একটা টেবিলক্লথ পিঠের দিকে ঝুলিয়ে গলায় বেঁধে নিয়েছে। কোমরে একটা বেলট। বুকের কাছে ঝুলছে শক্তিমান-এর একটা পোস্টার। হাতে লম্বা একটা স্কেল।
এই অদ্ভুত সাজসজ্জাসমেত বাচ্চাটা চেয়ার থেকে টেবিলে, টেবিল থেকে সোফায়, সোফা থেকে মেঝেতে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে। আর একইসঙ্গে আমি শক্তিমান! আমি শক্তিমান! বলে চেঁচাচ্ছে।
মিমো, তোমাকে তখন থেকে কিন্তু বলছি এবার থামো। ওসব জঞ্জাল রেখে পড়তে বোসো।
দ্বৈপায়ন বুঝল সীমা ছেলের ওপর বেশ রেগে গেছে। ওকে ঠান্ডা করার জন্য দ্বৈপায়ন হেসে বলল, খেলছে একটু খেলুক না–।
তার মানে! ভ্রূকুটি করে দ্বৈপায়নের দিকে তাকাল সীমা : তুমি জানো, আগের দুটো টেস্টে বেঙ্গলি আর ম্যাথুস-এ ও কী করেছে!
দ্বৈপায়ন দু-হাত নেড়ে হেসে বলল, কী আর করবে! বড়জোর একটু কম নম্বর পেয়েছে, এই তো!
সে হলে তো হতই! অঙ্ক পরীক্ষায় দিয়েছিল A-র মালিক আয় বারোশো টাকা, B-র মাসিক আয় তেইশশো টাকা..এইসব দিয়ে একটা সোজা অঙ্ক দিয়েছিল। তো তোমার গুটে সে-অঙ্ক ছেড়ে দিয়েছে। জিগ্যেস করলাম, এই সোজা অঙ্কটা করলি না কেন। তাতে ও কী জবাব দিল জানো? বলল, ইংরেজি অঙ্ক আমি শিখেছি নাকি! ওই যে, ক-খ-গ-র বদলে A-B-C দিয়েছে!
দ্বৈপায়ন তো গুটের কীর্তি শুনে হেসেই অস্থির।
সীমা গুটেকে আবার ধমকে উঠল, মিমো, ওসব রেখে শিগগির পড়তে বোস কিন্তু! নইলে আমি কিন্তু…।
আঃ, বউদি কী হচ্ছে! সীমাকে থামাল দ্বৈপায়ন। তারপর গুটেকে কাছে ডাকল ও অ্যাই, এদিকে আয়–।
গুটে শক্তিমান! বলে এক তীব্র হাঁক ছেড়ে লাফ দিয়ে দ্বৈপায়নের কাছে এসে হাজির হল। ওকে দেখে মনেই হল না, মায়ের কথাগুলো ওর বিন্দুমাত্রও কানে ঢুকেছে। সীমা রেগে গিয়ে ওর কান মুলে দিল।
গুটে অসন্তুষ্ট হয়ে সীমার দিকে তাকাল, গজগজ করে বলল, সবসময় খালি আমাকে মারবে।
ওর চোখে জল এসে গিয়েছিল। দ্বৈপায়নের সামনে কান মুলে দেওয়ায় ব্যাপারটা ওর যথেষ্ট প্রেস্টিজে লেগেছে।
সীমা রাগি চোখে ছেলের দিকে একবার তাকাল। তারপর দ্বৈপায়নকে বলল, এবারে ওর বাংলা পরীক্ষার কীর্তি শোনো।
এ কথা বলামাত্রই গুটে সীমাকে একেবারে জাপটে ধরল। ওই অবস্থায় প্রায় লাফাতে লাফাতে বলল, না, না–দিপুদাকে কিছুতেই বলবে না। কিছুতেই না। আমি রোজ মন দিয়ে পড়ব।
কিন্তু সীমাও তখন বেশ রেগে গেছে। ও গুটেকে ঠেলে সরিয়ে দিতে দিতে বলল, শোনো, বাংলায় ও কী করেছে। কোয়েশ্চেন দিয়েছিল, তোমার যে সবচেয়ে প্রিয় তার সম্পর্কে দশ লাইন লেখো। তাতে ও কী লিখে এসেছে জানো! লিখেছে : আমার সবচেয়ে প্রিয় গরু…, তারপর গরু রচনা থেকে দশ লাইন মুখস্থ লিখে দিয়েছে–ওটা তৈরি ছিল, তাই।
দ্বৈপায়ন হাসতে হাসতে পেট চেপে ধরে একটা সোফায় বসে পড়ল। আর গুটে দিপুদাকে বললে কেন? দিপুদাকে বললে কেন? বলতে-বলতে ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলল। মায়ের কাছে গিয়ে ছোট্ট হাতে বারকয়েক কিল মারার চেষ্টা করল। তারপর একছুটে চলে গেল শোওয়ার ঘরের দিকে।
দ্বৈপায়ন ওকে অনেকবার ডাকল, কিন্তু ও শুনল না।
গুটের কাণ্ড শুনে দ্বৈপায়ন অনেকক্ষণ ধরে হাসল। তারপর সীমাকে বলল, বউদি, গুটেকে মারধোর কোরো না, বুঝিয়ে বলো, ঠিক বুঝবে।
আর বুঝেছে! শক্তিমানের ছবিটা ওর প্রাণ। দিন-রাত ওটা গলায় ঝুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার ওপর তোমার রোলার স্কেটস তো আছেই।
গুটেকে দ্বৈপায়ন খুব ভালোবাসে। প্রথম পরিচয়ের পর বাচ্চা ছেলেটা ওকে কাকু বলে ডাকত। দ্বৈপায়ন তখন ওকে বারণ করেছিল। বলেছিল দিপুদা বলে ডাকতে। কাকু ডাকটা ওর কেমন যেন কানে লাগত। দ্বৈপায়নের বউদি ডাকটাও কি সীমন্তিনীর কানে লাগে?
দ্বৈপায়ন ওদের তিনজনের কথাই ভাবছিল। মাত্র ছমাসের মধ্যেই কী অদ্ভুতভাবে ও ওদের আপনজন হয়ে উঠেছে। তেমনি ওরাও। ওদের গায়ে কোনও আঁচড় পড়লে দ্বৈপায়ন সেই জ্বালা টের পায়। ওদের সংসারে মেঘ ঘনিয়ে এলে দ্বৈপায়নের বুকের ভেতরে বৃষ্টি হয়। এ কোন অলৌকিক সম্পর্ক কে জানে!
ঠিক আছে, রোলার স্কেটস কদিন না হয় বন্ধ রাখব। সোফা ছেড়ে উঠে পড়ল ও ও দেখি, গুটেকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে পড়তে বসাই। বাচ্চাদের সবসময় এরকম মারধোর করলে হয়!
দ্বৈপায়ন ভেতরের দিকে রওনা হতেই টেলিফোন বেজে উঠল। সীমা তাড়াতাড়ি গিয়ে ফোন ধরল। পলাশের ভয় এ কদিনে থিতিয়ে এলেও রিসিভার তোলার সময় সীমার হাত কেঁপে গেল।
হ্যালো।
মিসেস সেনগুপ্ত বলছেন? ও-প্রান্ত থেকে ভারী গলায় কেউ বলল।
হ্যাঁ..আপনি?
বিজয় মিত্র, লালবাজার।
সীমার বুক ঠেলে একটা স্বস্তির নিশ্বাস বেরিয়ে এল। ও আগ্রহ নিয়ে জিগ্যেস করল, বলুন, কোনও খবর আছে?
সীমা ভাবছিল, পলাশ সান্যাল হয়তো এর মধ্যেই পুলিশে ধরা পড়ে গেছে।
ও-প্রান্তে বিজয় মিত্র হাসলেনঃ এদিকে নতুন কোনও খবর নেই। তাই আপনার কাছে খবর চাইছি।
সীমা কেমন স্তিমিত হয়ে গেলঃ নাঃ, এর মধ্যে আর ফোন করেনি।
দ্বৈপায়ন গুটেকে নিয়ে কখন যেন বসবার ঘরে চলে এসেছে। বাচ্চাটা শক্তিমানের ধড়াচূড়া সব ছেড়ে এলেও কার্ডবোর্ডে সাঁটা ছবিটা এখনও গলায় ঝুলিয়ে রেখেছে।
মিসেস সেনগুপ্ত, পলাশ সান্যালের স্কেচটা কাল সন্ধেবেলা আপনাদের দেখাতে নিয়ে যাব। আর্টিস্টও সঙ্গে যাবে। আপনারা থাকবেন কিন্তু।
