থাকব। ছোট্ট করে বলল সীমা।
আমার দেওয়া ফোন নাম্বার দুটো মনে আছে তো?
সীমা জানাল, হ্যাঁ, আছে।
কোনওরকম ইমারজেন্সি হলেই আমাকে রিং করবেন। বিজয় মিত্র ফোন রেখে দিলেন।
সীমা রিসিভার নামিয়ে রেখে দ্বৈপায়নের দিকে তাকাল। ওর চিন্তা পলাশ সান্যালকে ঘিরে পাক খেতে শুরু করল।
দ্বৈপায়ন জিগ্যেস করল, কে ফোন করেছিল, বউদি?
সীমা অন্যমনস্কভাবে বলল, সেই পুলিশ অফিসার–বিজয় মিত্র।
কী ব্যাপার বলো তো? কী ভাবছ?
সীমা অসহায়ভাবে বলল, পলাশ সান্যাল যদি কখনও হঠাৎ করে চলে আসে তখন তুমি যদি কাছে না থাকে, তা হলে তোমাকে জানাব কেমন করে? তোমার দাদা যা ছাপোষা মানুষ! ওরকম ডেঞ্জারাস একজন মার্ডারারের সঙ্গে পেরে উঠবে না।
কে মার্ডারার, মা? গুটে কৌতূহলে জানতে চাইল।
সীমা ওর দিকে কটমট করে তাকিয়ে বলল, চুপ কর। সব ব্যাপারে ফোড়ন কাটা চাই!
আহা, ওকে বকছ কেন! বলে দ্বৈপায়ন গুটের মাথার ছোট-ছোট চুলে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, এসব বড়দের ব্যাপার, তুই বুঝবি না। তারপর সীমার দিকে ফিরে ও বউদি, তোমাকে তো আগেও বলেছি, আমাকে ঘরে নয় অফিসে একটা ফোন করে দেবে। আর আমি তো মাঝেমধ্যে ফোন করে তোমাদের খবর নিই। এত ভয় পেলে কখনও চলে! তুমি বরং বিজয়বাবুর দেওয়া ফোন নাম্বার দুটো আমাকে দাও–আমি লিখে নিই।
সীমা তাড়াতাড়ি ফোন নম্বর দুটো খুঁজে বের করে একটা চিরকুটে টুকে দ্বৈপায়নকে দিল।
ওটা পকেটে রেখে দ্বৈপায়ন বলল, শান্তনুদার সঙ্গে স্কুলের আর কোনও বন্ধুর কোনও কনট্যাক্ট নেই?
সীমা বলল, সুজিত আর পার্থ নামে দুজনের সঙ্গে আছে। ওদের অনেকদিন আগেই ও জিগ্যেস করেছিল। পলাশ সান্যাল নামটাই ওরা মনে করতে পারছে না।
দ্বৈপায়ন ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, তুমি ভয় পেয়ো না। কেউ দরজায় নক করলে বা বেল টিপলে আগে ম্যাজিক আই দিয়ে দেখে নেবে। তবে পলাশ সান্যাল এলে তাকে যেন আবার দরজা থেকে বিদেয় করে দিয়ো না। লোকটা অ্যারেস্ট হওয়া দরকার। নয়তো আরও অনেকের সর্বনাশ করবে। তোমাকে একটিই রিকোয়েস্ট, কিছুতেই যেন নার্ভ ফেল কোরো না।
চলে যাওয়ার আগে দ্বৈপায়ন গুটের মাথায় একটা চাটি মেরে গেল। আর সীমাকে বলে গেল, তোমার ভয় কীসের, বউদি! আমি তো আছি।
এর ঠিক আট ঘণ্টা পরে, সন্ধে সাতটা নাগাদ, পলাশ সান্যাল যখন এল তখন দ্বৈপায়নের শেষ কথাগুলো সীমন্তিনীর সবচেয়ে আগে মনে পড়ল।
.
ম্যাজিক আই দিয়ে আগন্তুকের পুরো মুখটা দেখা যাচ্ছিল না। শুধু শক্ত চোয়াল, গলা, আর কাঁধের খানিকটা অংশ চোখে পড়ছে। তামাটে গলায় দুটো কালো ভাঁজ, দু-চারটে কাঁচা পাকা দাড়ির খোঁচা, সাদা-নীল স্ট্রাইপ দেওয়া কলার, আর হালকা সবুজ সোয়েটার।
দরজা খুলে দেওয়ার মুহূর্তেও সীমন্তিনী ভাবতে পারেনি অতিথি পলাশ সান্যাল হতে পারে। সেই কারণেই দরজা খুলে ভিনগ্রহের মানুষটাকে দেখে ও চমকে উঠল। ওর মুখ থেকে রক্ত সরে গেল পলকে।
পলাশ অবাক হলেও হেসে বলল, কী ব্যাপার! তুমি যে ভূত দেখার মতন চমকে উঠলে!
ষষ্ঠ অথবা সপ্তম ইন্দ্রিয়ের কবলে পড়ে সীমা কয়েক পা পিছিয়ে গিয়েছিল। ও অসহায়ভাবে দেখল, পলাশ সান্যাল হাসিমুখে ফ্ল্যাটের ভেতরে ঢুকে এল, তারপর দরজা ঠেলে বন্ধ করে দিল। ক্লিক করে নাইটল্যাচ বন্ধ হয়ে যাওয়ার শব্দ হল।
শান্তনু বসবার ঘরের সোফায় গা এলিয়ে রঙিন টিভির দিকে চোখ মেলে বসেছিল। হাতে জ্বলন্ত সিগারেট।
পলাশকে দেখামাত্রই সিগারেটটা হাত থেকে পড়ে যেতে চাইছিল। ও কোনওরকমে দুর্ঘটনাটা সামলে নিল। একইসঙ্গে সীমন্তিনীর মুখের চেহারা ওকে ভয় পাইয়ে দিল। ও সহজ গলায় পলাশকে অভ্যর্থনা জানাতে চেষ্টা করল? কী ব্যাপার! সেই যে হুট করে একদিন এলি…তারপর তো একেবারে অমাবস্যার চঁদ হয়ে গেলি। রোজই আমি বাড়ি ফিরে ওকে জিগ্যেস করি পলাশ ফোন করেছিল কি না–।
ওর কাছাকাছি একটা সোফায় পলাশকে বসতে ইশারা করল শান্তনু।
পলাশ ছোট্ট একটা শব্দ করে এগিয়ে এল সোফার কাছে। ওর চঞ্চল চোখ চারপাশটা চকিত দৃষ্টিতে দেখে নিচ্ছিল। সীমা আর শান্তনুকেও একপলক দেখে নিল ও।
সীমা ওর চোখে সন্দেহের দৃষ্টি খুঁজতে চাইল। গলার স্বর স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বলল, বসুন। চা খাবেন তো?
পলাশ অবাক হয়ে সীমার দিকে তাকাল : শুধু চা! আমি তো ভাবছিলাম, সাহেবরা যাকে বলে ডিনার একেবারে তা-ই খেয়ে যাব। কথার শেষে ও হো-হো করে হেসে উঠল।
সে তো খাবেনই। হেসে বলল সীমা, ডিনার না খাইয়ে আপনাকে আজ ছাড়ছি না। পলাশকে যে-করে-হোক আটকে রাখতেই হবে।
পলাশ বসতেই শান্তনু ওকে সিগারেট অফার করল। সম্পূর্ণ নতুন চোখে ওর স্কুলের বন্ধুকে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। খুঁজে পেতে চাইল একজন ধর্ষণকারী ও হত্যাকারীকে।
টেবিলে রাখা লাইটার দিয়ে সিগারেট ধরাল পলাশ। তারপর লাইটার রেখে সিগারেট ধরা ঠোঁটে জড়িয়ে-জড়িয়ে বলল, কেমন আছিস বল।
শান্তনুর বুকের ভেতরে এলোপাতাড়ি ঢাক বাজাচ্ছিল কেউ। বরাবর অঙ্কে ওর মাথা ভালো। কিন্তু এখন, এই মুহূর্তে, ওর সব অঙ্ক কেমন যেন জট পাকিয়ে যাচ্ছিল। পলাশের চওড়া কাঁধ আর হাতের পেশির দিকে তাকিয়ে ও স্পষ্ট বুঝল, সমান-সমান লড়াইয়ে পলাশকে কাবু করা ওর কর্ম নয়। দ্বৈপায়ন কাছে থাকলেও বা কিছু একটা ভাবা যেত। ও ডাকাবুকো ছেলে, শক্তি সামথ্যও কম নয়। কিন্তু একা-একা…।
