কিন্তু সবচেয়ে অবাক করে দেয় টেবিলে রাখা পেপারওয়েটগুলো। দু-ইঞ্চি ব্যাসের ঝকঝকে কতকগুলো বল। স্টেইনলেস স্টিলের তৈরি। সেগুলো দিয়ে নানান কাগজপত্র চাপা দেওয়া রয়েছে। না, এজন্য আমি অবাক হইনি। অবাক হয়েছি, বলমার্কা পেপারওয়েটগুলো টেবিল থেকে গড়িয়ে পড়ছে না বলে। কারণ, সিলিং ফ্যানের তীব্র বাতাসে পেপারওয়েট চাপা দেওয়া কাগজগুলো উড়তে চাইছে। ফলে বলগুলো ডাইনে-বাঁয়ে দুলছে, কিন্তু জায়গা ছেড়ে নড়ছে না।
অবাক হয়েছেন, মিস্টার শিকদার?
মুখ তুলে তাকালাম। মিত্রসাহেবের কথায় সূক্ষ্ম একটা অবাঙালি টান লক্ষ করলাম। আরও লক্ষ করলাম, তার কপালে ছোট্ট চন্দনের টিপ। গায়ের রং কালো হওয়া সত্ত্বেও আগে চোখে পড়েনি।
আমার উত্তরের অপেক্ষা না করেই মিত্রসাহেব বললেন, ছোটবেলা থেকেই মেটালের শখ, তাই মেটাল মার্চেন্ট হয়ে সমস্ত শখ মেটাচ্ছি। তা আপনি ওই পেপারওয়েটগুলো দেখে অবাক হয়েছেন…অবাক হবারই কথা। সবাই অবাক হয়। আমি ছাড়া ইন্ডিয়াতে এরকম পেপারওয়েট আর কেউ তৈরি করতে পারে না। ওই বলগুলোর ভেতরে খানিকটা কাঁপা জায়গা আছে। ফঁপা জায়গাটা ওপরদিক ঘেঁষে হওয়ায় বলের নীচটা ভারী হয়ে গেছে, তাই জায়গা ছেড়ে ওগুলো নড়ে না। সেই যে বাচ্চাদের একরকম খেলার পুতুল আছে দেখেননি! যেদিকেই শুইয়ে দিন সবসময় খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। পেপারওয়েটগুলো অনেকটা সেইরকম–।
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।
মিত্ৰসাহেব ইঙ্গিতটা বুঝলেন। হাসলেন। ঝকঝকে সাদা দাঁতের সারি চোখে পড়ল। আরও চোখে পড়ল ওপরের পাটির শ্ব-দন্ত দুটো রুপোলি। হাসি শেষ হলে বললেন, আপনি বুদ্ধিমান, মিস্টার শিকদার। পেপারওয়েটের ওপরে বক্তৃতা শোনানোর জন্যে আপনাকে ডাকিনি। আপনাকে ডেকেছি হীরাকে খুঁজে দেবার জন্যে–।
হীরা?
হ্যাঁ, হীরা–আমার মেয়ে। একমাত্র মেয়ে।
রহস্য এতক্ষণে পরিষ্কার হল।
শরদিন্দু মিত্র আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। বিষধর ঝুমঝুমি সাপের মতো ঠান্ডা স্থির নজর। ধবধবে পাঞ্জাবির ওপরে বেরিয়ে থাকা কষ্টিপাথরে খোদাই করা কালো মুখ বেমানান লাগছে। মাথায় হালকা হয়ে আসা কাঁচা-পাকা চুল তেল জবজবে করে পিছন দিকে টেনে আঁচড়ানো। সাদা পাঞ্জাবির হাতার ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসা দুটো হাতের পাঁচ-পাঁচ দশটা কালো আঙুল সাপের মতো হিলহিল করে নড়ছে। তাল ঠুকছে টেবিলের ঝকঝকে স্টেইনলেস স্টিলের পাতের ওপরে। আঙুলে চড়ানো একাধিক সোনা ও প্লাটিনামের আংটি।
আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে মিত্রসাহেব আবার বললেন, হীরাকে আমার চাই– কালকের মধ্যেই।
গতকাল রাত দশটা নাগাদ টেলিফোন পেয়েছিলাম। যে ফোন করেছিল নাম বলেনি। তবে এটুকু বলেছে, শরদিন্দু মিত্র আমার সঙ্গে দেখা করতে চান–যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। কারণ কাজটা ভীষণ জরুরি। তারপরই একটা ঠিকানা শুনিয়ে দিয়ে লাইন কেটে গেছে। জরুরি কাজটা যে কী তা আর জানা যায়নি। এখন জানা গেল।
আমার টেলিফোন নাম্বার সরকারি বইতে থাকে না। তবে যারা আমার সাহায্য চায় তারা ঠিক খোঁজখবর করে অভিজ্ঞ লোকজনের সূত্র ধরে আমার টেলিফোন নাম্বার জোগাড় করে ফেলে। আমাকে খোঁজ করার কারণ, এমন অনেক কাজ আমি করে দিই যা আইনসঙ্গত পথে গেলে চারগুণ সময় ও আটগুণ খরচ লেগে যাবে। সেদিক থেকে আমি হলাম ডিউটি ফ্রি শপ। আমি আইনমাফিক কাজ করি বেআইনি পথে। আইনমাফিক পথে বেআইনি কাজ করি না। নীচু মহলে কেউ-কেউ আমাকে প্রাইভেট আই বলে ডাকে। অবশ্য তাদের অনেকের মতে আমি বড় বেশি প্রাইভেট।
শরদিন্দু মিত্র এমন একজন লোক যার কখনও প্রাইভেট আই দরকার হয় না। বরং দরকার হলে প্রাইভেট আই ব্যাঙ্কে প্রচুর প্রাইভেট আই তিনি জমা দিতে পারেন। সুতরাং টেলিফোনের খবরটা আমাকে চিন্তায় ফেলেছিল। তবে খুশিও কিছুটা হয়েছিলাম। কারণ, এই প্রথম শরদিন্দু মিত্রের সঙ্গে অমিতাভ শিকদারের দেখা হবে। তাই দেরি না করে আজ সকালেই চলে এসেছি।
মিত্ৰসাহেব এখনও আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। হয়তো চাইছেন আমি কিছু বলি। তাই সবচেয়ে স্বাভাবিক প্রশ্নটাই করলাম। আপনার মতো একজন মেটাল মার্চেন্ট থাকতে হীরাকে খুঁজে দিতে আমার মতো সামান্য মানুষের ডাক পড়ল?
শরদিন্দু মিত্র হাসলেন : শিকদারবাবু, অনেক রকম মেটালের কারবার আমি করি– তারপর দাঁতের পাটি বের করে একটা রূপোলি দাঁতে সশব্দে টোকা মারলেন। বললেন, প্লাটিনাম। পাশে ঝুঁকে পড়ে একটা ড্রয়ার খুলে কী একটা বের করলেন। তাচ্ছিল্যের সঙ্গে ছুঁড়ে দিলেন টেবিলের ওপরে। ইস্পাতের সঙ্গে ইস্পাতের সংঘর্ষ হল। একটি ঋজু ফলার কুৎসিত ধারালো ছুরি। আবার ঝুঁকে পড়লেন। সোজা হলেন। টেবিলে সংঘর্ষের শব্দ। গাঢ় নীল রঙের একটা পিস্তল। বললেন, এসবও মেটাল–।
আমার কথায় মেটাল মার্চেন্ট-এর বাঁকা ইঙ্গিত বুঝতে ভুল করেননি মিত্রসাহেব।
মিস্টার শিকদার, কাজটা সামান্য বলেই আপনার মতো সামান্য লোককে তলব করেছি। আঙুলে তুড়ি বাজালেন শরদিন্দু মিত্র, হীরাকে আমি এখুনি তুলে আনতে পারি। কিন্তু আমি চাই
চুনিকে ওর চোখের সামনে কোতল করা হোক। খুদে, নজর, বা আর কাউকে পাঠালে চুনির মৃত্যু কেউ ঠেকাতে পারবে না। সেইজন্যেই আপনার সাহায্য চাইছি। সবরকম খবরাখবর আপনাকে আমি দিয়ে দেব। আপনি শুধু হীরাকে ফেরত নিয়ে আসুন। ওকে ফিরিয়ে আনতে গিয়ে চুনির কী হল না হল তা নিয়ে আমার কোনও মাথাব্যথা নেই। তবে হীরার চোখের সামনে কিছু না হলেই হল। একটা গভীর শ্বাস পড়ল, বাচ্চা মেয়ে তো! তা ছাড়া ছোটবেলায় চুনির কোলেপিঠে করেই মানুষ হয়েছে।
