শান্তনু সময় পেলেই গল্প-উপন্যাস পড়ে, কেব্ল টিভি-তে সিনেমাও দ্যাখে। সেখানে অবিশ্বাস্য কত কিছু ঘটে যায়। মিমোর শক্তিমান হলেও এতক্ষণে বহু কিছু করে ফেলত। হয়তো পলাশকে শূন্যে তুলে ঘুরপাক খাইয়ে ছুঁড়ে দিত মহাকাশে। ডাই হার্ড ছবির ব্রুস উইলিস কেমন একা লড়াই করে হারিয়ে দিল এক ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসবাদী দলকে। ফার্স্ট ব্লাড ছবিতে সিলভেস্টার স্ট্যালোনও কি কম কিছু করেছিল। কিংবা, আরনল্ড সোয়াজেনেগার, স্টিভেন সিগাল, জাঁ ক্লদ ভ্যান ড্যাম–ওরাও তো কত লড়াই করে সাঙ্ঘাতিক-সাঙ্ঘাতিক সব ভিলেনদের সঙ্গে! সানি দেওল, সঞ্জয় দত, মিষ্টুন চক্রবর্তী…একের পর এক নাম মনে পড়ছিল। লোকে বলে বুদ্ধির জোর বেশি। কিন্তু শুধু বুদ্ধির জোরে কি কিছু করা যায়! গায়ের জোরও দরকার।
তখনই সীমার দিকে চোখ পড়ল ওর। আর মনে হল, নাঃ, মনের জোর থাকাটাও এখন বেশ জরুরি।
সীমা চোখে-চোখে কী একটা ইশারা করতে চাইল শান্তনুকে। তারপর চায়ের ব্যবস্থা করতে চলে গেল।
সীমা কি বিজয় মিত্রকে ফোন করার জন্য ইশারা করল? কথাটা ভাবতে গিয়েই শান্তনুর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। ফোন নম্বর দুটো ও মুখস্থ করে রেখেছিল। কিন্তু এখন কিছুতেই আর মনে পড়ছে না। কেমন যেন সব গোলমাল পাকিয়ে যাচ্ছে। তা ছাড়া ফোন করতে গেলেই পলাশ নিশ্চয়ই সন্দেহ করবে। ও যদি বাথরুমে যায় সেই ফাঁকে ফোনটা করে ফেলা যায়। কিন্তু হঠাৎ ও বাথরুমেই বা যাবে কেন? আচ্ছা, ওকে জিগ্যেস করলে কেমন হয়!
তুই কি বাথরুমে যাবি? এলোপাতাড়ি ভাবতে-ভাবতে এই হাস্যকর প্রশ্নটা শান্তনুর মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল।
পলাশ চোখ ছোট করে শান্তনুর দিকে তাকালঃ তার মানে! জিগ্যেস করলাম, কেমন আছিস। তার উত্তর হল, তুই কি বাথরুমে যাবি? একটু থামল পলাশ। তারপর ও কী ব্যাপার বল তো? তুই কি অন্য কিছু ভাবছিস?
বেসামাল পরিস্থিতিটা সামলে নেওয়ার জন্য শান্তনু হাতের সিগারেটে পরপর কয়েকটা টান দিল। একবার টিভির দিকে দেখল, একবার পলাশের দিকে। সীমন্তিনী চা নিয়ে এসে পড়লে বাঁচা যেত। ও কী যে করছে এতক্ষণ!
জোর করে হাসার চেষ্টা করল শান্তনু। কয়েকবার গলাখাঁকারি দিয়ে বলল, আজকাল আমার এইরকম হয়েছে। আনমনাভাবে উলটোপালটা সব কথা বলে ফেলছি। যাকগে, তোর কী খবর বল। চাকরি-বাকরি কেমন চলছে?
চাকরি! তোকে তো কখনও বলিনি যে, আমি চাকরি করি।হেসে বলল পলাশ। তারপর বেশ সিরিয়াস ঢঙে মন্তব্য করল, আমি কারও চাকর নই। আমি স্বাধীন।
শান্তনু উত্তরে কী বলবে ভাবছিল, ঠিক তখনই সীমা চা নিয়ে ঘরে ঢুকল। পলাশের সামনে টেবিলে কাপ-প্লেট সাজিয়ে দিতে দিতে শান্তনুকে লক্ষ করে বলল, তোমার চা করিনি। তোমাকে একটু বাজারে যেতে হবে। তারপর ফিরে এসে চা খাবে। পলাশের দিকে তাকিয়ে সীমা বলল, পলাশদা, আপনি কিছু মাইন্ড করবেন না। আপনি গেস্ট আপনার জন্যে স্পেশাল কিছু রাঁধতে না পারলে আমার মন মানবে না। দশমিনিটেই ও ঘুরে চলে আসবে–আপনি ততক্ষণ টিভি দেখুন।
শান্তনু যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। ও সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিয়ে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াতেই সীমা ওকে ভেতরে ডাকল।
সীমার বুকের ভেতরে যাচ্ছেতাই ব্যাপার চলছিল। ও কোনওরকমে শান্তনুকে রান্নাঘরের কাছে ডেকে নিয়ে এল। বাজারের থলে আর টাকা ওর হাতে দিতে দিতে চাপা গলায় ফিসফিস করে বলল, বাইরে বেরিয়েই দিপুকে একটা খবর দেবে। তারপর বিজয় মিত্রের দেওয়া নাম্বারে ফোন করে সব বলবে। বলবে, ভীষণ বিপদ।
শান্তনু যখন বলল, ফোন নম্বর দুটো ওর মনে নেই, তখন সীমা বলল যে, নম্বর দুটো দিপু জানে।
শান্তনু ঘোর লাগা মানুষের মতো আলগা পায়ে ফ্ল্যাটের দরজার দিকে হাঁটা দিল। সীমা আর মিমোকে একটা ভয়ঙ্কর খুনির সঙ্গে রেখে যেতে ওর বুক দুরদুর করছিল।
বাসন্তী রান্নাঘরে একমনে মশলা বাটছিল। আর মিমো শোওয়ার ঘরের মেঝেতে বই খাতা ছড়িয়ে পরীক্ষার পড়া তৈরি করছিল। সীমা শান্তনুকে রওনা করে দিয়েই শোওয়ার ঘরে ঢুকে দেখল মিমো নেই। বই-খাতা বন্ধ করে একপাশে সরিয়ে রেখে কোন ফাঁকে উঠে পড়েছে।
সীমা তাড়াতাড়ি পা ফেলে বাথরুমের কাছে গিয়ে উঁকি মেরে দেখল মিমো সেখানে নেই। তা হলে নিশ্চয়ই ও বসবার ঘরে পলাশের কাছে গেছে! সীমার বুকের ভেতরে ভেঁকির পাড় পড়ল যেন। ও মিমো! মিমো! করে ডাকতে-ডাকতে প্রায় ছুটে এল বসবার ঘরে।
বাড়িতে যে কোনও অতিথি এসেছে সেটা মিমো পড়তে-পড়তেই টের পেয়েছিল। তাই পড়ার ব্যাপারটা মোটামুটি শেষ হতেই ও চুপিসারে চলে এসেছে বসবার ঘরে।
টিভিতে তখন খবর পড়া হচ্ছিল। চা-সিগারেট খেতে-খেতে পলাশ একমনে টিভি দেখছিল। গলায় শক্তিমানের ছবি ঝোলানো বাচ্চাটাকে দেখতে পেয়েই পলাশ আদর করে ওকে কাছে ডেকেছে : কী খবর, অচ্যুতবাবু, কেমন আছ?
শান্তনু তখন পলাশকে আসছি বলে ফ্ল্যাটের ল্যাচে হাত রেখেছে। সুতরাং মিমো যখন কথা বলল তখন শান্তনু আর সীমা দুজনেই পলাশের কাছ থেকে মাত্র হাত পাঁচ-ছয় দূরে দাঁড়িয়ে। ওরা তিনজনে যেন একটা বিষমবাহু ত্রিভুজের তিনটি শীর্ষবিন্দু তৈরি করেছে।
ওদের তিনজনকেই স্তম্ভিত করে দিয়ে মিমো পলাশকে জিগ্যেস করল, পলাশকাকু তুমি মা-মার্ডারার? সেদিন মা দিপুদাকে বলছিল…।
