সুপারলোটোর পুরস্কার পাওয়ার খবরটা পাঁচকান হয়ে মৃন্ময়ের কানে পৌঁছোয়। তখন তিনি ফোন করে দাদাকে ভয় দেখান–ওই টাকার অর্ধেক দাবি করেন।
স্বাভাবিক কারণেই তন্ময় রাজি হননি। এই নিয়েই দুই ভাইয়ের মন কষাকষি শুরু।
মৃন্ময়ের ক্রমাগত হুমকিতে তন্ময় ভয় পেয়ে যান। টিকিটটা তিনি বাড়িতেই কোথাও লুকিয়ে ফেলেন। মৃন্ময় ইতিমধ্যে কুখ্যাত একটা মাফিয়া গ্যাং-এর সঙ্গে যোগাযোগ করে ফেলেছেন। মৃন্ময় তাদের বলেন, যেভাবে হোক টিকিটটা ওঁর চাই।
একদিন রাতে সেই গ্যাং নিয়ে মৃন্ময় তন্ময়দের বাড়িতে চড়াও হন। তারপর নানানভাবে তন্ময় আর মালিনীকে টরচার করেন। কিন্তু কিছুতেই টিকিটটার হদিশ না পেয়ে মিষ্টুর চোখের সামনে দাদা আর বউদিকে কুপিয়ে খতম করেন। সেই সময় রক্ত ছিটকে লেগেছিল মিষ্টুর ফ্রকে। আর প্রচণ্ড শক পেয়ে মিষ্টু স্মৃতি খুইয়ে বসে।
মিষ্টু কিন্তু জানত টিকিটটা ওর মাম আর বাবু কোথায় লুকিয়ে রেখেছে। তন্ময়দের খুন করার আগে কথায় কথায় মৃন্ময় সেটা জানতে পেরেছিলেন। কিন্তু মিষ্টু স্মৃতি হারিয়ে ফেলায় মৃন্ময় ফ্যাসাদে পড়ে যান। ওকে চাপ দিয়ে টিকিটের হদিশটা আর বের করতে পারেননি। ফলে তক্ষুণি কোনও উপায় ভেবে না পেয়ে মিষ্টুকে কিডন্যাপ করে গাড়িতে তুলে নিয়ে পালিয়ে যান।
পথে একরকম অলৌকিকভাবেই মিষ্টু শমিতদের আওতায় চলে আসে।
দমদম পার্ক পেরিয়ে ভি.আই.পি. রোডের ধারে মৃন্ময়রা গাড়ি থামিয়েছিলেন। কারণ, ওঁর দুজন সঙ্গীর তখন টয়লেটে যাওয়ার দরকার হয়েছিল। সেই সুযোগে হতবুদ্ধি মিষ্টু ফাঁক পেয়েই বেপরোয়া ছুট লাগায়–শমিতদের গাড়ির সামনে এসে পড়ে। তারপর…।
..তারপর তো গোটা গল্পই আপনি জানেন। শমিতের দিকে তাকিয়ে গল্প শেষ করলেন। প্রফুল্ল পান।
টেলিফোন করে আমাদের ভয় দেখাত কে? পাপিয়া জানতে চাইল।
একটা সিগারেট ধরিয়ে যোগেশ দাশগুপ্ত বললেন, সুধীর আর বিনোদের গ্যাং-এর হরিরাম নামের একটা লোক। কাশীপুর থানায় ওর নামে তিনটে মার্ডার চার্জ রয়েছে। তন্ময় আর মালিনী যে-দিন মার্ডার হন সেদিন হরিরাম মৃন্ময়ের সঙ্গে ছিল।
প্রফুল্ল পান রুমাল দিয়ে নাক মুছে নিয়ে বললেন, মিষ্টুকে নিয়ে মৃন্ময়ের বেশ দুশ্চিন্তা ছিল। এক তো মিষ্টুই শুধু সুপারলোটোর টিকিটটার হদিশ জানত। এ ছাড়া মিষ্টুই ছিল তন্ময় আর মালিনীর খুনের একমাত্র সাক্ষী। তাই মৃন্ময় একবার চাইছিলেন মিষ্টুকে বাঁচিয়ে রাখতে, আর একবার চাইছিলেন ওকে মেরে ফেলতে। এই দোটানায় পড়ে শেষ পর্যন্ত মৃন্ময় শেষের পথটাই বেছে নিয়েছিলেন– তিনি ভেবেছিলেন, লটারির টিকিটটা পাওয়ার আর কোনও আশা নেই। তাই ছলে বলে কৌশলে মিষ্টুকে আপনাদের কাছ থেকে সরিয়ে নিতে চাইছিলেন।
তারপর…ঘটনাচক্রে সব প্ল্যানই তালগোল পাকিয়ে যেতে থাকে। তখন মৃন্ময় দাদার নাম করে মিষ্টুর ছবি দিয়ে নিউজপেপারে বিজ্ঞাপন দেন। তারপর তন্ময় সেজে আপনাদের ফ্ল্যাটে আসেন।
সবিতা ঘোষ নামের একটা নাটকের মেয়েকে মালিনী সাজিয়ে সঙ্গে নিয়ে আসেন…।
শেষদিন ওঁদের সঙ্গে মৃন্ময় সেজে কে এসেছিল? পাপিয়া জিগ্যেস করল।
যোগেশ একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, আনোয়ার–সুধীর আর বিনোদের এক চ্যালা। ছেলেটা পড়াশোনা জানে, কথাবার্তায় ভদ্র…ওদের দলের বেশ কয়েকটা ডাকাতির বুদ্ধি জুগিয়েছে।
বদমাইশ লোকগুলোর সাজা হবে তো?
হবে না মানে! আমাদের চার্জশিটে কোনও ফাঁক থাকবে না। যোগেশ ভুরু উঁচিয়ে বাঁকা হাসি হেসে বললেন, আমি আর প্রফুল্লদা সহজে হার মানার পাত্র নই…।
প্রফুল্ল হাতে হাত ঘষে হাসলেন : কেস মিটে গেলে সুপারলোটোর টিকিটটা আপনারা হাতে পাবেন। তখন প্রাইজ মানিটার যা হয় একটা ব্যবস্থা করবেন।
ওটা তো আমাদের টাকা নয়, মিষ্টুর টাকা! শমিত বলল।
এখন আপনারা ছাড়া ওর আর কে আছে?
পাপিয়া মিষ্টুকে কাছে টেনে নিল। ওর গালে, মাথায় আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল, সত্যি, এই মেয়েটা আমাদের গুণ করেছে।
গুণ কী, আন্টি? গুণ অঙ্ক? অবাক চোখে পাপিয়ার দিকে তাকিয়ে মিষ্টু জানতে চাইল।
না রে, গুণ অঙ্ক নয়। এই গুণ মানে জাদু, বুঝলি! এখন থেকে তুই সত্যি-সত্যি আমাদের মেয়ে। তোকে আর কেউ আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নেবে না। মিষ্টুর চুলে মুখ গুঁজে দিল পাপিয়া।
শমিত, বাপ্পা আর চ্যাম্প অপলকে পাপিয়া আর মিষ্টুকে দেখছিল।
আর ঠিক তখনই জোরালো এক বাতাসে কৃষ্ণচূড়া গাছটার রোদ-চকচকে পাতাগুলো ঝলমলিয়ে নেচে উঠল।
সর্বনাশের কাছাকাছি
স্টাফ রিপোর্টারঃ শনিবার রাতে ইস্টার্ন মেট্রোপলিটন বাইপাসের চিংড়িঘাটা এলাকায় ঝরনা সামন্ত (২২) নামে এক তরুণীকে ধর্ষণ করে শ্বাসরোধ করে খুন করা হয়। রবিবার ভোরে তরুণীটির মৃতদেহ খালপাড়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়। মৃতদেহে ধস্তাধস্তির চিহ্ন পাওয়া গেছে। পুলিশ এখনও পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করেনি।
রবিবারের ভোরবেলাটার গায়ে কেমন যেন ছুটির মেজাজ মাখানো ছিল। সমতল পিচের রাস্তায় মসৃণ বেগে রোলার স্কেস চালিয়ে যেতে-যেতে দ্বৈপায়নের ঠিক সেরকমটাই মনে হচ্ছিল।
রাস্তায় লোকজন প্রায় নেই। পাখিরা গাছের ঠিকানা ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছে। ঘুমজড়ানো চোখে ডানা মেলে দিয়েছে খাবারের সন্ধানে। ওদের মিষ্টি ডাকের টুকরো দ্বৈপায়নের দারুণ লাগছিল। দু-পাশের বড়-বড় গাছের পাতায় এখনও কুয়াশা জড়ানো। শৌখিন সব বাড়ির লাগোয়া বাগান থেকে গোলাপ-গাঁদার হালকা গন্ধ দ্বৈপায়ন ঘ্রাণে টের পাচ্ছিল।
