অমল রায় ও বিজয় মিত্র এরপর নোট প্যাড বের করে শান্তনু আর সীমন্তিনীকে নানান প্রশ্ন করতে লাগলেন, আর দরকার মতো প্যাডে নোট নিতে লাগলেন।
দ্বৈপায়ন হতবাক হয়ে গোটা ব্যাপারটার নীরব সাক্ষী হয়ে রইল।
ওঁদের জিজ্ঞাসাবাদের ধকল শেষ হলে সীমা প্রশ্ন করল, পলাশদার কি কোনও অ্যাসিডেন্ট হয়েছে?
অ্যাসিডেন্ট! বিজয় মিত্র হেসে ফেললেন : আপনি যা ভাবছেন তা নয়, ম্যাডাম। সেরকম হলে আমরা ফোন করেই কাজ সেরে নিতাম, সাতসকালে কষ্ট করে এসে আপনাদের বিরক্ত করতাম না। মিত্র একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেনঃ ব্যাপারটা খুবই সিরিয়াস। একইসঙ্গে বিপজ্জনক..আপনাদের পক্ষে…।
দ্বৈপায়ন উৎকণ্ঠার শেষ সীমায় এসে পৌঁছেছিল। ও আর থাকতে না পেরে বলল, প্লিজ, ব্যাপারটা আমাদের খুলে বলুন।
বিজয় মিত্র অমল রায়ের দিকে তাকালেন, একটু সময় নিয়ে বললেন, রায়, আপনাকে তো সব বলেছি, আপনিই ব্যাপারটা ওঁদের খোলসা করে বলুন।
অমল রায় টেবিলে বারকয়েক টোকা মেরে মাথা নাড়লেন। তারপর বলতে শুরু করলেন, মিস্টার সেনগুপ্ত, আপনারা নিয়মিত খবরের কাগজ পড়েন নিশ্চয়ই, কিন্তু একটা খবর খেয়াল করেছেন কি না জানি না। গত ছমাসে কলকাতায় তিন-তিনটে রেপ অ্যান্ড মার্ডারের ঘটনা ঘটেছে। প্রথমটা ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে, দ্বিতীয়টা কসবায়, আর শেষ ঘটনাটা মাত্র চারদিন আগের মানে, গত শনিবার রাতে ইস্টার্ন বাইপাসের চিংড়িঘাটা এলাকায় হয়েছে।
তিনটে ঘটনার মধ্যে এমন কিছু কিছু মিল আমরা খুঁজে পেয়েছি যাতে মনে হয় কাজটা একই লোকের। যেমন, তিনটে ঘটনাই ঘটেছে সন্ধের পর, রাতে। অবশ্য এটা নেহাতই স্বাভাবিক ব্যাপার যে, এসব অপকর্ম অন্ধকারেই হবে। তবে দ্বিতীয় মিলটা বেশ অদ্ভুত। রেপ করে মার্ডার করার পর মার্ডারার মেয়েগুলোর পোশাক-আশাক আবার বেশ সময় নিয়ে ঠিকঠাক করে দিয়েছে। এছাড়া তিনজনেরই গলায় আর গালে কামড়ের চিহ্ন পাওয়া গেছে। আর প্রত্যেককে খুন করা হয়েছে গলা টিপে।
তিনজন ভিকটিমের গড় বয়েস চব্বিশ-পঁচিশ। তিনজনেরই বেশ অ্যাট্রাকটিভ চেহারা ছিল। ফোরেনসিক রিপোর্টে তিনটে কেসের মধ্যে আরও অনেক সিমিলারিটি পাওয়া গেছে। তাই আমরা এই ডিসিশানে এসে পৌঁছেছি যে, তিনটে রেপ অ্যান্ড মার্ডার একই লোকের কাজ। এ-ব্যাপারে এখনও আমরা কাউকে ট্র্যাক ডাউন করতে পারিনি বলে লালবাজারের হোমিসাইড স্কোয়াড বেশ অস্বস্তির মধ্যে রয়েছে।
অমল রায় একটু থামলেন। সিগারেটে কয়েকবার গভীর টান দিলেন। অনুসন্ধানী নজরে শান্তনু, সীমন্তিনী আর দ্বৈপায়নকে জরিপ করলেন। যেন ওদের প্রতিটি অভিব্যক্তির খুঁটিনাটি মানে বুঝে নিতে চাইলেন। তারপর সামান্য কেশে নিয়ে কথায় খেই ধরে বলতে শুরু করলেন?
চিংড়িঘাটার কেসটা আপনাদের একটু বলি। যে-মেয়েটি মারা গেছে ঝরনা সামন্ত–ও কাছাকাছি একটা ঝুপড়িতে থাকত। গায়ের রং কালো হলেও চেহারা নজর কাড়ার মতো। সন্ধের পর ও যাদবপুর ইউনিভার্সিটির সেকেন্ড ক্যাম্পাস ছাড়িয়ে খালধারে বোধহয় শুকনো ডালপালা জোগাড় করতে গিয়েছিল কারণ, ওর সঙ্গে একটা বস্তা ছিল। আপনারা ওদিকটায় কখনও গেছেন কিনা জানি না, তবে জায়গাটা ভীষণ নির্জনতা ছাড়া ওখানে একটা খাল আছে, খালের ধারে অনেক আগাছা আর গাছের ভিড় জঙ্গলের মতন। সেদিন খালের বাঁদিকটায় কাছাকাছি একটা বিশাল জমির আগাছা সাফ করার জন্যে কিছু লেবার সেই আগাছায় আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। ফলে দাবানলের মতো দাউদাউ করে আগুন জ্বলছিল সেখানে। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা সেই আগুন দেখতে ভিড় করেছিল। আমরা খোঁজ নিয়ে জেনেছি, ঝরনা সেখানে ছিল। তখন সময় প্রায় সাড়ে ছটা হবে। শীতের সময়…বুঝতেই পারছেন, সাড়ে ছটা মানে বেশ অন্ধকার। তার ওপর আগুন নিভতে আরও কিছুটা সময় লেগেছিল।
সিগারেট শেষ হয়ে আসায় অমল রায় জ্বলন্ত টুকরোটা গুঁজে দিলেন অ্যাশট্রেতে। তারপর লম্বা করে ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, আগুন নিভে যাওয়ার পর জায়গাটা আবার নির্জন অন্ধকার হয়ে যায়। তখন ঝরনা বোধহয় খালধারের দিকে চলে যায়। ব্যস, তারপর সব শেষ।
শান্তনু, সীমন্তিনী আর দ্বৈপায়ন মন্ত্রমুগ্ধের মতো অমল রায়ের কথা শুনছিল। তিনি থামতেই দ্বৈপায়ন জিগ্যেস করল, কিন্তু শান্তনুদা এর মধ্যে এল কোত্থেকে?
সামান্য হাসলেন অমল রায়, তারপর বললেন, ডেডবডির শাড়ির ভাঁজে আমরা এই চিরকুটটা পেয়েছি। এটার কথা আমরা মিডিয়াকে ফ্ল্যাশ করিনি। এই সিরিয়াল কিলার ও রেপিস্টকে ধরার এটাই একমাত্র পজিটিভ ক্লু। এই সূত্র ধরেই কেসগুলো আমরা সম্ভ করতে চাই।
বিজয় মিত্র এবার মুখ খুললেন, আমাদের বিশ্বাস আপনার স্কুলের বন্ধু পলাশ সান্যালই হল আসল কালপ্রিট। আর তাকে ধরতে হলে আপনাদের সাহায্য আমাদের কাছে ভীষণ জরুরি। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন মিত্র, তারপর ও ব্যস, এই হল পুরো গল্প।
সীমন্তিনীর মুখ ছাইয়ের মতো সাদা হয়ে গিয়েছিল। অর দ্বৈপায়নের বুকের ভেতরে গুড়গুড় করে যেন ঢাক বাজতে শুরু করল। পলাশ সান্যালকে ও কখনও দ্যাখেনি। কিন্তু একজন রেপিস্ট ও মার্ডারার শান্তনুদার স্কুলের বন্ধু এটা ভাবতেই ওর কেমন লাগছিল।
সীমা বিজয় মিত্রের কাছাকাছি এগিয়ে এল, অসহায়ভাবে জিগ্যেস করল, আমরা তা হলে এখন কী করব?
