গুটে হেসে বলল, মোটেই না। মা তোমাকে একটুও বকবে না। মা তোমাকে ভালোবাসে।
গুটের শেষ কথাটা দ্বৈপায়নকে যেন একটা ধাক্কা দিল।
বাড়ির কাছে এসে দ্বৈপায়ন দেখল, নীল মারুতিটা ওদের সদর দরজাতেই দাঁড়িয়ে আছে। গুটে শক্তিমান সিরিয়াল নিয়ে আপনমনে বকবক করে যাচ্ছিল। গাড়িটা দেখামাত্রই ও চুপ করে গেল। তারপর দ্বৈপায়নের মুখের দিকে একপলক তাকিয়ে বলল, গাড়িটা কী সুন্দর দ্যাখো! আমি বাপিকে বলেছি একটা নীল রঙের মারুতি কিনতে।
দ্বৈপায়ন ছোট্ট করে হু বলে পা থেকে রোলার স্কে খুলতে লাগল।
তিনতলায় গুটেদের ফ্ল্যাটে পৌঁছে ও দেখল দরজা সামান্য খোলা। ফাঁক দিয়ে বসবার ঘর দেখা যাচ্ছে। সেখানে সোফায় মারুতি গাড়ির একজন ভদ্রলোক বসে আছেন।
দ্বৈপায়ন বউদি বলে ডেকে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। তখনই ড্রইং স্পেসের সম্পূর্ণ ছবিটা ওর নজরে ধরা পড়ল।
নব্বই ডিগ্রি কোণে সাজানো দুটো সোফায় মারুতি গাড়ির দুজন ভদ্রলোক বসে আছেন। তাদের একজনের হাতে সিগারেট। ওদের সামনে আর-একটা সোফায় গুটের বাবা শান্তনু বসে আছে। তার ঠিক পিছনে গুটের মা সীমন্তিনী দাঁড়িয়ে।
দ্বৈপায়নের ডাকে সীমন্তিনী দরজার দিকে ফিরে তাকিয়েছিল। তখনই দ্বৈপায়ন খেয়াল করল সীমাবউদির মুখটা কেমন ফ্যাকাসে। মুখের সৌন্দর্যে আশঙ্কা আর উৎকণ্ঠা আঁচড় কেটেছে।
গুটে মাকে দেখামাত্রই বলে উঠল, আজ অনেকটা শিখে গেছি। দু-মাস পর আমি রোলার এস্কেট কিনব। তাই না, দিপুদা?
দ্বৈপায়ন সীমার দিকে তাকিয়ে কেমন আনমনা হয়ে পড়েছিল। গুটের কথায় যেন ঘুম থেকে জেগে উঠে বলল, হ্যাঁ, কিনিস। এখন ভেতরে যা হাত-মুখ ধুয়ে পড়তে বসে যা
সীমাও ছেলেকে ভেতরে যেতে বলল। ওদের দিন-রাতের কাজের মেয়ে বাসন্তী একটু দূরে রান্নাঘরের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। রং ময়লা। গায়ে রঙিন ফুল-ফুল ছাপা ফ্রক।
গুটে জুতো খুলে ওর কাছে চলে গেল।
দ্বৈপায়ন চলে আসতে যাবে, সীমন্তিনী ওকে ডাকল, দিপু, তুমি একটু থেকে যাও। তারপর সোফায় বসা অপরিচিত দুই ভদ্রলোকের দিকে ইশারা করে ও চাপা গলায় বলল, ওঁরা পুলিশের লোক…সল্ট লেক থানা আর লালবাজার থেকে এসেছেন।
দ্বৈপায়নের ভুরু কুঁচকে গেল। ও সীমার আকুল মুখের দিকে দেখল। তারপর রোলার স্কেট-জোড়া দরজার একপাশে নামিয়ে রেখে ঢুকে পড়ল বসবার ঘরের এলাকায়।
সীমন্তিনী দ্বৈপায়নকে দেখিয়ে অপরিচিত দুই ভদ্রলাককে লক্ষ করে ইতস্তত করে বলল, ইনি দ্বৈপায়ন বসু–আমাদের ফ্যামিলি ফ্রেন্ড–সামনের ফ্ল্যাটে থাকেন।
দ্বৈপায়ন একটা মোড়া টেনে নিয়ে বসল।
যে-ভদ্রলোক সিগারেট খাচ্ছিলেন তিনি কাঠ-কাঠ গলায় বললেন, আমার নাম অমল রায় সল্ট লেক থানা, সাউথ। আর ইনি– সঙ্গীর দিকে ইশারা করে ও বিজয় মিত্র–হোমিসাইড স্কোয়াড, লালবাজার। আমরা একটা ব্যাপারে শান্তনুবাবুকে সামান্য জিজ্ঞাসাবাদ করতে এসেছি।
দ্বৈপায়ন সাদা-পোশাকের দুই অফিসারকে বেশ খুঁটিয়ে দেখল।
অমল রায়ের গায়ের রং কালো, চোয়াড়ে চেহারা, মাথায় সামনের দিক থেকে টাক পড়তে শুরু করেছে, চোখ ছোট-ছোট। সব মিলিয়ে কেমন একটা রুক্ষ ভাব।
ওঁর সঙ্গী বিজয় মিত্রের ব্যাপারটা ঠিক উলটো। বছর পঞ্চাশের মোটাসোটা ফরসা চেহারা, গোলগাল মুখে সবসময়েই এক টুকরো হাসি লেগে আছে, চোখে চশমা, মাথায় কেঁকড়ানো চুল, যথেষ্ট ভুড়ি আছে–দেখে মনে হয় ভোজনবিলাসী।
বাসন্তী ট্রে-তে করে চা-বিস্কুট দিয়ে গেল সবার জন্য। সীমন্তিনী অতিথিদের অনুরোধ করল, নিন, চা খান।
দ্বৈপায়নও চায়ের কাপ তুলে নিয়ে চুমুক দিল। তারপর শান্তনুর দিকে তাকাল।
শান্তনুর বয়েস সাঁইতিরিশ-আটতিরিশ হবে–দ্বৈপায়নের চেয়ে বছর আট-নয়ের বড়। স্টেট ব্যাঙ্কে ভালো চাকরি করে। তা ছাড়া মানুষটাও ভালো। সিগারেট আর তাস ছাড়া অন্য কোনও নেশা নেই। এই ফ্ল্যাটে এসেছে সাত-আট মাস। দ্বৈপায়নরা এই ফ্ল্যাট-বাড়ির সবচেয়ে পুরোনো বাসিন্দা। তাই এই এলাকার যে-কোনও ব্যাপারে দ্বৈপায়নই ওদের গাইড।
কিন্তু পুলিশ হঠাৎ এখানে এসেছে কী ব্যাপারে?
সিগারেট শেষ করে অমল রায় টুকরোটা টেবিলে রাখা অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিলেন। তারপর শান্তনুকে প্রশ্ন করলেন, আপনারা এ-ফ্ল্যাটে এসেছেন কতদিন?
মনে-মনে হিসেব কষে নিয়ে শান্তনু বলল, প্রায় সাড়ে সাত মাস।
আপনাদের ফোন কি নতুন এসেছে?
হ্যাঁ–সবে মাসখানেক পেরিয়েছে। শান্তনু সমর্থনের আশায় সীমার দিকে তাকাল।
সীমা ছোট্ট করে ঘাড় নেড়ে বলল, এখনও প্রথম বিল আসেনি।
আপনারা ফোন নাম্বার কাউকে দিয়েছেন?
হ্যাঁ। নতুন ফোন এলে সেটাই তো স্বাভাবিক।
শান্তনুর কথায় যে-খোঁচা ছিল সেটা অমল রায় গায়ে মাখলেন না। বিজয় মিত্র টেবিলে রাখা খবরের কাগজের হেডলাইনের দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে ছিলেন। মনে-মনে কিছু ভাবছিলেন কি না বোঝা গেল না।
শান্তনুর দিকে না তাকিয়েই বিজয় মিত্র বললেন, একটা চিরকুটে আপনার নাম আর ফোন নাম্বার লিখে কাউকে দিয়েছিলেন?
শান্তনু কেমন যেন দিশেহারা হয়ে ভাবতে শুরু করল। কিছুক্ষণ পর ইতস্তত করে বলল, হয়তো দিয়েছি–স্পেসিফিক কিছু মনে পড়ছে না।
বিজয় মিত্র স্বাভাবিক গলায় সঙ্গীকে উদ্দেশ করে বললেন, রায়, চিরকুটটা ওঁকে দেখান।
