দ্বৈপায়নের বাবার ইলেকট্রনিক্সের বিশাল ব্যাবসা। ধর্মতলায় ওদের অফিস। দ্বৈপায়ন বি.এসসি পাশ করার পর বাবার সঙ্গে খানিকটা সময় ব্যাবসা দেখাশোনা করে, আর বাকি সময়টা নিজের মতো করে কাটায়। গত পনেরো বছর ধরে ও রোলার স্কেস পাগল। আর বছরচারেক হল কাছাকাছি এক বন্ধুর বাড়ির গ্যারেজে একটা জিমনাশিয়াম খুলেছে। সেখানে ইজি-ক্রাঞ্চ, ফ্লেক্সিবার, স্লিম ডিস্ক, টামি ট্রিমার, সুপার হাইট ইত্যাদি নানান ব্যায়ামের যন্ত্র রয়েছে। দ্বৈপায়ন সারাটা দিনই প্রায় রোলার স্কেট আর জিম নিয়ে মেতে থাকে। নেহাত বাবাকে শান্ত রাখতে ও ব্যবসার পিছনে কিছুটা সময় দেয়। এ ছাড়া ওর চলাফেরার সঙ্গী হল একটা মোটরবাইক। হয় মোটরবাইক নয় রোলার স্কেস চড়ে দ্বৈপায়ন সবসময় ঘুরে বেড়ায়। শান্তনু ওকে ঠাট্টা করে বলে, তোমার তো সবসময় হয় দু-চাকা নয় আট চাকা। ভগবান ভদ্রলোকের উচিত ছিল একেবারে গোড়া থেকেই পায়ে চাকা লাগিয়ে তোমাকে পৃথিবীতে পাঠানো।
বাজপাখির তাড়া খাওয়া চড়ুইয়ের মতো উদভ্রান্ত চোখে দ্বৈপায়নের দিকে তাকাল সীমা। ওই তো উৎকণ্ঠা-ভরা চোখে ওর দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দিপু। শান্তনু এই মুহূর্তে পাশে নেই তো কী হয়েছে! দিপু তো আছে!
কিন্তু পলাশের কথা আবার শুরু হতেই সীমন্তিনীর সব ভরসা যেন উবে গেল।
কী ব্যাপার, চুপ করে গেলে যে! চিনতে পারছ না নাকি! আমি পলাশ-তোমার বোকা বোকা হাজব্যান্ড শান্তনুর ক্লাসফ্রেন্ড।
সীমা সংবিৎ ফিরে পেল। দ্বৈপায়নের দিকে একপলক তাকিয়ে বলল, হ্যাঁ-হ্যাঁ। চিনতে পারব না কেন! উঃ, কতদিন পর আপনি ফোন করলেন। কিন্তু…কিন্তু ও তো এখন নেই… অফিসে গেছে…।
আজ কাজের দিন, অফিসে যাওয়াটাই তো স্বাভাবিক। ভরাট গলায় হাসল পলাশ ও সেইজন্যেই তো ওর সুন্দরী বউকে একা পেয়ে ফোন করছি। কেমন আছ তুমি, সীমন্তিনী?
শান্তনুকে দেখাশোনা করে বিয়ের আগে সীমায় কোনও প্রেমিক ছিল না। তবুও ওর মনে হল, পলাশের প্রশ্নের ধরনটা যেন প্রাক্তন প্রেমিকের মতো।
ও অস্বস্তি-ভরা সুরে কোনওরকমে জবাব দিল, ভালো আছি। আপনি?
টেলিফোনে দীর্ঘশ্বাস ফেলল পলাশ ও আমি ভালো নেই। আমার মাথায় একটা পিকিউলিয়ার ব্যথা হয়…সেটা কদিন ধরে খুব উৎপাত করছে।
দ্বৈপায়ন সীমার খুব কাছে এসে দাঁড়াল। টেলিফোনের রিসিভারের কাছে কান পেতে ও-প্রান্তের কথা শুনতে চেষ্টা করল।
সীমা তখন টেলিফোন নম্বর লেখা চিরকুটটার কথা ভাবছিল। ওটা তো পলাশ হারিয়ে ফেলেছে! তা হলে এখন ফোন করল কেমন করে? নম্বরটা কি ও মুখস্থ করে নিয়েছিল? নাকি অন্য কোথাও টুকে রেখেছিল?
এইসব ভাবতে-ভাবতেই সীমন্তিনীর মুখ দিয়ে হঠাৎ বেরিয়ে গেল কথাটা।
আমাদের ফোন নাম্বারটা আপনার মনে ছিল?
কেন? একথা বলছ কেন? পলাশ অবাক হয়ে জানতে চাইল।
চিরকুটটা তো আপনি হারিয়ে ফেলেছেন–। কথাটা মুখ দিয়ে বেরোনোমাত্রই সীমায় বুকের ভেতরে আচমকা যেন বাজ পড়ল।
ও-প্রান্তে পলাশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর আরও অবাক হয়ে সন্দেহের গলায় জিগ্যেস করল, ওটা হারিয়ে গেছে তুমি জানলে কেমন করে?
শীতের মধ্যেও সীমায় কপালে ঘামের বিন্দু ফুটে উঠল। ওর বুকের ভেতরে বরফের মতো ঠান্ডা জটিল জলস্রোত ঘুরপাক খেতে লাগল। ও অসহায়ভাবে দ্বৈপায়নের দিকে তাকাল। দ্বৈপায়ন
ওকে তাড়াতাড়ি জবাব দেওয়ার জন্য ইশারা করল।
সীমা কোনওরকমে বলল, ক্যালেন্ডারের পাতা ছেঁড়া ওইটুকুন এটা চিরকুট…আমি…আমি জানতাম ওটা হারিয়ে যাবে। তাই…ইয়ে..আন্দাজে বললাম। কেন, সত্যি-সত্যি হারিয়ে ফেলেছেন বুঝি?
কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকার পর পলাশ জবাব দিল, হু…তুমি ঠিকই ধরেছ। ওটা হারিয়ে ফেলেছি। তবে কোথায় যে হারালাম…কে জানে!
দ্বৈপায়ন সীমার বাহুতে হাত রাখল। টের পেল সীমা ভয়ে কাঁপছে। ও সীমাকে ছুঁয়ে থেকে ভরসা দিতে চাইল। ওর কানের খুব কাছে ঠোঁট নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বলল, ওঁকে বাড়িতে আসতে বলো। মনে নেই সেদিন অমল রায় কী বলে গেলেন! কুইক…।
সীমা কোনওরকমে হেসে বলল, প্রথমদিন আলাপ করেই বুঝেছিলাম আপনি খুব ভুললামনের মানুষ। সেই যে চলে গেলেন আর কোনও পাত্তাই নেই! কবে আসছেন বলুন। আপনাকে খাওয়ানোটা তো এখনও বাকি থেকে গেল সাহেবরা যাকে বলে ডিনার।
ও-প্রান্তে হেসে উঠল পলাশ। সীমার মনে হল, ও যেন আগের চেয়ে অনেক স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।
পলাশ বলল, তোমাদের ওখানে যাব তো নিশ্চয়ই…তবে আজ নয়। কোনও চিন্তা নেই তোমার–ফোন করে যাব।
সীমা হঠাৎই ছোট মেয়ের মতো বায়নার সুরে বলল, না, না, ওরকম বললে হবে না। আজকেই কথা দিতে হবে কবে আসছেন।
সীমা দিনক্ষণটা জানতে চাইছিল। সেটা জানতে পারলে পুলিশের সঙ্গে আগে যোগাযোগ করতে সুবিধে হবে। উৎকণ্ঠার মধ্যেও দ্বৈপায়নের আশ্বাস ওর ভালো লাগছিল।
পলাশ হেসে বলল, তোমাকে কথা দিচ্ছি যাব, তবে কবে কখন যাব এক্ষুনি হুট করে বলতে পারছি না। মাথার ব্যথাটা বড্ড ট্রাবল দিচ্ছে। যাকগে, শান্তনুকে বোলো আমি ফোন করেছিলাম। হঠাৎই ফোন রেখে দিল পলাশ।
বিমূঢ় ভয়ার্ত চোখে দ্বৈপায়নের দিকে তাকাল সীমন্তিনী।
দ্বৈপায়ন তখন পলাশ সান্যালের চেহারাটা সামনে দেখতে পাচ্ছিল। পুলিশ অফিসারদের কাছে পলাশের চেহারার বর্ণনা দিয়েছিল শান্তনু। তখন থেকেই ওর একটা ছবি তৈরি হয়েছে দ্বৈপায়নের মনে। সেই টাকমাথা ভারী চেহারার লোকটাকে ওর ভয়ঙ্কর এক শত্রু বলে মনে হচ্ছিল।
