হতে পারে, তবে ওই গ্যাং-এ আরও লোক আছে। নইলে সুধীর আর বিনোদ বসে যাওয়ার পরও ভয় দেখানো ফোন আসবে কেন! আর একটা বাচ্চা মেয়ের পেছনে এত বড় একটা গ্যাং লেগে পড়েছে… চিন্তার সুরে বললেন প্রফুল্ল পান, তারও তো একটা বড়সড় মোটিভ থাকতে হবে…।
পাপিয়া সায় দিয়ে বলল, আমরাও তো সেকথাই ভাবছি।
যোগেশ বললেন, মিষ্টুকে একবার ডাকুন তো।
পাপিয়া উঠে দাঁড়াল, বলল, ডাকছি। আর আপনাদের জন্যে একটু চায়ের ব্যবস্থা করি…।
ও চলে যাওয়ার পর যোগেশ আর প্রফুল্ল শমিতের সঙ্গে কথা বলতে লাগলেন।
যোগেশ তন্ময় হাজরার মোবাইল নম্বর জানতে চাইলেন।
শমিত নম্বরটা বলল। তারপর বলল যে, মিষ্টুর মা-বাবা রোজই আসছেন, ওঁদের মেয়েকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, কিন্তু মেয়েটার এখানে ভীষণ মায়া পড়ে গেছে–পুরোনো কথা কিছুই ওর মনে নেই তাই ও জেদ করছে, যেতে চাইছে না। এতে শমিতদের ভীষণ অস্বস্তি আর লজ্জার মধ্যে পড়তে হচ্ছে।
প্রফুল্ল জিগ্যেস করলেন, মিষ্টুর বাবা-মা বিপদের কথা শুনে কী বলছেন?
শমিত বলল যে, ওঁদের অ্যাক্সিডেন্ট কিংবা টেলিফোনে হুমকির কথা কিছুই জানানো হয়নি।
কেন, জানাননি কেন?
শুধু-শুধু কমপ্লিকেশন বাড়াতে চাইনি, তাই।
যোগেশ আর প্রফুল্ল কিছুক্ষণ চুপ করে কী যেন ভাবলেন, মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন। তারপর যোগেশ বললেন, আজ দুপুর থেকে আপনাদের টেলিফোন লাইনটা আমরা ট্যাপ করব। যদি থ্রেট করে আবার ফোন আসে আমাদের ধারণা আসবেই তা হলে আমরা কলটা ট্রেস করে সেই বেসিসে খোঁজখবর করতে পারব। কিন্তু সবচেয়ে আগে মেয়েটার সেফটির একটা ব্যবস্থা করা দরকার। সুধীর আর বিনোদের গ্যাং খুব ডেঞ্জারাস। ওদের দল পারে না এমন কোনও কাজ নেই। হতে পারে মেয়েটাকে ওরা কিডন্যাপ করেছিল, তারপর মেয়েটা কোনও এক ফাঁকে ওদের আস্তানা থেকে সটকে পড়েছে…।
কিন্তু মিষ্টুর বাবা-মা তো সেরকম কিছু বলেননি!
হু, কেস বেশ পিকিউলিয়ার। গালে হাত বোলাতে বোলাতে প্রফুল্ল বললেন, কিন্তু মেয়েটার সেফটির ব্যবস্থা করাটা খুব জরুরি। ও বাবা-মায়ের কাছে ফিরে গেলেও হয়তো এই গ্যাং ওর জানের পিছনে পড়ে থাকবে। আচ্ছা, মিষ্টুর বাবা-মা কি আপনাদের বাড়িতে আজ আসবেন?
শমিত সায় দিয়ে মাথা নাড়লঃ হ্যাঁ, আসার কথা।
ওঁরা এলে একটু আমাদের জানাবেন। ওঁদের সঙ্গে ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলা দরকার। এই নিন, আমাদের কনট্যাক্ট নাম্বার নিন– প্রফুল্ল একটা কাগজে দুটো মোবাইল নম্বর লিখে শমিতকে দিলেন। তারপর বললেন, আসলে মিষ্টুর মেমোরি ফিরে আসাটা খুব ভাইটাল…।
হঠাৎই প্রফুল্ল পান লক্ষ করলেন একটা ফুটফুটে মেয়ে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে ওঁদের দেখছে। আর তার থেকে হাত পাঁচ-ছয় পিছনে একটি ছেলে দাঁড়িয়ে আছে–উঁকি মেরে কৌতূহলী চোখে এদিকেই তাকিয়ে আছে।
প্রফুল্ল মেয়েটির দিকে তাকিয়ে হাসলেন, ওকে কাছে ডাকলেন, এদিকে এসো। তোমার নাম কী?
আমার নাম মিষ্টু। বলে দিব্যি প্রফুল্লর কাছে চলে এল মিষ্টু, সরল চোখে ওঁর দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করল, তোমার নাম কী?
নাম বললেন প্রফুল্ল। তারপর হাত বাড়িয়ে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে জিগ্যেস করলেন, তুমি কখন এলে? আমরা তো খেয়ালই করিনি!
তোমরা তো আমাকে নিয়ে গল্প করছিলে…।
এরপর কিছুক্ষণ ওর সঙ্গে কথা বললেন প্রফুল্ল আর যোগেশ। মিষ্টু বেশ সহজভাবেই ওঁদের সঙ্গে কথা বলল। তারপর বাপ্পাকে ডেকেও ওঁরা আলাপ করলেন। হাসি-ঠাট্টায় মেতে উঠলেন দুই বালক-বালিকার সঙ্গে। তখন শমিতের মনেই হচ্ছিল না ওঁরা পুলিশের লোক।
চা-পর্ব সেরে আরও আধঘণ্টা পর প্রফুল্ল আর যোগেশ উঠে দাঁড়ালেন।
দরজায় ওঁদের এগিয়ে দেওয়ার সময় শমিত বলল, মিষ্টুকে যে-করে-হোক বাঁচান আপনারা। ওর কিছু একটা হয়ে গেলে আমরা সইতে পারব না।
ডোন্ট উয়ারি, মিস্টার রায়চৌধুরী, আমরা যা করার করছি। প্রফুল্ল বললেন।
শমিত কৃতজ্ঞতায় ওঁর হাত চেপে ধরল আবার।
.
০৭.
সন্ধে পার করে তন্ময় আর মালিনী শমিতদের ফ্ল্যাটে এসে হাজির হলেন। ওঁদের সঙ্গে নতুন একজন অতিথিও এসেছেন। বছর তিরিশ-বত্রিশের এক যুবক। স্মার্ট টানটান চেহারা। গায়ে রিংকলড কটনের রংচঙে শার্ট, পায়ে ফেডেড জিনস। ডানহাতে অদ্ভুত নকশার একটা চকচকে বালা, বাঁ-হাতে বেঢপ মাপের স্পোর্টস-ওয়াচ।
তন্ময় শমিতদের সঙ্গে নতুন অতিথির পরিচয় করিয়ে দিলেন। বিকেলেই তিনি ফোন করে জানিয়েছিলেন যে, ছোট ভাইকে নিয়ে আসবেন। সে নর্থ বেঙ্গলে থাকে। মিষ্টুকে পাওয়া গেছে শুনে কলকাতায় এসেছে।
আমার ছোটভাই..মৃন্ময়…।
মৃন্ময় সৌজন্য দেখিয়ে শমিতদের নমস্কার জানালেন। শমিত লক্ষ করল, পাপিয়া বেশ জরিপ নজরে মৃন্ময় হাজরাকে দেখছে।
তন্ময় শমিতের হাতের ব্যান্ডেজ দেখে কী ব্যাপার জানতে চাইলেন। শমিত ছোট্ট করে বলল, সামান্য কেটে গেছে সিরিয়াস কিছু না।
তন্ময় বোধহয় সিগারেট বেশি খেতে ভালোবাসেন। কারণ, কয়েক সেকেন্ড উশখুশ করেই তিনি সিগারেট বের করলেন। শমিতকে একটা অফার করলেন। শমিত গাঁইগুই করছিল, কিন্তু তন্ময় ওর কোনও আপত্তি শুনলেন না। একরকম জোর করেই সিগারেটটা শমিতের হাতে ধরিয়ে দিলেন। তারপর নিজে একটা নিলেন।
লাইটার বের করে শমিতের সিগারেটটা ধরিয়ে দেওয়ার সময় তন্ময় হেসে বললেন, কীভাবে আপনার ঋণ শোধ দেব জানি না, মিস্টার রায়চৌধুরী…আপনারা আমার আর মালিনীর জীবনদাতা।
