শান্তনু একমনে সিগারেটে টান দিয়ে যাচ্ছিল, ফ্যাকাসে মুখে তাকিয়ে ছিল সামনের খোলা জানলার দিকে। বোধহয় পলাশের নতুন অবিশ্বাস্য চেহারাটার কথা ভাবতে চাইছে।
টেবিলে রাখা খবরের কাগজটা নাড়াচাড়া করতে করতে বিজয় মিত্র বললেন, মিস্টার সেনগুপ্ত, আমরা আপনাদের ওপর খুব ডিপেন্ড করছি। আপনি ফোন নাম্বারটা পলাশ সান্যালকে লিখে দিয়েছেন দিন পনেরো আগে, আর সেটা আমরা পেয়েছি মাত্র চারদিন আগে মার্ডার স্পটে। চিরকুটটা দশদিনেরও বেশি সময় ধরে কেন পলাশবাবুর পকেটে ছিল বলতে পারব না। তবে এটা খুবই অস্বাভাবিক যে, পলাশবাবুর কাছ থেকে ওটা চলে গেছে আসল মার্ডারারের কাছে, আর পলাশবাবু নির্দোষ। উঁহু মাথা নাড়লেন ঘন-ঘনঃ হি ইজ আওয়ার গাই। যেহেতু আমাদের কাছে আর কোনও ব্লু নেই তাই অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনও পথও নেই।
সিগারেট অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিয়ে শান্তনু এবার নড়েচড়ে বসল : কীসের অপেক্ষা?
পলাশ সান্যাল কবে আবার আপনাদের ফোন করে, বা আপনাদের বাড়িতে আসে– তার অপেক্ষা।
আপনার কী মনে হয় ও ফোন করবে বা আসবে?
আমার মন বলছে সে আসবে… চোখ তুলে সীমন্তিনীর দিকে একপলক তাকালেন বিজয় মিত্রঃ কারণ আপনার স্ত্রী সুন্দরী। কিছু মনে করবেন না, মিস্টার সেনগুপ্ত–রেপিস্টদের সাইকোলজি যা একটু-আধটু ঘেঁটে দেখেছি তাতে বুঝেছি ওদের মধ্যে মাঝে-মাঝে লোভ মাথাচাড়া দেয় সুন্দরী মহিলাদের সঙ্গ পাওয়ার লোভ। কেউ-কেউ আবার হঠাৎ-হঠাৎ ভায়োলেন্ট হয়ে ওঠে। পলাশ সান্যাল কী টাইপের জানি না, তবে সে যদি যোগাযোগ করে তা হলে আমি মোটেই অবাক হব না।
চিরকুটটা তো ওর কাছে আর নেই। ফোন নাম্বারটা ওর কি মনে থাকবে? আমতা আমতা করে শান্তনু প্রশ্ন করল। ওর মুখের রং কিছুতেই ফিরে আসছে না।
থাকতেও পারে। হয়তো আগেই অন্য কোথাও টুকে রেখেছে।
যদি পলাশদা আবার ফোন করে বা হঠাৎ চলে আসে তা হলে কী করব? সীমন্তিনী ভয়ের গলায় জিগ্যেস করল।
দুটো ফোন নাম্বার আপনাদের দিচ্ছি। পলাশ সান্যাল এলে তাকে যে-কোনও ছলছুতোয় আটকে রাখবেন। আর এক ফাঁকে এই দুটো নাম্বারের একটায় আমাকে ফোন করে জানিয়ে দেবেন। আমাকে না পেলে ফোনে আপনাদের নাম বলে মেসেজটা দিয়ে দেবেন–বলবেন ইমারজেন্সি– তা হলেই ওরা আমাকে মোবাইল নাম্বারে কনট্যাক্ট করে নেবে।
পকেট থেকে একটা কার্ড বের করে তাতে ফোন নম্বরগুলো লিখলেন বিজয় মিত্র। তারপর কার্ডটা শান্তনুর হাতে দিলেন।
কার্ডটা নিতে গিয়ে শান্তনুর হাতটা সামান্য কেঁপে গেল। পলাশকে ও একজন ভয়ঙ্কর রেপিস্ট ও নৃশংস খুনি হিসেবে ভাবতে চেষ্টা করল।
বিজয় মিত্র ও অমল রায় উঠে দাঁড়ালেন।
সকলেরই মুখ থমথমে–যেন এইমাত্র কোনও শোকসভা শেষ হল।
দরজার কাছে পৌঁছে সীমন্তিনীর ভয়ার্ত মুখের দিকে তাকালেন বিজয় মিত্র। স্মিত হেসে বললেন, ভয় পাবেন না, মিসেস সেনগুপ্ত–আমরা তো আছি। তবে পলাশ সান্যালকে ধরাটা খুব ভাইটাল নইলে আরও বহু মেয়ের সর্বনাশ হবে। কারণ, লোকটার কোনও বাছবিচার নেই। ওর প্রথম ভিকটিমের বয়েস ছিল মাত্র ষোলো ফুটফুটে এক কিশোরী…।
সীমন্তিনীর কানে হঠাৎই এক অলৌকিক সাইরেন বেজে উঠল। ওর মাথাটা কেমন চক্কর দিল। তারই মধ্যে আবছাভাবে বিজয় মিত্রের শেষ কথাটা শুনতে পেল ও।
আপনাদের ওপরে আমরা খুব ডিপেন্ড করছি কিন্তু।
.
আরও কুড়িদিন কেটে যাওয়ার পর, শান্তনু আর সীমন্তিনী যখন ভাবতে শুরু করেছে। পলাশ আর কখনও যোগাযোগ করবে না, ঠিক সেই সময়ে পলাশের ফোনটা এল।
রোজ সকাল নটার মধ্যে শান্তনু অফিসে বেরিয়ে যায়। তখন একঘণ্টা সময় হাতে পায় সীমন্তিনী। তারপর, দশটা বাজলেই, ও গুটেকে স্কুল থেকে নিয়ে আসার জন্য তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়ে। রান্নার ঝামেলা সকালেই প্রায় মিটে যায়। যেটুকু বাকি থাকে সেটুকু সীমা সেরে নেয় এগারোটার পর।
বসবার ঘরে বসে সীমা টেপ রেকর্ডার চালিয়ে কুছ কুছ হোতা হ্যায় ছবির গান শুনছিল। বাসন্তী বাথরুমে কাপড় কাচছে কলের জল পড়ার আওয়াজ, কাপড় কাঁচার শব্দ, সবই শোনা যাচ্ছে এ-ঘর থেকে।
এমন সময় কলিং বেল বেজে উঠল।
টেপ রেকর্ডারের গানের কলি কানে আসছিল সীমার।
তুম পাস আয়ে
ইয়ু মুসকুরায়ে
তুমনে না জানে কেয়া
সপনে দিখায়ে…
ওর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। ও যার কথা ভাবছে নিশ্চয়ই সে এসেছে।
দরজা খুলতেই সীমা দেখল ওর অনুমান সত্যি। দ্বৈপায়ন দরজায় দাঁড়িয়ে।
ওর মাথার আঁকড়া চুল এলোমেলো। ফরসা সজীব মুখে সরল হাসি। পরনে কউল জাতীয় কাপড়ের চেক-চেক টি-শার্ট আর নীল রঙের জিন্স। পায়ে রোলার স্কেস লাগানো। ওর শরীর চাবুকের মতো টান-টান হয়ে দাঁড়িয়ে। যেন যে-কোনও লড়াইয়ের জন্য তৈরি।
এসো, ভেতরে এসো–। দ্বৈপায়নকে ভেতরে ডাকল সীমন্তিনী। ওর বুকের ভেতরে উলটোপালটা কীসব হচ্ছিল যেন।
দ্বৈপায়ন চাকা গড়িয়ে ভেতরে ঢুকতেই সীমা দরজা বন্ধ করে দিল। তারপর টেপটা অফ করে দিয়ে মজা করে জিগ্যেস করল, কী ব্যাপার, পায়ে চাকা লাগানো কেন?
দ্বৈপায়ন টেপের গানের সঙ্গে গলা মিলিয়ে গুনগুন করল, কুছ কুছ হোতা হ্যায়। তারপর সীমার প্রশ্নের জবাবে বলল, বহুদিন চেষ্টার পর স্কেসে একটা নতুন কায়দা রপ্ত করেছি– সেটা তোমাকে দেখাতে এলাম।
