না, না, এভাবে বলে লজ্জা দেবেন না… শমিত বিনয় করে বলল।
মালিনী তখন মিষ্টুকে আদর-আহ্লাদ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। মিষ্টুকে বেশ সহজভাবেই ওঁর সঙ্গে মিশতে পারছে বলে মনে হল। শুক্রবারের পর থেকে তন্ময়রা রোজ এই ফ্ল্যাটে এসেছেন। মিষ্টুকে ভোলাতে চেষ্টা করেছেন। ওর সঙ্গে অনেকক্ষণ ধরে গল্প করেছেন। এঁদের মনে হয়েছে, এর ফলে মেয়েটা ধীরে-ধীরে সহজ হয়ে আসবে, ওঁদের সঙ্গে বাড়ি যেতে রাজি হবে।
কিন্তু আসলে তা হয়নি। খেলাধুলো কিংবা গল্পের সময় মিষ্টুকে দিব্যি সহজ-স্বাভাবিক মনে হলেও শমিতদের ছেড়ে যাওয়ার কথা উঠলেই মেয়েটা জেদ ধরে বেঁকে বসছে। পাপিয়া বা শমিত অনেক করে বুঝিয়ে-সুঝিয়েও ওকে রাজি করাতে পারেনি।
তন্ময় কিংবা মালিনী রোজ তিন-চারবার করে মিষ্টুকে ফোন করেন। তখন ও বেশ সুন্দর করে কথা বলে। জিগ্যেস করে, তোমরা কখন আসবে? কিন্তু শমিতদের ফ্ল্যাট ছেড়ে যাওয়ার কথা বললেই ওর কী যে হয়!
সেইজন্যই তন্ময়রা আজ মৃন্ময়কে নিয়ে এসেছেন। মৃন্ময় নর্থ বেঙ্গলে চাকরি করেন। মিষ্টুর সমস্যা মেটানোর জন্যই তন্ময় ওঁকে ফোন করে কলকাতায় ডেকে এনেছেন। কারণ, মিষ্টু যখন ছোট ছিল মৃন্ময়ের খুব ন্যাওটা ছিল। সবসময় মেয়েটা কাকুর পিছন পিছন ছুটে বেড়াত। ওর যখন পাঁচ বছর বয়েস তখন মৃন্ময় চাকরি নিয়ে নর্থ বেঙ্গলে চলে যান। এখন ওঁকে দেখে মিষ্টুর মন যদি কিছুটা বদলায়! যদি পুরোনো কথা কিছু মনে পড়ে!
মৃন্ময় মিষ্টুকে ডেকে নিয়ে ওর সঙ্গে হুটোপাটি করতে শুরু করলেন। ছোটবেলায় যেমন করতেন সেরকমভাবে ওকে দু-হাতে শুন্যে তুলে ধরে দোল খাওয়ালেন কয়েকবার। তারপর ওকে নামিয়ে দিয়ে লুকোচুরি খেলার প্রস্তাব দিলেন। নিজে বাচ্চা ছেলের মতো ছুটোছুটি করে ঘরে, বারান্দায়, আলমারির পিছনে লুকিয়ে বারবার মিষ্টুকে টুকি দিতে লাগলেন।
বাকি সবাই বেশ কৌতূহল নিয়ে মৃন্ময়ের চেষ্টা দেখছিল। বাপ্পাও বেশ অবাক হয়ে নতুন এই বুড়ো খোকাটির কাণ্ডকারখানা দেখছিল। দেখে ওর ভীষণ হাসি পাচ্ছিল, কিন্তু বাবা আর মায়ের ভয়ে অতিকষ্টে ও হাসি চেপে রেখেছিল।
চেষ্টা করতে করতে মৃন্ময় গলদঘর্ম হয়ে গেলেন, কিন্তু মিষ্টুর মধ্যে নতুন কোনও আগ্রহের লক্ষণ দেখা গেল না। ও কেমন যেন নিষ্প্রাণভাবে মৃন্ময়ের ডাকে সাড়া দিচ্ছিল। মৃন্ময় অনেক করে বলা সত্ত্বেও মিষ্টু একটিবারও মৃন্ময়কে কাকু বলে ডাকতে চাইল না।
হতাশায় মৃন্ময়ের চোখে জল এসে গেল। তিনি হাঁপাতে-হাঁপাতে বসে পড়লেন দাদার পাশে। মাথা নীচু করে জামার হাতা দিয়ে চোখ মুছলেন। ভাঙা গলায় বললেন, এরকম ভাবতে পারিনি। খুব কষ্ট হচ্ছে।
তন্ময় ছোটভাইয়ের পিঠ চাপড়ে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, মনখারাপ করিস না। আসলে যাকে কোলেপিঠে করে বড় করেছিস সে চিনতে না পারলে কষ্ট তো হবেই! অ্যামনেশিয়া বড় ডেঞ্জারাস জিনিস।
ঠিক তখনই টেলিফোন বেজে উঠল।
পাপিয়া ফোনটা ধরতে এগোচ্ছিল, কিন্তু শমিত ওকে ইশারায় বারণ করল। কারণ, ও জানে ফোনটা কার।
বড় বেডরুমের দরজায় দাঁড়িয়ে একপলক পাপিয়ার দিকে তাকাল শমিত। তারপর রিসিভার তুলে কথা বলল।
হ্যালো।
হাত কেমন আছে? আপনজনের সুরে মিহি গলায় কেউ প্রশ্নটা করল।
প্রশ্নটা শুনেই শমিতের মাথায় রক্ত চড়ে গেল। কিন্তু ও সময় নিয়ে রাগটাকে ঠান্ডা করল।
ফোনটা কারা করেছে বুঝতে পেরেও শমিত ভয় পেল না মোটেই। কারণ, লালবাজারের ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্ট এখন ওর পাশে আছে।
হঠাৎই ওর মনে পড়ে গেল, প্রফুল্ল পান বলেছিলেন, তন্ময় হাজরা এলে ওঁদের খবর দিতে। নানান ডামাডোলে শমিত ব্যাপারটা একেবারে ভুলেই গিয়েছিল।
কেমন আছে হাত? প্রশ্নের সুরটা এবার আগের চেয়ে রুক্ষ হয়েছে।
ভালো—
আসরাফ বেঁচে গেছে। মানে, বেঁচে যাবে।
কে আসরাফ?
ওই যে, যার পেটে লোহার শিক ঢুকিয়ে দিলেন, মনে নেই! চাপা হাসি হাসল লোকটা। তারপর একইরকম মোলায়েম গলায় বলল, সেরে উঠেই ও আপনার সঙ্গে দেখা করবে। আপনার পেছনে ফুলস্টপ বসিয়ে দেবে। বুঝলেন কি? একদম খাল্লাস! একটা আনচাক্কা বাচ্চা মেয়ের জন্যে এত তকলিফ কেন করছেন?
শমিতের গলার স্বর কয়েক পরদা চড়ে গেল। ও কেটে-কেটে বলল, শুনুন, মিষ্টুকে আমরা ওর বাবা-মায়ের কাছে দিয়ে দিচ্ছি। ওর কোনও ক্ষতি আমরা করতে পারব না। বরং কেউ যদি ওর ক্ষতি করতে চায় তা হলে বাধা দেব। আমি পুলিশে সব জানিয়েছি…।
ও-প্রান্ত কয়েক সেকেন্ড চুপ। তারপরঃ পুলিশে সব জানিয়ে দিয়েছেন! আপনি কি পাগল? এখন আপনার ফ্যামিলিকে কে সেভ করবে? আপনি সেকেন্ড-মিনিট গুনতে থাকুন…তিনদিনের মধ্যে আমরা কাজ খতম করে দিচ্ছি। আর শুনুন, মিস্টার বুরবাক, মিষ্টুর বাবা-মাকেও আমরা ছাড়ছি না। পথের মাঝে যে এসে দাঁড়াবে তাকেই..ফুস… মুখ দিয়ে গুলি ছোঁড়ার আওয়াজ নকল করল লোকটা। তারপরই লাইন কেটে দিল।
শমিত রিসিভার নামিয়ে রেখে চটপট প্রফুল্ল পানের দেওয়া নম্বরটা ডায়াল করতে শুরু করল।
ওদিকে তন্ময় আর মালিনীর মুখ তখন শুকিয়ে গেছে।
টেলিফোনে শমিতের বলা কথাবার্তা যে টুকু ওঁরা শুনেছেন তাতে ভালোই বুঝতে পেরেছেন। মিষ্টুকে নিয়ে বড় রকমের গণ্ডগোল কিছু একটা বেধেছে। ওঁরা ফ্যাকাসে মুখে নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলেন। পাপিয়া ওঁদের লক্ষ করতে লাগল।
