টেলিফোন নামিয়ে রেখে দ্বৈপায়নের দিকে ফাঁকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে সীমা জিগ্যেস করল, কী করব এখন?
খুব সিম্পল। শান্তনুদাকে অফিসে ফোন করে খবরটা জানাও। তারপর লালবাজারে ফোন করে বিজয় মিত্রকে জানাও। দরকার হলে ওঁরা তোমাদের ফোন ট্যাপ করবেন। বুঝতেই পারছ, পলাশ সান্যাল ইজ আ ভেরি ডেঞ্জারাস ম্যান।
সীমা তাড়াতাড়ি ফোন নম্বরগুলো খুঁজে বের করল। দ্বৈপায়ন ওর হয়ে ডায়াল করে দিল। শান্তনু খবরটা শুনে ব্যস্ত হয়ে পড়লে সীমা ওকে ভরসা দিল। বলল, দ্বৈপায়ন আছে, ভয়ের কিছু নেই। ও এখন স্কুল থেকে মিমোকে নিয়ে আসতে যাচ্ছে।
লালবাজারে ফোন করে বিজয় মিত্রকে পাওয়া গেল। তিনি শান্তস্বরে জানালেন, দুশ্চিন্তার কোনও কারণ নেই। ওঁরা পুলিশের আর্টিস্ট দিয়ে পলাশ সান্যালের একটা ছবি আঁকিয়ে রাখছেন। সেটা শান্তনুদের দিয়ে চেক করিয়ে ফাইনাল করবেন। তারপর সেরকম পরিস্থিতি দেখা দিলে টিভিতে ছবিটা প্রচার করে পলাশ সান্যালের খোঁজ করবেন। শুধুমাত্র সন্দেহ বা অনুমানের ওপরে নির্ভর করে এক্ষুনি টিভি ব্রডকাস্টে যাওয়া ঠিক হবে না।
আর টেলিফোন ট্যাপ করার ব্যাপারে বিজয় মিত্র বললেন, পলাশ সান্যাল তো রেগুলার আপনাকে ফোন করছে না। রেগুলার আপনাদের ফোন করা শুরু করলেই আমাদের জানাবেন– তখন লাইন ট্যাপিং-এর ব্যবস্থা করব। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন বিজয় মিত্র ও ট্যাপ করেও তেমন একটা লাভ হবে বলে মনে হয় না। দেখব হয়তো পাবলিক ফোন কি এস.টি.ডি. বুথ থেকে ফোন করছে। ও.কে., মিসেস সেনগুপ্ত, রাখছি।
ফোন রেখেই হাতঘড়ির দিকে তাকাল সীমা। তাকিয়েই আঁতকে উঠল। ভীষণ দেরি হয়ে গেছে। ছুটির সময় ওর যেতে দেরি হলে মিমো ভীষণ ঝামেলা করে।
বাসন্তীকে বলে দ্বৈপায়নের সঙ্গেই ও ফ্ল্যাটের বাইরে বেরিয়ে এল। ছোট্ট করে দ্বৈপায়নকে জিগ্যেস করল, তুমি সঙ্গে যাবে নাকি?
দ্বৈপায়ন রোলার স্কেটসটা পা থেকে খুলতে খুলতে বলল, যেতে ইচ্ছে করছে, তবে উপায় নেই। সাড়ে দশটায় ড্যাডির সঙ্গে ফ্যাক্টরিতে যেতে হবে। না গেলে ড্যাডি খুব খেপে যাবে। সন্ধের পর বরং আসব।
সীমা সিঁড়ি নামতে যাচ্ছিল, পিছন থেকে দ্বৈপায়ন বলল, আর-একবার নাম ধরে ডাকব?
সীমা নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। ও চকিতে চোখ বুলিয়ে সিঁড়ির ওপর। নীচটা দেখল। কেউ নেই। তখন ঘাড় নেড়ে বলল, হ্যাঁ।
দ্বৈপায়ন জিগ্যেস করল, পুরো নাম?
সীমা হেসে ঘাড় কাত করল।
সীমন্তিনী–। আলতো করে ডাকল দিপু। তারপরই ওদের ফ্ল্যাটের দরজায় নক করল ঠকঠক করে।
দ্বৈপায়নের দিকে তাকিয়ে কিশোরী হয়ে হাসল সীমা। তারপর যেন হাওয়ায় ভেসে সিঁড়ি নামতে শুরু করল। দ্বৈপায়নের আলতো ডাকটা ওকে রেশমের শাড়ির মতো সর্বক্ষণ জড়িয়ে রইল। মিমোর স্কুলে পৌঁছনো পর্যন্ত সেই ডাকটা ও শুনতে পাচ্ছিল।
.
একদিন সন্ধ্যায় শান্তনুদের ফ্ল্যাটে পলাশ সান্যাল এসে হাজির হল আগাম কোনও খবর দিয়েই।
পলাশ শেষ যেদিন ফোন করেছিল তারপর সাত-সাতটা দিন সহজ-সরলভাবে কেটে গেছে। শান্তনুরা আবার ভাবতে শুরু করেছিল পলাশ আর কোনওদিনই ওদের বাড়িতে আসবে না। সীমন্তিনী এও ভাবতে শুরু করেছিল, পলাশ হয়তো সত্যি-সত্যিই অপরাধী নয়–পুলিশ মিছিমিছি ওকে সন্দেহ করছে।
ঠিক এরকমই একটা নিশ্চিন্ত অবস্থার মাঝে পলাশ এসে হাজির হল। এবং প্রমাণ করে দিল, বিজয় মিত্র বা অমল রায়ের ধারণায় কোনও ভুল ছিল না।
সীমন্তিনী সেদিন দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। অথচ তার আগে ও, শান্তনু আর দ্বৈপায়ন মিলে কত পরিকল্পনাই না করেছে।
পলাশ এলে কীভাবে ওরা বিজয় মিত্রকে খবর দেবে। শান্তনু যদি বাড়ি না থাকে তা হলে সীমা কী করে ওকে বোঝাবে যে, পলাশ ওদের ফ্ল্যাটে আছে। পলাশ এলে দ্বৈপায়নকেও খবরটা জানানো দরকার–ওকে কীভাবে জানানো হবে। মিমোকে একমাসের জন্য ছোটমাসির কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হবে কি না। এইরকম নানান জল্পনা কল্পনায় শান্তনুদের দিন কেটেছে। কিন্তু কয়েকদিন কেটে যাওয়ার পরই ওদের সব ভাবনা থিতিয়ে গেছে। পলাশ সান্যালকে মনে হয়েছে। অন্য কোনও গ্রহের মানুষ। আর অমল রায় ও বিজয় মিত্র যেন শান্তনুদের নয়, অন্য কারও ফ্ল্যাটে এসেছিলেন।
পলাশ যেদিন এল সেদিনটা ছিল শনিবার। অন্য আর-পাঁচটা দিনের মতোই দিনটা শুরু হয়েছিল।
গুটের সেদিন স্কুল ছুটি ছিল। কিন্তু সোমবারে ক্লাস টেস্ট আছে বলে ওকে দ্বৈপায়নের সঙ্গে ভোরবেলা সীমা বেরোতে দেয়নি। তা ছাড়া আগের দিন বাংলা আর অঙ্ক পরীক্ষা ভালো হয়নি বলে সীমার মেজাজটাও খারাপ ছিল।
দ্বৈপায়ন জিমে গিয়েছিল। সেখান থেকে ফিরে নিজেদের ফ্ল্যাটে ঢোকার সময় একবার হাতঘড়ি দেখল। সওয়া দশটা বাজে। সীমাদের ফ্ল্যাট থেকে গুটের হুল্লোড়ের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল। কী ভেবে দ্বৈপায়ন সীমাদের ফ্ল্যাটে নক করল।
একটু পরেই সীমার গলা শোনা গেল : কে?
মজা করার জন্য দ্বৈপায়ন গলার স্বর সামান্য বদলে নিয়ে বলল, আমি…পলাশ…।
সঙ্গে-সঙ্গেই ও খেয়াল করল, দরজার ওপাশে ম্যাজিক আই-এ চোখ রেখেছে সীমা। তারপরই দরজা খুলে এরকম সাঙ্ঘাতিক ঠাট্টা করার কোনও মানে হয়! এসো– বলে দ্বৈপায়নকে ঘরে ডেকেছে।
ঘুরে ঢুকেই দ্বৈপায়ন গুটেকে দেখতে পেল।
