মিমোর কথায় জগৎ-সংসার পলকে স্থবির হয়ে গেল। কোথাও কোনও শব্দ নেই, কোনও চেতনা নেই। শুধু তিনটে রক্তহীন ফ্যাকাসে মুখ পরস্পরকে বিমূঢ় চোখে দেখছে।
শান্তনুর কণ্ঠা ওঠা-নামা করছিল বারবার। যেন সাঁতার না-জানা কোনও ডুবন্ত মানুষ অসহায়ভাবে খাবি খাচ্ছে। ওর রোগা চেহারার যেটুকু বা বুদ্ধিদীপ্ত ভাব ছিল এখন সেটা সম্পূর্ণ উবে গেছে। ও বড়-বড় চোখে পলাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। আর চোখের কোণ দিয়ে টের পাচ্ছিল সীমন্তিনীর দুর্দশা। এই মুহূর্তে কে বলবে ও সুন্দরী! কপালে ভাঁজ, চোখে-মুখে ভয়, বুক পাথর। যেন কোনও আগ্নেয়গিরির প্রলয় শুরু হওয়ার জন্য একরাশ আতঙ্ক ও উষ্কণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করছে।
পলাশের স্নায়ুতন্ত্রীর প্রশংসা করতেই হয়। ও সিগারেট নিভিয়ে অ্যাশট্রেতে রেখে দিল। চায়ের কাপ নামিয়ে রাখল টেবিলে। তারপর মিমোর মাথায় হাত বোলাতে-বোলাতে শান্তনুকে লক্ষ করে ঠান্ডা গলায় বলল, তোরা তা হলে সবই জেনে গেছিস!
শান্তনু শুকনো ঢোঁক গিলে কিছুক্ষণ সময় নিয়ে তারপর কেমন একটা জড়ানো স্বরে জবাব দিল, হ্যাঁ…পুলিশ সব জানে…।
পলাশ ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষণ কী যেন ভাবল, তারপর আপনমনেই বিড়বিড় করে বলতে শুরু করল, আমি যে এখানে সাতটার সময়ে আসব তা তো তোরা জানতিস না! তা হলে পুলিশ এখনও খবর পায়নি যে, আমি এখানে আছি…।
সীমা অনেক চেষ্টা করে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, আপনার বাঁচার আর কোনও পথ নেই, পলাশদা…। পুলিশের লোকজন সাদা-পোশাকে আমাদের ফ্ল্যাটের ওপরে নজর রাখছিল। তারা আপনাকে আমাদের ফ্ল্যাটে ঢুকতে দেখেছে। এতক্ষণে নিশ্চয়ই লালবাজারে খবর চলে গেছে। এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়ল সীমা : আপনার আর কোনও আশা নেই…।
মিথ্যে কথাগুলো সত্যির মতো শোনাল তো! গলার স্বর খুব বেশি কেঁপে যায়নি তো! ভাবল সীমা।
যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ…। খুব স্বাভাবিক গলায় বলল পলাশ। ওর মোটা-মোটা গাঁটওয়ালা আঙুলগুলো মিমোর মাথায়, গালে, গলায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল।
সীমার বুকের ভেতরে উথালপাথাল চলছিল, একটা ভয়ংকর কান্না গলা দিয়ে ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছিল। পলাশ মিমোকে ছুঁয়ে আছে দেখেই ওর ভীষণ ভয় করছিল। অমল রায়, বিজয় মিত্র, ওঁদের সন্দেহের প্রতিটি কণা তা হলে সত্যি!
মিমো, আমার কাছে আয়– ছেলেকে ডাকল সীমন্তিনী। আর একইসঙ্গে পা বাড়াল ছেলের দিকে, পলাশের দিকে।
সরল, নিষ্পাপ, দুরন্ত ছেলেটা কেমন যেন ভ্যাবাচ্যাকা ভোঁতা হয়ে গেছে পলকে। ওর মুখে কোনও কথা সরছে না। শুধু অবাক হয়ে বাবার ছোটবেলার বন্ধুকে দেখছে।
মায়ের ডাকে মিমো সাড় ফিরে পেল যেন। ও কচি গলায় ডেকে উঠল, মা!
ওর ডাকে খানিকটা কান্না মিশে গেল।
পলাশের চঞ্চল চোখ দেখেই বোঝা যাচ্ছিল ও মনে-মনে কিছু একটা হিসেব কষছে।
সীমন্তিনী ওর দিকে কয়েক পা এগিয়ে যেতেই ও এক ঝটকায় মিমোকে ঠেলে দিল একটা সোফায় দিকে। মিমো সোফায় ধাক্কা খেয়ে কাত হয়ে পড়ে গেল মেঝেতে।
সীমন্তিনী একটা চাপা চিৎকার করে উঠতেই পলাশ সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াল। কখন যেন ও ডান হাতটা পকেটে ঢুকিয়েছিল। এখন সেটা বাইরে বেরিয়ে আসতেই ছোট মাপের একটা ধারালো চাকু ঝলসে উঠল ওর হাতে।
অদ্ভুত তৎপরতায় পলাশের ভারী শরীর পৌঁছে গেল মিমোর কাছে। সামান্য ঝুঁকে পড়ে এক হ্যাঁচকায় বাচ্চাটাকে টেনে তুলল। ছোট বাঁকানো ফলার ছুরিটা ওর কানের পিছনে চেপে ধরে শান্তনুকে লক্ষ করে চাপা হিংস্র গলায় বলল, দরজায় ছিটকিনি-খিল সব এঁটে দে! এক্ষুনি!
শান্তনু আতঙ্কের চাপে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছিল। কাঁপা হাতে কোনওরকমে ও পলাশের হুকুম তামিল করল।
এখানে আমার কাছে এসে বোস। শান্তনুকে আবার আদেশ করল পলাশ।
নিশি-পাওয়া মানুষের মতো শান্তনু পায়ে-পায়ে এগিয়ে এল পলাশের কাছে। একটা সোফার বসে পড়ল।
মিমো কাঁদছিল। কিন্তু শান্তনু যেন অচেনা কোনও মানুষের মতো ছেলেকে দেখছিল। ওর মনে হচ্ছিল, এগুলো ওর জীবনের ঘটনা নয়। ও ভ্যান ড্যাম অথবা ব্রুস উইলিসের কোনও অ্যাকশন ছবি দেখছে। ওসব সিনেমায় যা হয়, বাস্তবে তা হতে পারে বলে শান্তনুর মন কখনও বিশ্বাস করেনি।
মিমোকে কাঁদতে দেখে সীমন্তিনী নিজেকে আর শক্ত করে ধরে রাখতে পারেনি। ওর চোখে জল এসে গিয়েছিল। জল ভরা চোখেই ও দেখছিল, মিমোর বুকে শক্তিমানের ছবিটা নিছকই ছবি হয়ে ঝুলছে।
মিমোকে ছেড়ে দিন, পলাশদা! কান্না-ভাঙা কাতর গলায় পলাশের কাছে যেন ভিক্ষে চাইল সীমা। ওর মন দ্বৈপায়নকে ডাকতে লাগল আকুল হয়ে।
পলাশ দাঁত বের করে হাসল। ওর দাঁতের জোড়গুলোয় কালচে ছোপ চোখে পড়ল। হাত নেড়ে ইশারা করে সীমাকে কাছে ডাকল পলাশ, তুমিও লক্ষ্মী মেয়ের মতো এখানটায় চলে এসো। শান্তনুর কাছে চুপটি করে বসে পড়ো।
সীমা প্রায় ছুটে এসে বসে পড়ল শান্তনুর পাশে। এমন সময় টেলিফোন বাজতে শুরু করল।
শান্তনু নিশ্চল হয়ে বসেছিল। ওর বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করছিল। ও পলাশের নজর এড়িয়ে সীমাকে ছোট্ট করে ঠেলা দিল। অর্থাৎ, জলদি টেলিফোনটা ধরো।
কিন্তু টেলিফোন ওঁদের কাউকেই ধরতে হল না। কারণ, মিমোকে সঙ্গে নিয়ে পলাশ টেলিফোনের কাছে গেল। রিসিভার তুলে নিয়ে হ্যালো বলল।
মিস্টার সেনগুপ্ত আছেন? ও-প্রান্তে কেউ একজন জিগ্যেস করল।
