অমল রায় ব্যাজার মুখ করে তার ছাইরঙা জ্যাকেটের পকেট থেকে একটা খাম বের করলেন। নিস্পৃহ মুখে খাম খুলে একটা চিরকুট বের করে এগিয়ে দিলেন শান্তনুর দিকে।
চিরকুট হাতে নেওয়ামাত্রই সবকিছু মনে পড়ে গেল শান্তনুর। ও মুখ ফিরিয়ে তাকাল দেওয়ালে ঝোলানো বড়-বড় তারিখ ছাপা একটা ক্যালেন্ডারের দিকে। ছবিহীন ক্যালেন্ডার, বারো মাসের জন্য বারোটা পৃষ্ঠা।
দ্বৈপায়ন গলা উঁচু করে চিরকুটের লেখাটা দেখতে চেষ্টা করল। শান্তনুর হাতের লেখা খুব সুন্দর। সেই সুন্দর হরফেই লেখা রয়েছে শান্তনু সেনগুপ্ত / ৩৩৭-৪৫৩৬।
ও শান্তনুকে উদ্দেশ করে চাপা গলায় বলল, শান্তনুদা, এটা তো আপনারই হাতের লেখা। কাকে লিখে দিয়েছিলেন মনে পড়ছে না?
শান্তনু মাথা নাড়লঃ হ্যাঁ, বেশ মনে পড়ছে। চিরকুটটা ওই ক্যালেন্ডরটার পাতা থেকে ছিঁড়ে নেওয়া। হাতের কাছে কিছু না পেয়ে ওখান থেকে একটুকরো কাগজ ছিঁড়ে নিয়েছিলাম।
সঙ্গে-সঙ্গে সীমন্তিনীরও সবকিছু মনে পড়ে গেল। দ্বৈপায়ন লক্ষ করল, সীমার ফরসা মুখে হালকা গোলাপি ছোপ।
নাম আর ফোন নাম্বারটা কাকে লিখে দিয়েছিলেন? অমল রায় জিগ্যেস করলেন। তারপর চিরকুটটা শান্তনুর হাত থেকে নিয়ে উঠে গেলেন ক্যালেন্ডারটার কাছে। ছেঁড়া পাতাটা খুঁজে বের করে ওটা খাঁজে খাঁজে মিলিয়ে পরখ করে দেখলেন।
শান্তনু বলল, দিন পনেরো আগে আমার এক বন্ধু এ-বাড়িতে এসেছিল। এই চিরকুটটা আমি ওকে দিয়েছিলাম।
বন্ধুর নাম কী? বিজয় মিত্র নরম গলায় জানতে চাইলেন।
পলাশ–পলাশ সান্যাল।
অমল রায় বসবার ঘরের জানলার সামনে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরাচ্ছিলেন। সিগারেট ঠোঁটে নিয়েই জড়ানো স্বরে জিগ্যেস করলেন, কীরকম বন্ধু?
কীরকম বন্ধু মানে? বিরক্ত হয়ে প্রশ্ন করল শান্তনু।
আহা, রাগ করছেন কেন, মিস্টার সেনগুপ্ত! বিজয় মিত্র পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেনঃ আমরা অ্যাকচুয়ালি আপনার বন্ধু সম্পর্কে একটু ইন্টারেস্টেড। তাই জানতে চাইছি। শুধু-শুধু এক্সাইটেড হচ্ছেন কেন?
অমল রায় ফিরে এসে সোফায় বসলেন এবং একইসঙ্গে মন্তব্য করলেন, এক্সাইটেড হয়েও তো কোনও লাভ নেই। আমরা আমাদের কাজ করবই। তারপর সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে? হ্যাঁ, মিস্টার সেনগুপ্ত, এবার বলুন–পলাশ সান্যাল সম্পর্কে আপনি কী জানেন?
শান্তনু একটা সিগারেট ধরাল। ওর মাথার ভেতরটা কেমন করছিল। পলাশ সম্পর্কে ও কতটুকু জানে?
ভালো করে ভাবতে গিয়ে দেখল, প্রায় কিছুই না। পলাশ মেট্রোপলিটন স্কুলে ওর সঙ্গে পড়ত। ক্লাসে পলাশের সঙ্গে ওর তেমন একটা বন্ধুত্ব ছিল না। তারপর, স্কুল শেষ হতেই, ছাড়াছাড়ি। বিশ-বাইশটা বছর কোথা দিয়ে যেন গড়িয়ে গেছে। পলাশকে শান্তনু একেবারে ভুলেই গিয়েছিল।
কিন্তু হঠাৎই সেদিন–মাসদেড়েক আগে সন্ধেবেলা উলটোডাঙা-ভি.আই.পি. রোডের মোড়ে পলাশের সঙ্গে আচমকা দেখা। শান্তনু পলাশকে একটুও চিনতে পারেনি। পলাশই ওকে নাম ধরে ডেকেছিল।
তারপর ফুটপাথের কিনারায় দাঁড়িয়ে স্কুলের গল্প, বন্ধুদের গল্প, স্যারদের গল্প। শেষ পর্যন্ত অচেনা মানুষটাকে শান্তনু পলাশ বলে মেনে নিয়েছিল।
কথায় কথায় শান্তনু ওকে নিজের বিয়ের কথা, নতুন ফ্ল্যাট কেনার কথা বলেছিল। বলেছিল, একদিন সময় করে মিসেসকে নিয়ে চলে আয়।
উত্তরে হেসে পলাশ বলেছিল, একাই আসব কারণ, আমার পিকিউলিয়ার জীবনটা এখনও একলা চলো রে।
শান্তনু ভাবেনি পলাশ সত্যি-সত্যিই ওর ফ্ল্যাটে আসবে।
কিন্তু পলাশ এসেছিল। প্রায় দু-ঘন্টা ছিল। হাসি-ঠাট্টা-গল্পে সীমা আর মিমোকে একদম মাতিয়ে দিয়েছিল। ও চলে যাওয়ার পর সীমা বলেছিল, তোমার বন্ধু খুব মজার। ওঃ, কতদিন পর প্রাণ খুলে হাসতে পারলাম।
পলাশকে ওরা সবাই আবার আসার জন্য বারবার করে বলেছিল। পলাশও কথা দিয়েছিল সুযোগ পেলেই আসবে। সীমা বলেছিল ফোন করে আসতে। কারণ, আগে থেকে জানা থাকলে ও পলাশকে রাতের খাওয়া খাইয়ে তবে ছাড়বে। পলাশ হেসে বলেছিল, সাহেবরা যাকে বলে ডিনার? বলেই হো-হো করে গলা ফাটানো হাসি। তারপর ও কথা দিয়েছে, আবার আসবে।
সেদিন দু-ঘণ্টা আড্ডার পর স্কুলের পলাশ সান্যালকে যেন ধীরে-ধীরে খুঁজে পাচ্ছিল শান্তনু। স্কুলের সেই রোগা ময়লা চেহারার লাজুক ছেলেটাকে ও যেন অস্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছিল।
তারপরই এখনকার পলাশের চেহারাটা ভেসে উঠল শান্তনুর চোখের সামনে। ভারী শরীর, মাথায় টাক, চোখে চশমা, কঁচাপাকা গোঁফ। ঘন-ঘন সিগারেট খায়। কারণে-অকারণে দরাজ গলায় হেসে ওঠে। সব মিলিয়ে বেশ দিলখোলা বলে মনে হয়। তবে শান্তনু স্পষ্ট লক্ষ করেছিল, চশমার কাচের আড়ালে পলাশের চোখের মণি বেশ সতর্ক আর চঞ্চল–সবসময়েই কী যেন খুঁজছে।
পলাশের সঙ্গে এত গল্প করেছে ওরা, কিন্তু ওর সম্পর্কে কিছুই জানা হয়নি–কোথায় থাকে, কোথায় চাকরি করে, বাড়িতে আর কে-কে আছে।
সীমন্তিনী দু-একবার সেসব প্রসঙ্গ তুলেছিল বটে, কিন্তু পলাশের অন্য সব কথাবার্তায় সেগুলো চাপা পড়ে গেছে।
নাকি পলাশ ইচ্ছে করে সেসব প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেছে?
কিন্তু কেন?
বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে সীমন্তিনীর দিকে একবার তাকাল শান্তনু। তারপর নীচু গলায় বলল, ও…আমার সঙ্গে স্কুলে পড়ত…হঠাৎ রাস্তায় দেখা…প্রায় বিশ বছর পর। একদিন মাত্র এখানে এসেছিল…তেমন একটা কিছু…ইয়ে…মানে, জানা হয়নি।
