পলাশ নির্লিপ্তভাবে জবাব দিল, রং নাম্বার।
তারপর মন্তব্য করল, টেলিফোন যন্ত্রটাই বড় বিরক্তিকর। এবং টেলিফোনের তারটা দেওয়ালের জাংশান বক্স থেকে একটানে ছিঁড়ে দিল।
সীমন্তিনীর মনে আশার যে-সরু সুতোটা দোলাচলে দুলছিল সেটাও যেন কেউ একটানে ছিঁড়ে নিল।
বাসন্তী যে কখন ড্রইং স্পেসের সামনে করিডরে এসে দাঁড়িয়েছে সেটা কেউই টের পায়নি। টেলিফোনের তারটা ছিঁড়ে নেওয়ার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই পলাশ ওকে দেখতে পেল। ওর দিকে ঠান্ড চোখে তাকিয়ে হিংস্রভাবে পলাশ বলল, ভেতরে গিয়ে চুপচাপ নিজের কাজ কর। চেঁচামেচি করলে প্রথমে মিমোর গলা কাটব, তারপর তোর। হাত তুলে বাঁকানো ফলার ছুরিটা দেখাল পলাশ।
ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে গিয়ে বাসন্তী প্রায় ছুটে চলে গেল ভেতরের দিকে। মিমো চোখে হাত ঘষে কাঁদছিল। পলাশ ওর কাছে গিয়ে প্রচণ্ড ধমক দিয়ে বলল, চুপ কর বলছি!
মিমো চমকে উঠে আরও জোরে কেঁদে উঠল।
পলাশ নিজের কপালের দু-পাশটা বাঁ-হাতে জোরে টিপে ধরল। মাথা ঝাঁকাল কয়েকবার। তারপর ধৈর্য হারিয়ে চিৎকার করে উঠল, আ-আঃ!
একইসঙ্গে বাঁ-হাতে প্রচণ্ড এক থাপ্পড় কষিয়ে দিল মিমোর গালেঃ চুপ কর বলছি! চিৎকার করে পাগল করে দেবে দেখছি।
ওইটুকু বাচ্চার গালে কেউ যে অমনভাবে চড় কষাতে পারে এটা শান্তনু বা সীমন্তিনী কল্পনাও করতে পারেনি। ওরা দুজনেই ব্যথায় চিৎকার করে উঠল। মিমো আরও জোরে কেঁদে উঠতে যাচ্ছিল, কিন্তু এরপরই পলাশ যা করল তাতে ওইটুকু বাচ্চাও চুপ করে যেতে বাধ্য হল।
মিমোর সামনে হাঁটুগেড়ে বসে পড়ল পলাশ। ছুরি ধরা ডান হাতটা ওর গলার নলির কাছে নাচাতে নাচাতে চিবিয়ে চিবিয়ে হাসল, তারপর বলল, একটানে নলিটা দু-ফাঁক করে তোর কান্না থামিয়ে দেব, অ্যাঁ! পাগলের মতো হেসে উঠল পলাশ ও তখন তোর সব কান্না গলার ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যাবে মুখ দিয়ে আর বেরোবে না। দেখবি? কী রে, দেখবি, আঁ?
শান্তনু আর সীমন্তিনী ভয়ঙ্কর একটা খুন-পাগল মানুষকে দেখতে পেল যেন। সীমন্তিনী আর সইতে পারল না। সমস্ত বিপদ অগ্রাহ্য করে ছুটে গেল ছেলের কাছে। আর ঠিক তখনই পলাশ মিমোকে এক ধাক্কায় মায়ের দিকে ঠেলে দিল, বলল, ছেলেকে যে-করে-হোক চুপ করাও।
মিমো চুপ করে গিয়েছিল তার আগেই। ওর মুখ ভয়ে নীল। সীমা ছেলেকে প্রাণপণে আঁকড়ে ধরে ফুলে-ফুলে কাঁদতে লাগল। কোণঠাসা ইঁদুর যেভাবে হন্যে হয়ে পালাবার পথ খুঁজে বেড়ায় সেইভাবে বাঁচার একটা পথ খুঁজে বেড়াতে লাগল সীমা। মিমোকে টেনে নিয়ে গিয়ে সোফায় বসে পড়ল।
পলাশ তখন উঠে দাঁড়িয়ে বড়-বড় শ্বাস ফেলছে।
হঠাৎই মিমোর গলায় ঝোলানো শক্তিমানের ছবিটার দিকে নজর গেল সীমার। ছবিটা যে ওর ছেলের প্রাণ সে-কথা দ্বৈপায়ন ভালো করেই জানে। যদি…।
সীমা আর সময় নষ্ট করল না।
আবার তুমি এই ছবিটা গলায় ঝুলিয়েছ! শান্তনু আর পলাশকে রীতিমতো অবাক করে দিয়ে বেচারি মিমোকে ধমক দিল সীমা। শক্তিমানের ছবিটা ধরে এক টান মারল ও।
সুতো ছিঁড়ে ছবিটা চলে এল সীমার হাতে। আর সঙ্গে-সঙ্গেই ও সেটা ছুঁড়ে দিল খোলা জানলা লক্ষ করে। গজগজ করে মন্তব্য করল, হাজারবার বারণ করা সত্ত্বেও তুমি ওইসব আজেবাজে ছবি গলায় ঝুলিয়ে ঘুরে বেড়াবে! লেখাপড়া ছেড়ে যত্তসব বাজে কাজ!
সীমার আচমকা এই আচরণে পলাশ ও শান্তনু দুজনেই হকচকিয়ে গিয়েছিল। পলাশ চোখ ছোট করে তাকাল সীমার দিকে। যেন সীমার আচরণের সারমর্মটুকু ও নিখুঁতভাবে মেপে নিতে চায়। কিন্তু রহস্যের কোনও উত্তর খুঁজে পেল না পলাশ। ও টের পেল না যে, সীমা তখন আকুলভাবে প্রার্থনা করছে, দ্বৈপায়ন যেন যে-কোনওভাবে রাস্তায় অবহেলায় পড়ে থাকা শক্তিমানের ছবিটা দেখতে পায়। ঠাকুর, দিপু যেন ছবিটা দেখতে পায়!
পলাশ জানলার কাছে গিয়ে দেওয়ালের আড়াল থেকে খুব সাবধানে উঁকি মারল নীচের রাস্তায়। সত্যিই কি সাদা-পোশাকের গোয়েন্দারা ওত পেতে আছে অন্ধকারে, গাছপালা ঝোপঝাড়ের আড়ালে! এই ফ্ল্যাটে কতক্ষণ অপেক্ষা করা যায়? সীমার কথা কতটুকু সত্যি?
জানলা থেকে খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে নজর চালিয়েও কাউকে দেখতে পেল না পলাশ।
তখন ও ধীরে-ধীরে পা ফেলে এগিয়ে এল সীমা আর মিমোর কাছে। অদ্ভুতভাবে হেসে হাঁটুগেড়ে বসে পড়ল মেঝেতে।
সীমাসুন্দরী, পুলিশকে ঠিক কতটুকু বলেছ? কী কী জানতে চেয়েছে পুলিশ? কবে এসেছিল ওরা?
সাপ যদি কথা বলতে পারত তা হলে বোধহয় এই সুরেই কথা বলত।
একটা ভয়ঙ্কর মানুষকে খুব কাছ থেকে দেখছিল সীমন্তিনী। এই লোকটার হাতে ধর্ষিত হয়ে খুন হওয়ার সময় মেয়েগুলোর জঘন্য আতঙ্ক ও স্পষ্ট টের পেল। ওর মুখ ভয়ে সাদা হয়ে গেল। মিমো উপুড় হয়ে মুখ গুঁজে দিল মায়ের কোলে।
শান্তনু এবার সীমার জন্য ভয় পেল। স্থবির অবস্থা কাটিয়ে ও মুখ খুলল, তোকে…তোকে দেওয়া…টেলিফোন নাম্বার লেখা চিরকুটটা নিয়ে..পুলিশ আমাদের কাছে এসেছিল…।
পলাশ আনমনা হয়ে গেল। বিড়বিড় করে বলল, তা হলে বাইপাসের ওই মেয়েটার কাছে কোথাও চিরকুটটা আমি হারিয়েছি…। শান্তনুর দিকে সরাসরি তাকিয়ে ও জিগ্যেস করল, তারপর?
একে-একে সব বলে গেল ওরা। কখনও শান্তনু, কখনও সীমন্তিনী। ইতস্তত করে, হোঁচট খেয়ে ওরা অমল রায় আর বিজয় মিত্রের সব কথা বলে গেল। সীমা ইচ্ছে করেই দ্বৈপায়নের কথা বলেনি। সীমার কথার ধরন দেখেই শান্তনু ইশারাটা বুঝে নিয়েছিল। তাই ও-ও দ্বৈপায়নের কথা এড়িয়ে গেল।
