আর সীমন্তিনী এক ঝটকায় উঠে দাঁড়াল।
ওর এইরকম আচমকা উঠে দাঁড়ানোয় মিমো ধাক্কা খেয়ে কেমন যেন ঘাবড়ে গেল। শব্দ করে সামান্য কেঁদে উঠে মাকে আরও জোরে আঁকড়ে ধরতে চাইল।
ততক্ষণে কলিংবেল আবার বেজে উঠেছে : টুং-টাং।
কে এসেছে? পুলিশ? সন্ত্রস্তভাবে জানতে চাইল পলাশ। ওর গলার স্বর কেমন যেন ফাসফেঁসে চেরা-চেরা শোনাল।
শান্তনু জিজ্ঞাসার চোখে তাকাল সীমন্তিনীর দিকে। সীমা তখন মরিয়া হয়ে ভাবছে, কে আসতে পারে এই অসময়ে? কে এই দেবদূত? পুলিশ? নাকি অন্য কেউ?
হয়তো বিজয় মিত্র অথবা অমল রায় ফোনে যোগাযোগ করতে চেয়ে পারেননি। তখন নিছকই সন্দেহের বশে চলে এসেছেন শান্তনুদের ফ্ল্যাটে। হয়তো…।
দরজা খোলার জন্য সামনে পা বাড়াল সীমা। সঙ্গে-সঙ্গে পলাশ ওকে চাপা গলায় ধমক দিল, দরজা খুলবে না!
সীমা বিরক্ত হয়ে তাকাল পলাশের দিকে। পলাশের মুখটা কোণঠাসা বাঘের মতো দেখাচ্ছে। এই শীতেও কপালে বিন্দু-বিন্দু ঘাম ফুটেছে।
দরজা না খুললে সন্দেহ হবে। আপনার বিপদ আরও বাড়বে…। ঠান্ডা গলায় বলল সীমা। ও বেশ বুঝতে পারছিল পালটা ভয় না দেখালে পলাশের মতো পাগল খুনিকে রোখা যাবে না। দরজায় যে-ই এসে থাকুক, তাকে পলাশের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে হবে। তা নইলে…।
আবার কলিং বেল বাজল।
সীমা সহজ পায়ে ফ্ল্যাটের দরজার দিকে এগোতেই পলাশ একলাফে মিমোর কাছে চলে এল। জামার কলার ধরে এক হ্যাঁচকায় বাচ্চাটাকে কাছে টেনে নিল। ছুরিটা ডান হাতে নিয়ে ওর কানের পাশে চেপে ধরল। চাপা গলায় হিসহিস করে বলল, যে-ই আসুক তাকে দরজা থেকে কাটিয়ে দাও। তা নইলে বাচ্চাটার গলা…।
সর্বনাশের কাছাকাছি
থাক! বারবার একই ভয় দেখিয়ে বীরত্ব দেখাতে হবে না! ঘেন্নার সুরে পলাশকে বাধা দিল সীমন্তিনী ও আগে দেখি দরজায় কে এসেছে। আমরা স্বাভাবিক ব্যবহার করলে কেউ সন্দেহ করবে না। আপনি যদি উলটোপালটা কিছু করেন তা হলে আমরা কেউই বাঁচব না।
পলাশ ঘাড় গোঁজ করে ভারী গলায় বলল, বি কেয়ারফুল! ভুলে যেয়ো না আমার হাতে কী আছে!
সীমা দরজা খুলে দিল।
এসো আমার দেবদূত! আমার প্রিয়তম দেবতা! আমার পুরুষোত্তম! তুমি এলে সূর্যোদয় হয়। তুমি বিদায় নিলে সূর্যাস্ত। দিনে তোমায় আলোর কিরণ দিয়ে আরাধনা করি, রাতে নিবেদন করি নক্ষত্রমালা। এসো হে প্রাণপুরুষ! এসো আমার অন্তরতম দীপাবলি!
দরজায় হাসিমুখে দাঁড়িয়ে দ্বৈপায়ন।
কিন্তু এ কোন দ্বৈপায়ন!
পেশাদারি সেল্সম্যানের মতো ওর সাজপোশাক। হাতে বড়-বড় কয়েকটা পলিথিনের প্যাকেট। মুখে পাউডার, গলায় টাই, গা থেকে ভুরভুর করে পারফিউমের গন্ধ ভেসে আসছে।
সীমাকে দেখামাত্রই চোখ টিপল দ্বৈপায়ন। তারপর অচেনা সেজে সেল্সম্যানের মিষ্টি মোলায়েম ঢঙে বলল, মিস্টার শান্তনু সেনগুপ্ত আছেন? আমি ফ্যানট্যাসটিক কোম্পানি থেকে আসছি। আপনারা আজ একটু রাত করে আসতে বলেছিলেন। আপনারা যে-দুটো ইন্সট্রুমেন্ট চেয়েছিলেন সে-দুটো দেখানোর জন্যে নিয়ে এসেছি।
রোবটের মতো যান্ত্রিক ঢঙে গড়গড় করে কথা বলে যাচ্ছিল দ্বৈপায়ন। আর একইসঙ্গে দ্রুত নজর বুলিয়ে ঘরের পরিস্থিতি জরিপ করে নিচ্ছিল।
যা বোঝার ও স্পষ্ট বুঝতে পারল। পলাশ সান্যালকে চিনে নিতে ওর কোনও কষ্ট হল না। লোকটা গুটেকে প্রায় খামচে নিজের কাছে ধরে রেখেছে। গুটের চোখ ভেজা। ভেজা চোখে অবাক হয়ে ওর দিপুদাকে দেখছে।
সীমা ইতস্তত করে বলল, আমাদের একজন গেস্ট রয়েছেন–তাই একটু অসুবিধে আছে। পরে কখনও যদি আসেন…।
আপনি নিশ্চয়ই মিসেস সেনগুপ্ত? একগাল হেসে ঘরে ঢুকে পড়ল দ্বৈপায়ন। এমন সহজ ভঙ্গিতে কনুই দিয়ে ঠেলে দরজাটা বন্ধ করে দিল যেন এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাভাবিক কাজ। তারপর ও গেস্ট থাকায় আপনাদের সুবিধেই হবে, ম্যাডাম। আপনারা ওঁর ওপিনিয়ানটাও নিতে পারবেন। আমি বেশিক্ষণ সময় নেব না–মাত্র পাঁচ-সাত মিনিট। এই দেখুন…।
পলিথিনের বড়-বড় প্যাকেট খুলে দুটো জিনিস বের করল দ্বৈপায়ন।
একটা জোনেক্স কোম্পানির রোলার স্কেস-এর বাক্স। আর একটা লম্বাটে আয়তাকার বাক্স যার ওপরে লাল রঙে বড়-বড় হরফে ইংরেজিতে লেখা ফ্লেক্সিবার।
প্রথম বাক্স খুলে একজোড়া রোলার স্কেটস বের করে নিল ও। আর দ্বিতীয় বাক্স খুলে টেনে বের করে নিল লম্বা লাঠির মতো একটা জিনিস। লাঠির দু-প্রান্তে মোটরবাইকের হাতলের মতো ফাইবারের তৈরি দুটো হাতল। আর হাতল দুটোকে জুড়ে রেখেছে কালো রঙের মোটাসোটা একটা লম্বা স্প্রিং।
দ্বৈপায়ন যখন ওর দোকান সাজাচ্ছিল পলাশ তখন মিমোকে নিয়ে পা টিপে টিপে সরে যাচ্ছিল কাচ ভাঙা টিভি-টার কাছে। দ্বৈপায়ন যাতে টিভিটা দেখতে না পায় সেজন্য ওটাকে আড়াল করে দাঁড়াল পলাশ। মনে-মনে ভাবল, হতচ্ছাড়া সেল্সম্যানটা কতক্ষণে এ-ফ্ল্যাট থেকে বিদেয় হবে।
পলাশের চেষ্টা দেখে দ্বৈপায়ন মনে-মনে হাসল। টিভি-র করুণ অবস্থাটা ঘরে ঢোকার সঙ্গে-সঙ্গেই ওর নজরে পড়েছে। কিন্তু কোনওদিকে না দেখার ভান করে দ্বৈপায়ন উবু হয়ে বসে রোলার স্কেটস জোড়া নিজের পায়ের মাপে অ্যাডজাস্ট করতে শুরু করল। তারপর পা ছড়িয়ে বসে ও-দুটো দু-পায়ে শক্ত করে বেঁধে নিল। এসব কাজ করতে করতে একটানা কথা বলে যাচ্ছিল দ্বৈপায়ন।
