সল্ট লেক এলাকাটা এমনিতেই নির্জন। তার ওপর রবিবারের এই সাতসকালে এলাকাটাকে পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন বলে মনে হচ্ছিল। নিস্তব্ধ পরিবেশে দ্বৈপায়নের রোলার স্কেটল্স-এর চাকার ঘর্ঘর শব্দ কানে বাজছিল। আর রিবক-এর ট্র্যাক সুট ভেদ করে ঠান্ডা যেন ঢুকে পড়ছিল বুকের ভেতরে।
একটু দূরেই কাঠগোলাপ গাছটাকে দেখতে পেল দ্বৈপায়ন। গাছে বড়-বড় সাদা ফুল ফুটে আছে। কিছু ছড়িয়ে পড়েছে রাস্তায়।
গাছের নীচে রিকশা-স্ট্যান্ড। সেখানে মাত্র একটি সাইকেল রিকশা দাঁড়িয়ে। রিকশাওয়ালা চাদর মুড়ি দিয়ে প্রায় কবন্ধ সেজে ঠান্ডার সঙ্গে লড়াই করছে।
একটা লাল রঙের হুন্ডাই গাড়ি হুস করে দ্বৈপায়নকে পেরিয়ে চলে গেল। ঠিক তখনই দূর থেকে কেউ ডেকে উঠল : দিপুদা, এবার ফিরে এসো।
রোলার স্কেটস-এ চলতে-চলতেই ঘাড় ফিরিয়ে পিছনে তাকাল দ্বৈপায়ন। অনেকটা দূরে হলদে রঙের ট্র্যাক সুট পরে অচ্যুত দাঁড়িয়ে রয়েছে। দ্বৈপায়নকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে।
দ্বৈপায়ন ওকে ইশারায় অপেক্ষা করতে বলল। তারপর ওর চলার গতি বাড়িয়ে দিল। সুইমিং পুল স্টপেজের কাছটায় ইউ বাঁক নিয়ে ও অচ্যুতকে লক্ষ করে ফিরে চলল। অচ্যুতের ডাকনাম মিমো, তবে দ্বৈপায়ন ওকে আদর করে গুটে বলে ডাকে। বছর ন-দশের সরল সাদাসিধে ছেলে। নারায়ণ দাস বাঙ্গুর স্কুলে ক্লাস ফোরে পড়ে। দ্বৈপায়নদের ঠিক উলটোদিকের ফ্ল্যাটেই ওরা থাকে।
গুটে ডাকাবুকো স্বাস্থ্যবান ছেলে। পড়ায় যত মন তার চেয়ে ঢের বেশি মনোযোগ খেলাধুলো আর টিভি সিরিয়ালে। যেমন, যেখানে যে-অবস্থায় থাকুক না কেন শক্তিমান সিরিয়ালটা ওর দেখা চাই-ই চাই। এ নিয়ে মায়ের সঙ্গে ওর নিত্য চেঁচামেচি লেগে আছে।
রোজ ভোরবেলায় দ্বৈপায়ন পায়ে রোলার স্কেস লাগিয়ে প্র্যাকটিস করতে বেরোয়। মাসখানেক আগে হঠাৎ একদিন গুটে বায়না ধরে বসল ওকেও রোলার স্কেট করা শিখিয়ে দিতে হবে। তারপর থেকে দ্বৈপায়ন রবিবার আর ছুটির দিনে ভোরবেলা ওকে সঙ্গে নিয়ে বেরোয়। না নিয়ে গেলেই বাচ্চা ছেলেটা কান্নাকাটি করে দ্বৈপায়নকে আঁচড়ে কামড়ে একেবারে অস্থির করে তোলে।
গুটের কাছে পৌঁছে থামল দ্বৈপায়ন। রাস্তার পাশে ঘাসের ওপরে বসে পড়ল। তারপর ফিতে খুলে পা থেকে রোলার স্কেস দুটোকে আলাদা করে ফেলল। গুটেকে কাছে ডাকল, আয়, এদিকে আয়–।
গুটে রাস্তার ওপারে দাঁড়িয়ে ছিল। দ্বৈপায়ন কাছে ডাকতেই ও মায়ের শেখানো মতো রাস্তার ডান দিক আর বাঁ দিকে একবার করে তাকাল–তারপর এক ছুটে দ্বৈপায়নের কাছে চলে এল। অধীর আগ্রহ নিয়ে ওর রোলার স্কেটস-এর দিকে তাকিয়ে রইল।
ট্র্যাক সুটের পকেট থেকে ছোট্ট একটা চাবি বের করল দ্বৈপায়ন। একটা রোলার স্কেটের চেসিসের দুটো নাট খুলে চেসিসের দুটো টুকরোকে মুখোমুখি ঠেলে ছোট করে গুটের পায়ের মাপে নিয়ে এল। নাট দুটো আবার টাইট করে দিল চাবি দিয়ে। চারটে চাকার নাট ঠিকমতো টাইট আছে কিনা একবার পরখ করে নিল। তারপর গুটের কেস জুতো পরা ডানপায়ে রোলার স্কেটটা ফিতে দিয়ে ভালো করে বেঁধে দিল। অন্য স্কেটটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াল।
এরপর প্র্যাকটিসের পালা।
গুটের হাত ধরে দ্বৈপায়ন ওর পাশে-পাশে হেঁটে চলল। আর গুটে ডান পায়ে ভর দিয়ে চাকা গড়িয়ে চলার চেষ্টা করতে লাগল।
দিপুদা, আমার শিখতে কদিন লাগবে?
দ্বৈপায়ন সামান্য চিন্তা করার ভান করে তারপর বলল, এই ধর মাসদুয়েক।
তারপর বাপিকে বলব রোলার এস্কেট কিনে দিতে।
এস্কেট নয়–স্কেটস। হাসল দ্বৈপায়ন।
ওই হল। গুটে বলল, তোমার মতো জোনেক্স কোম্পানির কিনব।
কিনিস। এখন শেখায় মন দে। বডিটা একদম স্ট্রেট রাখ–ডানদিক বাঁদিকে হেলাবি না।
শিখতে-শিখতে সময় গড়াতে লাগল। রাস্তায় লোকজন আর গাড়ির সংখ্যা বাড়তে লাগল। একসময় দ্বৈপায়ন গুটেকে দাঁড় করিয়ে ওর পা থেকে রোলার স্কেটটা খুলে নিল। তারপর চেসিসটা নিজের পায়ের মাপে ঠিক করে নিয়ে দুটো স্কেটই পায়ে লাগিয়ে নিল।
এইবার গুটের হাত ধরে স্কেট করে চলতে শুরু করল দ্বৈপায়ন। ওর সঙ্গে তাল রাখতে গুটে ছুটে চলল। ওর দিকে তাকিয়ে দ্বৈপায়ন বলল, হাঁপিয়ে গেলে বলবি, স্পিড কমিয়ে দেব।
গুটে ছুটতে-ছুটতেই ঘাড় নাড়ল।
ঠিক তখনই নীলরঙের একটা মারুতি গাড়ি দ্বৈপায়নের ডান পাশে চলে এল, ওদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে লাগল।
দ্বৈপায়ন দেখল, গাড়িতে মাঝবয়েসি দুজন ভদ্রলোক বসে আছেন? একজন স্টিয়ারিং এ, আর অন্যজন তার পাশে।
জানলার পাশে বসা ভদ্রলোক জিগ্যেস করলেন, ভাই, সি.ই.-১৬৫টা কোথায় পড়বে বলতে পারেন?
সি.ই.-১৬৫ দ্বৈপায়নদের বাড়ির ঠিকানা। বাড়িটা পাঁচতলা ফ্ল্যাট-বাড়ি, তাতে মোট দশটা ফ্ল্যাট আছে। এঁরা কাদের গেস্ট কে জানে!
দ্বৈপায়ন হাত নেড়ে ওঁদের বুঝিয়ে দিল, কীভাবে সামনের গোলচক্কর ঘুরে টেলিফোন এক্সচেঞ্জের পাশ দিয়ে সি.ই.-১৬৫-তে পৌঁছতে হবে।
দ্বৈপায়নকে ধন্যবাদ জানিয়ে মারুতিটা স্পিড নিয়ে বেরিয়ে গেল।
গুটে এতক্ষণ চুপচাপ ছিল। গাড়িটা চলে যেতেই দ্বৈপায়নকে জিগ্যেস করল, দিপুদা, ওরা কাদের ফ্ল্যাট খুঁজছে? আমাদের?
না, না। এই সকালে কাদের ফ্ল্যাটে যাবে কে জানে! গুটের কদমছাঁট মাথায় আদর করে এক চঁটি মারল দ্বৈপায়ন ও নে, চল–। দেরি হয়ে গেলে বউদি আবার বকাবকি করবে।
