শমিত ফোন ছেড়ে তন্ময় আর মালিনীর কাছে আসতেই তন্ময় নাছোড়বান্দার মতো শমিতকে চেপে ধরলেন।
কী ব্যাপার, মিস্টার রায়চৌধুরী? মিষ্টুকে নিয়ে কী প্রবলেম হয়েছে? আপনাকে খুলে বলতেই হবে…প্লিজ…।
মালিনীও অনুনয়-বিনয় করে জোর করতে লাগলেন। অগত্যা শমিত পাপিয়ার দিকে একবার তাকাল। তারপর বলতে শুরু করল। মিষ্টু আর বাপ্পা তখন নিজেদের খেলায় মত্ত। আর চ্যাম্পও ওদের কাছে ঘুরঘুর করছে।
শমিত ধীরে-ধীরে কথা বলছিল। মিষ্টুকে ওরা পেয়েছে সোমবার, আর মঙ্গলবার রাত থেকেই টেলিফোনে হুমকি শুরু হয়েছে। লোকগুলোর কথাবার্তা শুনে মনে হয়েছে ওরা মোটেই ঠাট্টা করছে না।
এরপর শমিত ওর হাতের ব্যান্ডেজটার আসল কারণ জানাল তন্ময়কে। বলল, কীভাবে ওকে খুন করার চেষ্টা হয়েছিল।
শমিতের কথা শুনতে-শুনতে তন্ময়দের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। কেমন একটা হতভম্ব ভাব ফুটে উঠল তন্ময়ের মুখে। বেশ খানিকক্ষণ তিনি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন শমিতের মুখের দিকে।
মালিনী আর মৃন্ময়ের অবস্থাও অনেকটা একইরকম। হতাশায় মাথা নেড়ে শমিত বলল, কীভাবে যে আমরা দিন কাটাচ্ছি সে আমরাই জানি।
পাপিয়া বলল, মিষ্টুকে আমরা এত ভালোবেসে ফেলেছি যে, ওকে বাঁচানোর জন্যে যে কোনও স্টেপ নিতে রাজি আছি।
তন্ময় বললেন, না, মিস্টার রায়চৌধুরী, মিষ্টুকে আর আপনাদের এখানে রাখাটা ঠিক হবে …আই মিন, রিস্কি হয়ে যাবে। আজ ওকে আমরা নিয়ে যাব।
মৃন্ময় মাথার চুলে হাত বুলিয়ে বললেন, না, না–এখানে রাখার আর কোনও প্রশ্নই নেই। ওর কিছু একটা হয়ে গেলে দাদা-বউদিকে বাঁচানো মুশকিল হয়ে যাবে। এরকম ঝুঁকি নেওয়া যায় না।
পাপিয়া মিনমিন করে বলল, আপনারা যা ভালো মনে করেন। মিষ্টুর ওপরে টান যতই থাক, ওর সেফটিটাই আমাদের কাছে সবচেয়ে জরুরি।
টেনশন কাটাতে শমিত একটা সিগারেট ধরাল। তন্ময়কে অফার করল, কিন্তু তিনি নিলেন না–ছোট্ট করে থ্যাংকস বললেন।
মালিনী তন্ময়কে বললেন, চলো, তা হলে আর রাত করব না। বলা যায় না, পথে আবার প্রবলেম হতে পারে…। মিষ্টু! মিষ্টুকে ডেকে উঠলেন মালিনী।
মিষ্টু খেলতে খেলতে মালিনীর দিকে ঘুরে তাকাল। মালিনী ওকে ইশারায় কাছে ডাকলেন, চলো, বাড়ি যাব। এরপর রাত হয়ে যাবে। মিষ্টু অমনি বিগড়ে গেল। বায়নার সুরে বলল, না, আমি এ-বাড়ি ছেড়ে যাব না…। মালিনী মৃন্ময়কে বললেন, ছোড়দা, তুমি একটু দ্যাখো।
মৃন্ময় লম্বা-লম্বা পা ফেলে মিষ্টুর কাছে পৌঁছে গেলেন। ওকে আদর করে বললেন, লক্ষ্মী মা-মণি, বায়না করে না, চলো, তোমাকে ক্যাডবেরি কিনে দেব…।
মিষ্টু মাথা ঝাঁকাতে লাগল বারবার।
তখন শমিত পাপিয়াকে বলল মিষ্টুকে বোঝানোর জন্য। পাপিয়া উঠে মিষ্টুর কাছে গেল। কিন্তু বোঝাবে কী! ওরই মন চাইছে না এ-ফ্ল্যাট ছেড়ে মেয়েটা চলে যাক।
শমিত সিগারেটে একটা টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল, তন্ময়কে বলল, ব্যাপারটা আমরা লালবাজারে জানিয়েছি–ওদের সি.আই.ডি. ডিপার্টমেন্টের অফিসাররা একটু পরেই হয়তো এসে পড়বেন। আপনাদের সঙ্গে ওঁরা কথা বলতে চান…।
তন্ময় হাসলেন, বললেন, সেটাই তো ন্যাচারাল! আমার মেয়েকে যে এভাবে মেরে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে সেটা তো আর জানতাম না! যাই হোক, আমরা তো এখন চলে যাচ্ছি…আপনি ওঁদের..আই মিন, সি.আই.ডি. অফিসারদের বলবেন আমাদের সঙ্গে ফোনে কনট্যাক্ট করে নিতে।
এদিকে মৃন্ময় মিষ্টুকে কোলে তুলে নিয়েছেন। মিষ্টু জেদ করে হাত-পা ছুড়ছিল, চাঁচাচ্ছিল, আর মৃন্ময় ওকে আদর করে ক্যাডবেরির লোভ দেখিয়ে ঠান্ডা করার চেষ্টা করছিলেন। মালিনী আর পাপিয়া ওদের কাছে দাঁড়িয়ে কাকু-ভাইঝির লড়াই দেখছিল।
মিষ্টুকে ভোলানোর জন্য পাপিয়া ওকে বলল, অ্যাই, একটা গান শুনিয়ে দে তো।
আর গান! মেয়েটা তখন আপত্তি জানাতেই ব্যস্ত।
কী হল, একটা গান শোনাবি না তো? আর-একবার চেষ্টা করল পাপিয়া। তারপর মালিনীর দিকে ঘুরে তাকিয়ে বলল, আপনার মেয়ে কার কাছে গান শেখে? দারুণ গায় কিন্তু!
মালিনী অবাক বিব্রত চোখে পাপিয়ার দিকে তাকালেন : গান? মিষ্টু? কই, না তো! ও তো কখনও গান শেখেনি!
এবার পাপিয়ার চোখ কপালে তোলার পালা। মেয়ে গান শেখে মা জানে না। কারণ, গান না শিখলে তো অমন গলা হতে পারে না!
তন্ময় ব্যাপারটা খেয়াল করেছিলেন। তিনি বউকে একরকম ঝাজিয়ে উঠলেন : তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেল! সত্যেনবাবু যে মিষ্টুকে গান শেখাতে আসেন সেকথা ভুলে গেলে! তুমি ভীষণ ফরগেটফুল। আই মিন…।
ও, হ্যাঁ-হ্যাঁ, মনে পড়েছে! বিব্রত ভাবটা সামলে নিয়ে মালিনী একগাল হেসে ফেললেন, আমারও দেখি মিষ্টুর মতো অ্যামনেশিয়া হয়ে যাচ্ছে..।
কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে।
পাপিয়া সবাইকে অবাক করে দিয়ে হিংস্র থাবা বসিয়ে দিল মালিনীর গলার কাছটায়। শাড়ি আর ব্লাউজ খামচে ধরে অলৌকিক এক শক্তিতে মালিনীকে পাগলের মতো আঁকাতে লাগল। মনে হল যেন পাপিয়ার ওপরে কোনও অপদেবতা ভর করেছে।
শিগগিরই বল, তুই কে? তুই মিষ্টুর মা না! শয়তান ডাইনি! বল তুই কে? মিষ্টু তোর মেয়ে না! বল!
পাপিয়ার ওইরকম রুদ্রাণী রূপ দেখে সবাই কেমন স্তম্ভিত হয়ে গেল। চ্যাম্প উত্তেজিত হয়ে ঘেউঘেউ শুরু করে দিল।
