কী কায়দা?
আমি নাম দিয়েছি ল্যাটো বনবন। এই দ্যাখো।
কথা শেষ হতে-না-হতেই দ্বৈপায়ন চাকা গড়িয়ে ডাইনিং স্পেস, করিডর আর বসবার ঘরে ঘুরতে লাগল। এইভাবে পথ চলে গতি বেশ খানিকটা বাড়তেই ও সীমার কাছাকাছি এসে এক পায়ে দাঁড়িয়ে পড়ার চেষ্টা করল।
তখনই একটা অদ্ভুত ব্যাপার হল। দ্বৈপায়নের শরীরটা অনেকটা ব্যালে নাচিয়ের মতো বনবন করে ঘুরতে শুরু করল।
বেশ কয়েক পাক ঘোরার পর দ্বৈপায়ন কাত হয়ে পড়ে যাচ্ছিল, সীমা কোনও কিছু না ভেবেই ওকে ধরে ফেলল।
দ্বৈপায়ন পারফিউমের গন্ধ পাচ্ছিল, আর খুব কাছাকাছি দেখতে পাচ্ছিল সীমন্তিনীর নিটোল মুখ। ওর হাত দ্বৈপায়নের বাহু আঁকড়ে ধরেছে। টানা-টানা চোখে স্পর্শকাতর আকুতি।
দ্বৈপায়ন নিজেকে সামলে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল, বলল, থ্যাংক য়ু, বউদি। দেখছি ল্যাটো বনবন টা এখনও আমার ভালো করে রপ্ত হয়নি।
সীমার ফরসা মুখে লালচে আভা। এক অদ্ভুত চোখে ও দ্বৈপায়নের দিকে তাকিয়ে ছিল। ঘন-ঘন শ্বাস পড়ছিল। আগুনের হলকা টের পাচ্ছিল কানে–যেন রাবণের চিতা জ্বলছে।
সীমা নীচু গলায় বলল, তোমার জন্যে একটু মিষ্টি আনাই।
দ্বৈপায়ন বাধা দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই সীমা বাসন্তী! বাসন্তী! বলে ডেকে উঠল। তারপর দ্বৈপায়নের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, মিষ্টিটা হচ্ছে তোমার ওই ল্যাটো বনবন এর প্রাইজ।
কাপড় কাচা ছেড়ে বাসন্তী হাত মুছতে মুছতে এসে দাঁড়াল। সীমন্তিনীর কাছ থেকে টাকা নিয়ে চলে গেল মিষ্টি নিয়ে আসতে।
মিষ্টির দোকান অনেক দূরে। দ্বৈপায়ন জানে, বাসন্তীর মিষ্টি নিয়ে ফিরতে অন্তত কুড়ি পঁচিশ মিনিট লাগবে। ওর কেমন যেন ভয়-ভয় করছিল।
বাসন্তী চলে যেতেই সীমা দরজা বন্ধ করে দিল। তারপর এসে দাঁড়াল দ্বৈপায়নের মুখোমুখি। সরাসরি তাকিয়ে রইল ওর চোখে।
দ্বৈপায়ন অস্বস্তি পাচ্ছিল। সীমার চোখ থেকে চোখ সরিয়ে নিচ্ছিল বারবার।
সীমা জিগ্যেস করল, দিপু, তোমার কাছে আমার কোনও দাম নেই?
আছে। ঘাড় নেড়ে বলল দ্বৈপায়ন।
তা হলে আমাকে নাম ধরে ডাকো।
দ্বৈপায়ন মাথা নীচু করে রইল।
ডাকো। নইলে আমার দিব্যি।
ইতস্তত করে দ্বৈপায়ন নীচু গলায় বলল, সীমা।
ওরকম না। পুরো নাম। সীমা জেদের সুরে বলল।
সীমন্তিনী। আলতো করে বলল দ্বৈপায়ন।
দ্বৈপায়নের গালে আঙুল ছোঁয়াল সীমা। ওর দিকে মুখ তুলে বলল, দিপু, তুমি আমাকে ভালোবাসো না?
দ্বৈপায়নের চোখ জ্বালা করছিল, বুকের ভেতরে ষাঁড়ের লড়াই চলছিল, গলাটা কেমন যেন বন্ধ হয়ে আসতে চাইছিল। ও কোনওরকমে অস্পষ্ট স্বরে বলল, হ্যাঁ, ভালোবাসি। তোমাকে ভালোবাসি, শান্তনুদাকে ভালোবাসি, গুটেকেও ভালোবাসি।
হাত সরিয়ে নিল সীমা। অভিমানের গলায় বলল, সবাইকে ভালোবাসার কথা বলছি না। আমি শুধু আমাকে ভালোবাসার কথা বলছি।
সেটা হয় না। নরম গলায় বলল দ্বৈপায়ন, তোমাকে আমি ভীষণ ভালোবাসি–তবে সেটা একটু অন্যরকম ভালোবাসা। আমার কোনও লাভার নেই। কেউ-কেউ ইন্টারেস্ট দেখালেও আমার মনে ধরেনি। কিন্তু তোমাকে আমার ভীষণ পছন্দ। শান্তনুদার আগে তোমার সঙ্গে দেখা হলে আমার জীবনটা অন্যরকম হয়ে যেত। হয়তো তোমারটাও।
সীমন্তিনী কেঁদে ফেলল, নির্লজ্জভাবে জাপটে ধরল দ্বৈপায়নকে। ওর বুকের আড়াল থেকে গোঙানির মতো দিপু! দিপু! করে ডেকে উঠছিল বারবার।
সীমার ভারে দ্বৈপায়নের রোলার স্কেসের চাকা সামান্য গড়িয়ে যাচ্ছিল। একটা পা আড়াআড়িভাবে সামান্য ঘুরিয়ে দ্বৈপায়ন সেটা রুখে দিল। তারপর একটু সময় দিয়ে সীমাকে সোজা করে দাঁড় করাল। ওর চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বলল, সীমা, ভালোবাসা অনেক বড় ঠিকই, তবে বিশ্বাস বোধহয় তার চেয়েও বড়।
সীমা সামনের একটা সোফায় মাথা নীচু করে বসে পড়ল, বিড়বিড় করে বলল, তুমি যে কী করেছ আমাকে! আমি কিছুতেই নরমাল হতে পারছি না। সবসময় তোমার কথা মনে পড়ে, তোমাকে চোখের সামনে দেখতে পাই। কান্না চাপার চেষ্টা করল সীমা, তারপর ভেজা চোখ তুলে দ্বৈপায়নের দিকে তাকিয়ে বলল, দিপু, তুমি এত ভালো কেন? আমার কষ্ট তুমি বুঝতে পারো না?
দ্বৈপায়ন সীমায় কাছে সরে এসে বলল, বুঝতে পারি। পারি বলেই আমার কষ্টটাও তোমাকে বোঝাতে চাই।
কলিং বেল বেজে উঠল। সঙ্গে-সঙ্গে নিজেকে সামলে নিল সীমা। দরজার কাছে গিয়ে দরজা খুলে দিল দ্বৈপায়ন।
বাসন্তী মিষ্টি নিয়ে ফিরে এসেছে।
মিষ্টির বাক্সটা বাসন্তীর হাত থেকে নিয়ে দ্বৈপায়ন বাক্স খুলল। তারপর প্রাইজ খেয়ে নিলাম বলে একটা সন্দেশ টপ করে মুখে পুরে দিল।
বাক্সটা সীমার দিকে এগিয়ে দিয়ে জড়ানো গলায় ও বলল, এই নাও, বাকি প্রাইজগুলো গুটের জন্যে।
বাসন্তী দ্বৈপায়নের কাণ্ড দেখে মিটিমিটি হাসছিল। সীমা একটা সন্দেশ বাসন্তীকে দিয়ে বলল, এটা খেয়ে নে।
সন্দেশটা নিয়ে সীমাকে বলে বাসন্তী বাথরুমের দিকে চলে গেল।
আর ঠিক তখনই টেলিফোন বেজে উঠল।
সীমা উঠে গিয়ে ফোন ধরল।
হ্যালো।
পলাশ সান্যাল বলছি। ও-প্রান্ত থেকে পলাশের হাসিখুশি স্বর শোনা গেল।
চোখের পলকে সীমার মুখটা ছাইয়ের মতো সাদা হয়ে গেল। এতদিন ধরে ও আর শান্তনু প্রতিটি মুহূর্তে পলাশের ফোনের জন্য অপেক্ষা করেছে। শান্তনু রোজ অফিসে গিয়ে সকাল-বিকেল বাড়িতে ফোন করেছে। জানতে চেয়েছে, পলাশের ফোন এসেছে কি না। ওই দুই অফিসারের কাছে পলাশের ব্যাপারে সবকিছু শোনার পর শান্তনু এত ভয় পেয়ে গিয়েছিল যে, ও কিছুদিন অফিস কামাই করে বাড়িতে বসে থাকতে চেয়েছিল। কিন্তু সীমা সেটা হতে দেয়নি। বহু তর্ক বিতর্কের পর ও শান্তনুকে অফিস যাওয়ার ব্যাপারে রাজি করাতে পেরেছিল। ও বলেছিল, দ্বৈপায়ন যখন আছে তখন শান্তনুর অফিস কামাই করার দরকার নেই।
