তন্ময়ের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে হিংস্র চিতার মতো খেপে উঠল মিষ্টু। আঁচড়ে কামড়ে ওঁকে অস্থির করে তুলল। এদিকে চ্যাম্প চাপা গর্জন করার সঙ্গে-সঙ্গে ওর কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল।
খুনি! তুমি খুনি! তুমি খুনি…!
মিষ্টুর পাগল করা চিৎকারের মাঝখানেই ফ্ল্যাটের কলিংবেল বেজে উঠল।
.
০৮.
গত কদিন ধরে একফোঁটাও বৃষ্টি হয়নি। রাস্তার ওপারে দাঁড়ানো কৃষ্ণচূড়া গাছটার পাতায়-পাতায় সূর্য খেলা করছিল। মাথার ওপরে আকাশ ছবির মতো নীল। মেঘের দল বোধহয় ছুটি নিয়েছে। হতেও পারে। কারণ, আজ রবিবার।
সবমিলিয়ে মনে হচ্ছিল, পুজোর সাজের ছোঁয়া লেগেছে।
প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে পাপিয়ার মনেই হচ্ছিল না মিষ্টুকে পাওয়ার পর থেকে সাত-আটটা দিন ওদের কী ভয়ংকর দুঃস্বপ্নের মধ্যে কেটেছে। ভগবান বোধহয় মাঝে-মাঝে এরকম পরীক্ষা নেন। কিন্তু তারপরে যা পাওয়া যায় সুখ, শান্তি, আনন্দ–তার কোনও তুলনা নেই।
মিষ্টু গান গাইছিলঃ
দিল দরিয়ার মাঝে দেখলাম
আজব কারখানা।
কেউ বুঝল কেউ বুঝল না।
দেহের মাঝে বাড়ি আছে,
সেই বাড়িতে চোর লেগেছে,
ছয়জনাতে সিঁদ কেটেছে,
চুরি করে একজনা।…
সেই গান শুনছিল ওরা সবাই।
সবাই বলতে পাপিয়া, শমিত, বাপ্পা–আর দুজন অতিথি ও প্রফুল্ল পান এবং যোগেশ দাশগুপ্ত।
ওঁরা যে আজ সকালবেলা আসবেন সেটা ফোন করে জানিয়েছিলেন প্রফুল্ল। হেসে বলেছিলেন, ম্যাডাম, পুলিশ কখনও অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে আসে না। তাই অ্যাপয়েন্টমেন্ট যখন করছি তখন পুলিশ হিসেবে আসছি না–আসছি বন্ধু হিসেবে…চা খেতে। কী, আপত্তি নেই তো?
পাপিয়া উত্তরে বলেছে, আপত্তি করব আমি! আপনারা আমাকে একটা মিষ্টি মেয়ে দিয়েছেন–এ কথা কি কখনও ভুলতে পারব।
সেই ভয়ংকর ঘটনার পর আঠেরো দিন কেটে গেছে, কিন্তু পাপিয়ার এখনও মনে হয় ব্যাপারটা এই একটু আগেই শেষ হল।
সেদিন কলিংবেল বেজে ওঠার পর বাপ্পা ছুটে গিয়ে দরজা খুলেছিল। খুলেই দ্যাখে কোলাপসিবল গেটের বাইরে পড়শিদের ভিড়, গুঞ্জন, কৌতূহলী মুখের মিছিল।
দরজার পাশেই একটা শো-কেসের ওপরে কোলাপসিবল গেটের চাবিটা রাখা থাকে। কাঁপা হাতে সেটা নিয়ে পড়শিদের কারও হাতে দিয়েছিল বাপ্পা।
ব্যস, তারপরই ওরা জলস্রোতের মতো ঢুকে পড়েছিল ফ্ল্যাটের ভেতরে। আর জনাছয়েক লোক দরজা জুড়ে দাঁড়িয়ে একটা দুর্ভেদ্য ব্যারিকেড তৈরি করে দিয়েছিল।
পাঁচ মিনিটের মধ্যেই হাসপাতাল আর পুলিশে ফোন করা হয়ে গেল। তন্ময়, মৃন্ময় আর মালিনী কড়া পাহারায় ঘেরাও হয়ে গেলেন। পাপিয়া আর শমিতের যত্ন-আত্তি শুরু হয়ে গেল একইসঙ্গে।
এর মিনিট কুড়ি পরেই প্রফুল্ল পান আর যোগেশ দাশগুপ্ত এসে পৌঁছেছিলেন। চমকে দেওয়া পুলিশি তৎপরতায় ওঁরা পরিস্থিতির দায়িত্ব নিয়ে ফেলেছিলেন।
পাপিয়া এসবের কিছুই জানে না কারণ, ও অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। তন্ময়ের গুলি লেগেছিল ওর পেটের কাছে। আর চার-পাঁচ ইঞ্চি এদিক-ওদিক হলেই ব্যাপারটা বিপজ্জনক হতে পারত।
তারপর আঠেরোটা দিন যে কীভাবে কেটেছে! পাপিয়া পরে শমিতের কাছে শুনেছে। কারণ, সাতদিন ও নার্সিংহোমে ছিল মাইনর অপারেশন করে ওর গুলিটা বের করতে হয়েছে।
ও মোটামুটি সুস্থ হয়ে ফিরে আসার পর শুরু হয়েছে পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদ।
সেই ধকলটা কেটে গেলে পর শমিত আর পাপিয়া প্রফুল্ল আর যোগেশের কাছে মিষ্টুর আসল গল্পটা জানতে চেয়েছে। ওঁরা বলেছিলেন, একদিন এসে গল্পটা শোনাবেন।
মিষ্টু একটি দিনের জন্যও শমিতদের ফ্ল্যাট ছেড়ে যায়নি। যখনই দরকার হয়েছে, পুলিশ ফ্ল্যাটে এসে ওর সঙ্গে কথা বলে গেছে। প্রফুল্ল আর যোগেশই সে-ব্যবস্থা করেছিলেন।
শমিত আর পাপিয়া ধীরে-ধীরে জানতে পেরেছে ওইটুকু মেয়ের ওপর দিয়ে কী সাংঘাতিক ঝড় বয়ে গেছে।
এখন সেই ঝড়কপালি মেয়েটা মনভোলানো গান গাইছে।
মিষ্টুর গান শেষ হয়ে গেলে প্রফুল্ল আর যোগেশ ওকে দারুণ তারিফ করলেন। যোগেশ হেসে বললেন, গানের ক্লু দিয়েই শেষ পর্যন্ত খুনি ধরা পড়ল, কী বলেন।
উত্তরে শমিত আর পাপিয়া সায় দিয়ে হাসল। তখন দু-টিপ নস্যি নাকে গুঁজে দিয়ে প্রফুল্ল পান মিষ্টুর গল্পটা ওদের শোনালেন।
মিষ্টুর বাবা-মায়ের নাম সত্যি-সত্যিই তন্ময় আর মালিনী হাজরা। তবে ওঁদের বাড়ি মোটেই তালতলায় নয়–তেঘরিয়ায়। এবং ওঁরা আর বেঁচে নেই। মিষ্টুর চোখের সামনেই ওঁদের নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছে। সেই ভয়ংকর দৃশ্য দেখামাত্রই মিষ্টু কেমন যেন হয়ে যায়–সেই শকই বোধহয় ওর অ্যামনেশিয়ার কারণ।
পুরো ঘটনাটা শুরু হয় সুপারলোটোর একটা টিকিট নিয়ে।
লটারির টিকিট কাটা তন্ময়ের বহু পুরোনো অভ্যেস ছিল। মানুষটি ভাগ্যে খুব বিশ্বাস করত। হঠাৎই, জীবনে এই প্রথমবার, সুপারলোটোর জ্যাকপট জুটে যায় তন্ময়ের কপালে। তার টাকার অঙ্কটাও অবিশ্বাস্য রকমের : সাতানব্বই লক্ষ টাকা। তন্ময় আর মালিনীর হার্ট নিশ্চয়ই শক্তপোক্ত ছিল, কারণ, এই মারাত্মক আনন্দের খবরটা শুনেও ওঁরা অসুস্থ হয়ে পড়েননি।
কিন্তু গণ্ডগোল শুরু হল তন্ময়ের ভাই মৃন্ময়কে নিয়ে। মৃন্ময় অল্প বয়েস থেকেই আজেবাজে বন্ধুবান্ধবের পাল্লায় পড়েছিলেন। তাই সবসময়েই খরচের টাকায় টান পড়ত। সময়ে-অসময়ে দাদাকে ফোন করে হোক বা এসে হোক তিনি টাকা ধার চাইতেন–এবং সেই ধার আর কোনওদিনই ফেরত দিতেন না। এইসব কারণেই তন্ময় ছোটভাইকে কখনও নিজের কাছে রাখেননি।
