ধরেছে।
এখন অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল বাচ্চাটা। দ্বৈপায়ন শুধু ওর দিকেই নজর রাখছিল। শান্তনু আর সীমন্তিনী হয়তো ওর অভিনয়ের ব্যাপারটা বুঝতে পারবে, কিন্তু গুটে? গুটে যদি হঠাৎ দিপুদা! বলে চেঁচিয়ে ওঠে তা হলেই সর্বনাশ! সেইজন্য বেশ ভয়ে ভয়ে বাচ্চাটাকে দেখছিল দ্বৈপায়ন। ও যদি হঠাৎ–।
গুটে কিছু একটা বলার জন্য সবে হাঁ করতেই দ্বৈপায়ন বিচ্ছিরিভাবে ওকে ধমকে উঠল, একদম চুপ! তারপর ঠোঁটে আঙুল ছুঁইয়ে ওকে চুপ করে থাকতে ইশারা করল।
গুটে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে চুপ করে গেল। ওর চোখে জল চলে এল আবার।
পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য দ্বৈপায়ন মোলায়েম হেসে নরম গলায় বলল, রাগ কোরো না, অচ্যুত। ডিমনস্ট্রেশান দেওয়ার সময় কেউ কথা বললে আমাদের একটু অসুবিধে হয়। সবকিছু মুখস্থ-টুখস্থ করে আমরা তো তৈরি হয়ে আসি, কেউ ডিসটার্ব করলে সেগুলো কেমন গুলিয়ে যেতে চায়। দাদা, বউদি আপনারা কিছু মাইন্ড করবেন না…প্লিজ! আমার বলা হয়ে যাক, তারপর আপনারা যত খুশি প্রশ্ন করবেন।
ফ্লেক্সিবারটা হাতে নিয়ে দ্বৈপায়ন সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। ঘরের মেঝেতে স্কেটস করে ও এপাশ-ওপাশ সামান্য ঘুরে-ফিরে বেড়াচ্ছিল। সেই অবস্থাতেই শান্তনু আর পলাশকে লক্ষ করে ও যান্ত্রিকভাবে ওর যন্ত্রের গুণগান করতে শুরু করল।
..দেখুন, আমাদের কোম্পানি কখনও লো কোয়ালিটির প্রোডাক্ট বিক্রি করে না। এই যে স্কেস দেখছেন, এর চেসিসগুলো স্টিলের তৈরি, আর চাকাগুলো ইমপোর্টেড। স্কেস-এর চাকাই হল আসল। চাকা একবার নষ্ট হয়ে গেলে আর রিপ্লেস করা যায় না। তখন নতুন স্কেস কিনতে হয়–একজোড়া। কারণ, সিঙ্গল স্কেট পাওয়া যায় না সবসময় পেয়ারে সাপ্লাই আসে।
কথা বলতে বলতে চাকা গড়িয়ে ঘরের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছিল দ্বৈপায়ন। এইবার ও ফ্লেক্সিবারটা তুলে ধরল।
এটার নাম ফ্লেক্সিবার। এটাও আপনারা দারুণ সিলেক্ট করেছেন। এটা মুম্বইয়ের স্ম্যাশ কোম্পানির প্রোডাক্ট। আমরা মাত্র বছরখানেক এজেন্সি নিয়ে দুর্দান্ত রেসপন্স পেয়েছি। দু-পাশের এই হাতল দুটো শক্ত করে চেপে ধরে বারটাকে বেঁকাতে হয়…। দ্বৈপায়ন দু-পাশের হাতল ধরে আড়াই ফুট মতন লম্বা বারটাকে বেশ সহজেই বেঁকিয়ে ধরল এইভাবে বেঁকালে বাইসেপ আর ট্রাইসেপ তৈরি হয়। বারটা ছেড়ে দিলেই স্প্রিং-এর অ্যাকশনে ওটা আবার লাঠির মতন সোজা হয়ে যায়। এর বাক্সের ভেতরে ফ্লেক্সিবারের নানারকম ব্যায়ামের চার্ট আছে। ওটা একবার দেখে নিলেই আর কোনও প্রবলেম হবে না। আর হলে আমাদের কোম্পানি তো আছেই। নিন, হাতে নিয়ে একবার টেস্ট করে দেখুন।
ফ্লেক্সিবারের গুণপনার ব্যাখ্যা করতে করতে দ্বৈপায়ন পলাশের কাছে এসে পড়েছিল। পলাশ বেশ বিরক্ত হয়ে বেহায়া সেলসম্যানটাকে দেখছিল। মিমোকে জাপটে ধরে ভাঙা টিভি টার প্রায় গায়েই দাঁড়িয়ে ছিল ও। ভাবছিল, কতক্ষণে আপদ বিদেয় হবে।
কিন্তু দ্বৈপায়ন যে হঠাৎ ওকে আক্রমণ করবে সেটা পলাশ বুঝতে পারেনি।
ফ্লেক্সিবারটা ইউ অক্ষরের মতো কোনো অবস্থায় স্কেটস করে পলাশের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল দ্বৈপায়ন। আচমকা ও বারের একটা দিক ছেড়ে দিল।
স্প্রিং-এর টেনশানে ছিটকে সোজা হয়ে গেল বারটা। ওটার ভারী শক্ত হাতল দ্বৈপায়নের হিসেব মতো পলাশের ডান গালে গিয়ে আছড়ে পড়ল।
বিশ্রী শব্দ হল একটা। পলাশের গাল ফেটে রক্ত বেরিয়ে এল। সংঘর্ষের ধাক্কায় টিভি র দিকে হেলে পড়ল পলাশ। আর সঙ্গে-সঙ্গেই বাস্টার্ড বলে দ্বৈপায়ন ডান পায়ে এক তীব্র লাথি কষাল পলাশের দু-পায়ের ফাঁকে। রোলার স্কেটের ইস্পাতের চেসিস পলাশের শরীরে বোধহয় কেটে বসল। কারণ, পলাশ এইবার যন্ত্রণায় কাতরে উঠল। ও লাট খেয়ে পড়ে গেল মেঝেতে। ওর চশমা ছিটকে পড়ল দূরে।
সীমন্তিনী গলা ফাটিয়ে তীক্ষ্ণ চিৎকার করে উঠল–যে-চিৎকারটা ও এতক্ষণ ধরে প্রাণপণে করতে চেয়েছে কিন্তু পারেনি।
শান্তনু যেন এক অলৌকিক মন্ত্রের জোরে ঘোর কাটিয়ে উঠল। ও মিমো! মিমো! করে আর্ত স্বরে ডেকে উঠল।
পলাশ মিমোকে আঁকড়ে ধরেছিল। তাই ওর শরীরটা বেটাল হয়ে মেঝেতে পড়ে যেতে বাচ্চাটাও একইসঙ্গে কাত হয়ে পড়ল ওর গায়ে।
