মালিনীর রোগা ছিপছিপে শরীরটা পাপিয়ার প্রবল ঝাঁকুনিতে পেন্ডুলামের মতো এপাশ ওপাশ দুলছিল।
মিষ্টু ব্যাপারটা খেয়াল করামাত্রই ওর জেদ পাঁচগুণ বেড়ে গেল। ও ডাক ছেড়ে কাঁদতে শুরু করল। মৃন্ময় ওকে থামাতে চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু মিষ্টু আচমকা মৃন্ময়ের হাতে কামড় বসিয়ে দিল।
মৃন্ময় যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠলেন। মিষ্টুকে কোল থেকে নামিয়ে দিলেন মেঝেতে এবং সঙ্গে-সঙ্গে মিষ্টু আরও একবার দাঁত বসিয়ে দিল মৃন্ময়ের ঊরুতে।
রাগে অন্ধ হয়ে মৃন্ময় মিষ্টুর বাঁ গালে খোলা হাতে সপাটে এক চড় কষিয়ে দিলেন।
মেয়েটা ছিটকে পড়ল মেঝেতে। কংক্রিটের মেঝেতে ওর মাথা ঠুকে যাওয়ার বিশ্রী শব্দ হল।
বাপ্পা ছুটে গেল মিষ্টুর কাছে। ওর ওপরে ঝুঁকে পড়ল। মিষ্টু! মিষ্টু! বলে ডাকতে লাগল।
দৃশ্যটা দেখে পাপিয়া সত্যি-সত্যি বোধহয় পাগল হয়ে গেল। ও চোখে আগুন জ্বেলে মালিনীকে এক ধাক্কা দিল। মালিনী ছিটকে গিয়ে পড়লেন মৃন্ময়ের গায়ে। টাল সামলাতে না পেরে ওঁরা দুজনেই কাত হয়ে পড়ে গেলেন মেঝেতে।
এসব ঘটনা খুব দ্রুত ঘটছিল। শমিতের মাথার ভেতরে সবকিছু তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল। যুক্তি-বুদ্ধি সব জট পাকিয়ে অর্থহীন হয়ে যাচ্ছিল।
তন্ময় কিন্তু সব বুঝতে পেরেছেন। বুঝতে পেরেছেন যে, ওঁরা পাপিয়ার কাছে ধরা পড়ে গেছেন। তাই ম্যাজিশিয়ানের মতো এক ভেলকিতে কোথা থেকে একটা ছোট্ট পিস্তল বের করে পাপিয়াকে লক্ষ করে গুলি করলেন।
গুলি কোথায় গিয়ে লাগল বুঝে ওঠার আগেই দুটো ঘটনা ঘটল। চ্যাম্প চোখের পলকে লাফিয়ে পড়ল তন্ময়ের ওপরে।
আর শমিত একটা হিংস্র চিৎকার করে হাতের জ্বলন্ত সিগারেটটা তন্ময়ের গালে চেপে ধরে রগড়ে দিল।
যন্ত্রণায় উঃ! শব্দ করে ওঠার সঙ্গে-সঙ্গে তন্ময় ছিটকে পড়লেন টিভির ওপরে। ঝনঝন শব্দ করে টিভিটা ভেঙে পড়ল মেঝেতে। চ্যাম্পের ধারালো দাঁত তখন ওঁর হাত কামড়ে ধরে আঁকাচ্ছে।
গুলি পাপিয়ার কোথাও একটা লেগেছিল। কারণ, ওর হালকা রঙের শাড়িতে রক্তের ছোপ দেখা গেল। ওর ভারী শরীরটা আচমকা খসে পড়ল মেঝের ওপরে। তারপর যন্ত্রণায় কাতরাতে লাগল।
মৃন্ময় মেঝেতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াচ্ছিলেন। ওঁর হাত ধরে মালিনীও।
বাপ্পা ভয়ে ঘরের মধ্যে এদিক-ওদিক ছুটোছুটি করছিল আর চ্যাম্পকে লেলিয়ে দেওয়ার জন্য ছু-ছু শব্দ করছিল। তার মধ্যে বারকয়েক ও ঝুলবারান্দার দিকে ছুটে গিয়ে অন্ধকার রাত লক্ষ করে বাঁচাও! বাঁচাও বলে চিৎকার করল। কেউ ওর আর্তচিৎকার শুনতে পেল কি না কে জানে! হতাশায় বাপ্পা কাঁদতে শুরু করল।
মিষ্টু হঠাৎই উঠে বসল। ঘুম-ভেঙে-ওঠা চোখে ঘরের দৃশ্য অবাক হয়ে দেখতে লাগল। ওর কপালের একপাশটা ফেটে গিয়ে রক্ত পড়ছিল। যন্ত্রণার শব্দ করে কাটা জায়গাটায় হাত দিল ও। হাতটা চোখের সামনে নিয়ে আসামাত্রই ও পাগলের মতো চিৎকার করে উঠল।
কারণ, রক্ত দেখার সঙ্গে-সঙ্গে তন্ময় হাজরাকেও ও দেখতে পেয়েছে। এবং চিনতে পেরেছে।
মৃন্ময় দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে মিষ্টুর দিকে তেড়ে যাচ্ছিলেন। সেটা শমিত আর সইতে পারল না। ও একলাফে রট আয়রনের একটা সোফা তুলে নিল। ওর বাঁ-হাতের ব্যান্ডেজ রক্তে ভিজে গেল। হাতটা অসহ্য যন্ত্রণায় কনকন করে উঠল। সোফাটা খসে পড়তে চাইল হাত থেকে।
কিন্তু মেয়ের বিপদের সামনে দাঁড়িয়ে বাবারা অসাধ্য সাধন করতে পারে। অন্তত শমিত তাই করল।
মেয়ে বলেই তো ডেকেছিল পাপিয়া, তাই না! সেই পাপিয়া এখন গুলি খেয়ে পড়ে আছে মেঝেতে। কাতরাচ্ছে। আর শমিত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেটা দেখবে! কখনও তাই হয়?
মিষ্টুর জন্য ও না মানুষ খুন করতে পারে। সেখানে মৃন্ময় তো একটা তুচ্ছ অমানুষ! মাত্র দুটো পা ফেলে মৃন্ময়ের কাছে পৌঁছে গেল শমিত।
মৃন্ময় ততক্ষণে মিষ্টুর একটা হাত চেপে ধরেছেন। এইবার এক হ্যাঁচকায় ওকে টেনে তুলবেন। কিন্তু শেষরক্ষা হল না।
রোবটের মতো আবেগহীনভাবে শমিত রট আয়রন সোফাটা সপাটে মৃন্ময়ের মাথায় আছড়ে দিল। চোখ কপালে তুলে মৃন্ময় চিৎ হয়ে পড়লেন মেঝেতে। ওঁর গল্প শেষ হয়ে গেল কি না ঠিক বোঝা গেল না।
কাতর চিৎকার করে বাঁ-হাতের ব্যান্ডেজ চেপে ধরল শমিত। যন্ত্রণায় ওর বাঁ-হাতটা খসে পড়তে চাইছিল। চোখ বুজে মুখ কুঁচকে ও উবু হয়ে বসে পড়ল মেঝেতে।
ওঃ ভগবান! এই দুঃস্বপ্ন কি শেষ হবে না?
মালিনী ঘরের এককোণে ভয়ে সিঁটিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এইবার হিস্টিরিয়ার রুগির মতো তীক্ষ্ণ চিৎকার শুরু করে দিলেন। চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ভয়ংকর দৃশ্যগুলো তিনি আর সইতে পারছিলেন না।
এদিকে চ্যাম্পের আক্রমণ এড়িয়ে তন্ময় উঠে বসার চেষ্টা করছিলেন। ওঁর গালে জডুলের মতো পোড়া দাগ। একনাগাড়ে নোংরা গালিগালাজ ছুঁড়ে দিচ্ছিলেন তন্ময়। এই ফ্ল্যাট থেকে তিনি এখন কোনওরকমে পালাতে চাইছেন। কিন্তু পিস্তলটা কোথায় গেল! এইখানেই কোথায় যেন খসে পড়েছিল মেশিনটা!
তন্ময় পাগলের মতো পিস্তলটা খুঁজতে লাগলেন। ওটা খুঁজে পেলেই তিনি শয়তান কুকুরটার দফারফা করবেন। কোথায়…কোথায়…?
মিষ্টু তন্ময়ের দিকে অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে ছিল।
হঠাৎই উঠে দাঁড়িয়ে ও বুলেটের মতো ছুটে গেল তন্ময়ের দিকে, আর একইসঙ্গে কান্না ভাঙা গলায় পাগলের মতো চিৎকার করে বলতে লাগল, তুমি খুনি! খুনি! আমার মাম আর বাবুকে খুন করেছ। মাম আর বাবুকে তুমি মেরে ফেলেছ! তুমি খুনি!..।
