ঘটনাগুলো আমার কাছে ঠিক স্পষ্ট হচ্ছে না। এ-পর্যন্ত শরদিন্দু মিত্রের কথাবার্তা শুনে যা অনুমান হয় তাতে হীরা একটি বাচ্চা মেয়ে এবং চুনি মিত্ৰসাহেবের বাড়ির চাকর। কিন্তু আসলে নিশ্চয়ই তা নয়। আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম।
ঘটনা ঘটেছে কাল বিকেলে–মিত্রসাহেব বলে চললেন, নজর মহম্মদ আপনাকে সমস্ত খবর-টবর দিয়ে দেবে। কোনওরকম অসুবিধে হলে ওকে বলবেন, ও-ই ব্যবস্থা করবে। বুঝতেই তো পারছেন, আমাকে বিজনেস নিয়ে সবসময় নাজেহাল হতে হয়, কত দিকে আর মাথা দেব।
পিছনের দরজার দিক থেকে শব্দ পেলাম। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম। খুদের সঙ্গে ছিপছিপে চেহারার একটি লোক এসেছে। ধারালো নাক-মুখ-চোখ। নিখুঁত পরিপাটি চাপদাড়ি। পরনে ধবধবে পাজামা-পাঞ্জাবি। ওরা দুজন কাছে এগিয়ে আসছে।
ওই তো নজর এসে গেছে। শরদিন্দু মিত্র স্বস্তির শ্বাস ফেললেন। তারপর আরামি চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন। তার ধবধবে চওড়া পাড় শৌখিন ধুতি চোখে পড়ল। আমার দিকে সামান্য ঝুঁকে পড়ে বললেন তিনি, শিকদারবাবু, পুলিশে আপনার তো চেনাজানা আছে। আশাকরি এ-ব্যাপারটা নিয়ে আমরা অযথা পুলিশি ঝাটে জড়াব না। তা ছাড়া আপনাকে দিয়ে কোনও অন্যায় কাজ তো আমি করাচ্ছি না। শুধু আমার মেয়েকে ফেরত চাইছি। পুলিশের হাতে দায়িত্ব দিতে চাইনি একটাই কারণে। ওদের গদাইলশকরী তদন্তে চুনিকে হয়তো সাজা দেওয়া যাবে, কিন্তু হীরাকে হয়তো আর কোনওদিনই দেখতে পাব না। আপনার সম্পর্কে অনেক জানি, অনেক শুনেছি। তাই ভরসাও করি অনেক। শরদিন্দু হাত বাড়িয়ে দিলেন। আমিও হাত বাড়ালাম। পাঁচটা শীতল কালসাপ আমার হাত জড়িয়ে ধরল। রুদ্ধস্বর কানে এল, হেল্প মি, শিকদার। হেল্প আ পুওর ড্যাড!
নজর ও খুদে টেবিলের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। লক্ষ করলাম, নজরের চোখ কটা। কটা নয়, বরং বলা যায় ভীষণ ফ্যাকাশে। হঠাৎ দেখলে চোখের মণি ঠাহর হয় না। চোখের সাদা অংশের সঙ্গে রং মিলিয়ে যেন গা-ঢাকা দিয়েছে।
শরদিন্দু মিত্র বসে পড়লেন। টেবিলের বাঁ দিকে ঝুঁকে পড়ে একটা ড্রয়ার খুললেন। সামান্য খোঁজাখুঁজির পর একটা প্লাস্টিক কভার ফাইল বের করলেন। আমার দিকে এগিয়ে দিলেন সেটা।
এগিয়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে একটু ইতস্তত ভাব ছিল। ফাইলটা নিয়ে প্লাস্টিকের মলাট ওলটাতেই বোধহয় তার কারণটা বোঝা গেল। ফাইলের সব লেখাই ইংরেজিতে টাইপ করা। সেই ইংরেজি পড়ে তার সঠিক অর্থ বুঝে নেওয়ার ব্যাপারটা আমার বিদ্যেয় কুলোবে কি না সেটাই বোধহয় মিত্রসাহেবকে দুশ্চিন্তায় ফেলেছিল।
সুতরাং শরদিন্দু মিত্রের দুশ্চিন্তা দূর করতে হেসে বললাম, চিন্তা করবেন না, মিস্টার মিত্র। বাঙালির লেখা ভুল ইংরেজি আমি মোটামুটি বুঝতে পারি। ওটা না বুঝলে আপনাদের মতো রইস ক্লায়েন্ট জুটবে কোথা থেকে?
শরদিন্দু মিত্র বেশ চেষ্টা করেই নিজেকে স্বাভাবিক রাখলেন। কিন্তু খুদের বুদ্ধি কম। বোধহয় বিদ্যেও। তাই ফস করে ধমকের সুরে বলে বসল, বসের সঙ্গে মুখ সামলে কথা বলবেন।
আমি শব্দ করে ফাইলটা বন্ধ করে খুদের দিকে তাকালাম। দাঁত বের করে হেসে বললাম, মিস্টার মিত্র, প্রভুভক্তির জন্যে এটার মাইনে এ-মাস থেকে পাঁচসিকে করে বাড়িয়ে দেবেন।
খুদে ওর মোটা বুদ্ধিতেও ইঙ্গিতটা বুঝতে পারল। তেড়ে আসার ভঙ্গিতে এক পা এগিয়ে এল আমার দিকে। দাঁত খিঁচিয়ে বলে উঠল, আর একটা ফালতু আওয়াজ যদি বেরোয়।
আমি খুদের ঘামের গন্ধ পাচ্ছিলাম। নিশ্বাসের শব্দও। সুতরাং এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে সপাটে এক চড় বসিয়ে দিলাম ওর বাঁ গালে।
ঘরে বাজ পড়ার শব্দ হল যেন। খুদের তামাটে গাল লাল হয়ে গেল। ও ধাক্কাটা সামলে নিয়েই হাত চালাতে গেল। কিন্তু ততক্ষণে আমি বাজপাখির মতো ছোঁ মেরে শরদিন্দু মিত্রের টেবিল থেকে ইস্পাতের ছুরিটা তুলে নিয়েছি এবং তৈরি হয়ে দাঁড়িয়েছি। পিস্তলটা নিইনি, কারণ ওটাতে গুলি ভরা আছে কি না আমার জানা নেই।
খুদে যেন নেতাজির হুকুমে ফ্রিজ শট হয়ে গেল। আমার জীবনে এরকম বহু ফ্রিজ শট আমি দেখেছি। না দেখলে বয়েসটা চল্লিশ পর্যন্ত আর গড়াত না। সেই কোনকালেই নামের আগে চন্দ্রবিন্দু বসে যেত।
আমার ছুরি ধরে দাঁড়ানোর ভঙ্গি দেখে শরদিন্দু মিত্রের কালো মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল পলকের জন্যে। বুঝলাম, মিত্তিরমশাই জাতসাপ দেখলে চিনতে পারেন। চেনেন তার ফণা তোলার ঢঙ।
শুধুমাত্র নজর মহম্মদ নির্বিকার। যেন কটা চোখে অপলকে তাকিয়ে কাশ্মীরের সিনারি দেখছে।
খুদে! শরদিন্দু মিত্র গর্জে উঠলেন ভয়ংকর সুরে।
খুদের টানটান শরীরটা সঙ্গে সঙ্গে ঢিলেঢালা হয়ে গেল। আহত গালে কয়েকবার হাত বুলিয়ে ফোঁস-ফোঁস করে শ্বাস ফেলতে ফেলতে পিছিয়ে দাঁড়াল। তারপর আচমকাই ওর বাবার লেখা বর্ণপরিচয় থেকে শেখা খিস্তির ফুলঝুরির কয়েকটা ফুলকি উপহার দিল। লক্ষ করলাম, রাগে ওর মুখচোখ থমথম করছে এখনও।
আমি ছুরি ছুঁড়ে দিলাম টেবিলের ওপরে। বললাম, মিস্টার মিত্র, আপনার কথা বলা কুকুরকে একটু পিঠ চাপড়ে দিন। ভীষণ খেপে গেছে।
খুদে। আবার ডেকে উঠলেন শরদিন্দু। বুঝতে পারছিলাম, খুদের আচরণ ওঁর ভদ্রতার পোশাক টেনেহিঁচড়ে খুলে দিতে চাইছে।
তুই দরজার বাইরে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাক। মুখ দিয়ে যেন কোনও আওয়াজ না বেরোয়। শিকদারবাবু আমাদের গেস্ট–মেহমান। সেটা খেয়াল থাকে যেন।
