কিন্তু তাতে পুরোপুরি পাশ কাটানো গেল না। ওদের কথা শেষ হতেই পলাশ সীমাকে লক্ষ করে প্রশ্ন করল, দিপুদা কে? তোমার ছেলে বলছিল…।
আমার পিসতুতো দিদির ছেলে। বালিগঞ্জে থাকে। নির্বিকারভাবে উত্তর দিল সীমা।
পলাশ এবার আপনমনে হেসে উঠল। এপাশ-ওপাশ মাথা নেড়ে উঠে দাঁড়াল। টিভি তে কোনও একটা বিজ্ঞাপনের চড়া মিউজিক বাজছিল। বিরক্ত হয়ে সেদিকে তাকাল পলাশ। বাঁ-হাতে কপাল টিপে ধরল। তারপর ছুরিটা বাঁ-হাতে নিয়ে ডান হাতে টেবিল থেকে একটা কাপ তুলে নিল। সবাইকে চমকে দিয়ে চাপা গলায় খিস্তি করে টিভি-র পরদা টিপ করে কাপটা গায়ের জোরে ছুঁড়ে মারল।
বিচিত্র শব্দ করে টিভি-র পরদা চুরমার হয়ে গেল। আগুনের ফুলকি দেখা গেল। ধোঁয়া বেরোল টিভি-র ভেতর থেকে। কাপটা নিরীহ বেড়ালছানার মতো অটুট অবস্থায় টিভির খোলের ভেতরে বসে রইল।
পলাশ ওদের দিকে তাকিয়ে বলল, এটা লা পলাশ কাপের বিজ্ঞাপন। তারপর রেডিয়োর বিজ্ঞাপনের মতো সুর করে উচ্চারণ করল, টুং-টুং।
ওদের খুব কাছে এসে দাঁড়াল পলাশ। হাতে হাত ঘষে শান্তনুকে বলল, এবার আমার কথা বলি, শোন। তুই তো জানিস, স্কুলে আমি ভীষণ কম কম নম্বর পেতাম। মাস্টারগুলো এত বজ্জাত ছিল যে, কিছুতেই আমাকে নম্বর দিতে চাইত না। স্কুল থেকে পাশ করে বেরিয়ে যাওয়ার পর আমি একদিন রাতে ঢিল ছুঁড়ে নগেনবাবুর মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিলাম।
শান্তনুর নগেনবাবুকে মনে পড়ল। বেঁটেখাটো গোলগাল চেহারা। ওদের অঙ্কের স্যার ছিলেন। খুব কড়া ধাতের নীতিবাগীশ শিক্ষক ছিলেন। কোনও ছাত্রকেই অন্যায্য নম্বর দিতেন না।
পলাশ চায়ের টেবিলটাকে ঘিরে অলসভাবে পায়চারি করতে শুরু করল। আর একইসঙ্গে নিজের সঙ্গে কথা বলার মতো করে বলতে লাগল, আসলে ব্যাপারটা কী জানিস, কেউ কখনও আমাকে ভালো চোখে দ্যাখেনি। যেমন ধর, তোরা। ছোটবেলা থেকেই আমার কপাল পোড়া। বাবা দিনরাত্তির আমাকে হুকুম করত। আর সেসব কাজ করতে গিয়ে পান থেকে চুন খসলেই আমাকে ধরে বেধড়ক ঠ্যাঙাত। মা চেঁচাত বটে, কিন্তু বাবা মাকে একেবারেই পাত্তা দিত না। সবসময় আমাকে চাকর-বাকরের মতো ট্রিট করত। বলত, তোর দ্বারা কিস্যু হবে না। তোকে কেউ কোনওদিনই পাত্তা দেবে না…।
সিলিং-এর দিকে মুখ তুলে হাসল পলাশ, গুনগুন করে আবৃত্তি করলঃ
ছন্নছাড়া ছিন্ন-ছেঁড়া গাছ পাথরের জীবন–
এই জীবনের পোশাকী নাম মরণ, শুধু মরণ।
তারপর মেঝের দিকে তাকিয়ে তেতো হাসি হেসে হতাশার একটা শব্দ করল : হাঃ! সেই কোন ছোটবেলা থেকে নিজের লাশটা কাঁধে করে ঘুরে বেড়াচ্ছি। কেউ আমাকে আমল দেয় না…অথচ আমি আমল পেতে চাই।
জানিস, শান্তনু, কলেজেও সেই একই কেস হল। কো-এড কলেজে ভরতি হয়েছিলাম। ভেতরে-ভেতরে মেয়েদের জন্যে দারুণ একটা লোভ ছিল। আজেবাজে স্বপ্ন দেখতাম, রাতে বিছানায় শুয়ে-শুয়ে যা-তা ভাবতাম, যা খুশি করতাম। কিন্তু দিনের আলোয় সাহস করে মেয়েবন্ধুদের কিছু বলতে পারতাম না। বহুদিন ধরে মনে-মনে রিহার্সাল দেওয়ার পর রুমকি আর লোপামুদ্রাকে মনের গোপন ইচ্ছের কথা জানিয়েছিলাম। ওরা অবাক হয়ে হি-হি করে হেসে উঠেছিল। বলেছিল, পলাশ, তুই না মাইরি একটা ভোদাই-কিতকিত! তোর বোধহয় মাথা ফাথার ঠিক নেই। হি-হি হি-হি…। চকিতে ঝুঁকে পড়ে টেবিলে জোরালো একটা চাপড় কষাল পলাশ ও ব্যস, সব গল্প শেষ। লোপামুদ্রা আর রুমকি অনেকের সঙ্গেই ইয়ে করত, অথচ শুধু আমার বেলায় বাদ!
ধীরে-ধীরে আমি নিজেকে বদলাতে শুরু করলাম। বুঝলাম, অধিকার চাইলেই পাওয়া যায় না ছিনিয়ে নিতে হয়। তাই ভেতরে-ভেতরে তৈরি হতে লাগলাম। কিন্তু একইসঙ্গে আমার একটা অসুখ দেখা দিল। মাঝে-মাঝেই মাথায় অসহ্য যন্ত্রণা হতে লাগল। একটা অদ্ভুত দপদপানি। সেই সময়ে আমি কেমন যেন উত্তেজিত হয়ে পড়ি, কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলি। লাস্ট এক বছরে অসুখটা ডেঞ্জারাস চেহারা নিল। তারপর…এই মাস ছসাত আগে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে একটা মেয়েকে শাস্তি দিলাম…আমাকে পাত্তা না দেওয়ার শাস্তি। মেয়েটা খুব ছোট ছিল… কথা বলতে-বলতে সীমন্তিনীর কাছে এগিয়ে এল পলাশ। হঠাৎই ওর গাল টিপে দিয়ে বলল, তোমার চেয়েও অনেক ছোট।
সীমা এক ঝটকায় মুখটা ঘুরিয়ে নিল।
পলাশ বাঁকানো ছুরিটা সীমার চোয়ালের নীচে ঠেকাল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, তবে মেয়েটার জিনিসপত্তর ছিল তোমার মতোই। ডান হাতে সীমার মুখটা একরকম জোর করেই নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল পলাশ ও তুমি যেন আবার ভুল করে আমাকে পাত্তা না দেওয়ার চেষ্টা কোরো না। শান্তনুর দিকে তাকিয়ে ও শান্তনু, তোর ওয়াইফকে সাবধান করে দে। বেচারি এখনও আমাকে পুরোপুরি বুঝতে পারেনি।
সীমন্তিনীর দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় অনুনয় করল শান্তনু।
পলাশ বলে চলল, ব্রিগেডের পর কসবা, তারপর বাইপাস, তারপর…।
সীমন্তিনীর চিবুকে আলতো করে টোকা মারল পলাশঃ তারপর কি সল্টলেক?
সীমার চিবুকে অসংখ্য মাকড়সা হেঁটে বেড়াতে লাগল। ও আবার দিপুর জন্য আকুল প্রার্থনা করল।
পলাশ দু-হাত ঝাঁকিয়ে হো-হো করে হেসে উঠল।
কিছুক্ষণ পর হাসি থামিয়ে ও কী একটা বলতে যাচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে ফ্ল্যাটের কলিং বেল বেজে উঠল টুং-টাং…।
পলাশ পলকে পাথরের মূর্তি হয়ে গেল।
