লেজ গুটিয়ে চলে গেল খুদে। যাওয়ার সময় গজগজ করছিল আর মাথা নাড়ছিল।
নজর মহম্মদ দুটো হাত সামনে জড়ো করে রেখেছে। আঙুলে আঙুলে পাচানো। চোখ আধবোজা। মুখ শান্ত। মাথার চুল দু-এক গাছা কপালে।
নজর! শরদিন্দু গলার স্বর আবার মোলায়েম করে ফেলেছেন? মিস্টার শিকদারকে পাশের ঘরে নিয়ে যাও। নিরিবিলিতে বসে গোটা ব্যাপারটা ওঁকে বুঝিয়ে দাও। যেন কোনও গোলমাল হয়।
জি মিত্ৰসাব। বলে অভিবাদনের ভঙ্গিতে মাথাটা সামান্য ঝুঁকিয়ে আবার সোজা হল নজর। আমার দিকে শান্ত চোখে তাকিয়ে বলল, চলিয়ে শিকদারসাব, আপসমে বাত করতে হয়।
অতএব ফাইলটি বগলদাবা করে নজরকে অনুসরণ করলাম।
মিত্ৰসাহেব পিছন থেকে বললেন, উইশ ইউ বেস্ট অব লাক–।
আমি মুখ না ফিরিয়ে বাঁ হাতটা ওপরে তুলে ওঁর শুভেচ্ছা গ্রহণ করলাম। খুদেকে থাপ্পড় কষিয়ে আমার ডান হাতটা জ্বালা-জ্বালা করছিল। সুতরাং দরজা পার হয়ে স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা খুদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বলে ফেললাম, তোমার গাল এত খসখসে কেন গো? গালে কিরিম-টিরিম মালিশ করো না–।
খুদের মুখ থেকে একটা চাপা গরগর শব্দ শোনা গেল।
নজর পিছনে তাকিয়ে বলল, শিকদারবাবু, আমাদের সামনে অনেক কাজ পড়ে আছে। কাজ হয়ে গেলে ঢের দিল্লাগি করা যাবে, কী বলেন!
আমি মনে-মনে একে চন্দ্র, দুয়ে পক্ষ বলতে শুরু করলাম। রাগ কমানোর এ এক অব্যর্থ ওষুধ। ছোটবেলায় বাবার কাছে শিখেছি। এখন শেখানোর কেউ নেই। বাবা-মা দুজনেই বহুবছর ধরে দেওয়ালে ফটো হয়ে ঝুলছে। আমি বছরে দুটো মালা কিনি, ফটোয় লাগাই। আর সেই দিন দুটোয় কোনও খারাপ কাজ করি না। কাউকে দুঃখ দিই না। শুধু নিজে দুঃখ পাই। অন্ধকার নিঃঝুম ঘরে কোলের ওপরে চাঁদের আলো নিয়ে জানলার ধারে বসে থাকি। টেপরেকর্ডারের ক্যাসেটে নীচুস্বরে সুমন চট্টোপাধ্যায়ের গান বাজতে থাকে, বুকে বিঁধতে থাকে তীব্রভাবে ও প্রথমত আমি তোমাকে চাই। দ্বিতীয়ত আমি তোমাকে চাই। তৃতীয়ত আমি তোমাকে চাই। শেষপর্যন্ত তোমাকে চাই…।
কিন্তু কাকে চাই আমি নিজেই জানি না।
.
ছিমছামভাবে সাজানো একটা বসবার ঘরে গিয়ে ঢুকলাম। ঘরের সর্বত্র রুচি ও পয়সার ছাপ। ভেলভেট মোড়া নরম যে-সোফায় বসলাম তার মধ্যেও কোমল বিলাসী আমন্ত্রণ।
বিশাল ঘরের তিন দেওয়ালে তিনটে পেইন্টিং। আর চতুর্থ দেওয়ালে সুন্দর ওয়াল ক্যাবিনেট। তার পাল্লা কাচের। তাই তাকে সাজানো কারণবারির বোতলগুলো চোখে পড়ছে। তার নীচে একপাশে ফ্রিজ।
দেখেশুনে মনে হয় এটা বোধহয় শরদিন্দু মিত্রের গোপন ব্যবসায়িক কথাবার্তার আপ্যায়নকক্ষ। যেমন এখন আমি আর নজর মহম্মদ ব্যবসায়িক আলোচনা করতে বসেছি।
আমি আর নজর মুখোমুখি বসে। মাঝের টেবিলে পড়ে আছে প্লাস্টিক কভার ফাইলটা। তার পাশেই কারুকাজ করা এক কাচের ফুলদানিতে রজনীগন্ধাগুচ্ছ।
আমি ঘরটাকে খুঁটিয়ে দেখছিলাম। হঠাৎই নজরের কথায় চমক ভাঙল।
শিকদারসাব, এই হল হীরা।
আমি চোখ ফিরিয়ে তাকালাম।
ফাইলের কোনও আনাচকানাচ থেকে পোস্টকার্ড মাপের একটা রঙিন ফটোগ্রাফ বের করে ফেলেছে নজর।
ছবির মেয়েটাকে দেখে আমি হতবাক হয়ে গেলাম। এত সুন্দরও কাউকে দেখতে হয়! টানা-টানা নিষ্পাপ চোখ। ধনুকের মতো ভুরু। তার মাঝে সবুজ এক চিলতে টিপ। তার নীচ থেকেই কোমল রেখায় নেমে গেছে নাক। নাকের বাঁ দিকে হীরের নাকছাবি। তারপর স্ফুরিত আমন্ত্রণী ঠোঁট এবং মানানসই চিবুক।
ফটোটা গলার খানিক নীচেই শেষ হয়েছে। কিন্তু কোনও পুরুষকে প্রতিবন্ধী করে দেবার পক্ষে তাই যথেষ্ট। যেমন, আমি এখন বোবা হয়ে গেছি।
আমি বললাম, ফটোটা আমার লাগবে।
নজর হাসল। এই প্রথম ওর শান্তশিষ্ট ভদ্রতার মুখোশ সামান্য সরে গেল যেন। ও বলল, শুধু ফটো কেন, ইচ্ছে করলে এই গোটা ফাইলটাই আপনি নিতে পারেন।
হীরার ফটোটা হাতে নিয়ে দেখতে-দেখতে আমি বললাম, এবারে গোটা গল্পটা আমাকে বলুন। তার পরে ফাইল দেখছি–
নজর বলতে শুরু করল, চুনিবাবু, মানে চুনিলাল বন্দ্যোপাধ্যায় আমাদের মেটাল কোম্পানির ডেপুটি ম্যানেজার। আজ প্রায় পনেরো বছর ধরে চাকরি করছে। কোম্পানি তখন ছোট ছিল। ডান হাতটা শূন্যে নেড়ে ঘরটাকে দেখিয়ে নজর বলল, এসব ঠাটবাট কিছুই ছিল
আমার চোখ গেল কারণবারিক্যাবিনেটের দিকে। বললাম, নজরসাব, ওগুলো কি শুধু চোখে দেখার জন্যে, না চেখে দেখার জন্যে।
নজর মহম্মদ তৎক্ষণাৎ গুস্তাখি মাফ বলে উঠে পড়েছে সোফা ছেড়ে, এবং এগিয়ে গেছে কাবিনেটের দিকে। সেখান থেকেই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে আমাকে, আপনার পসন্দ কী আছে বলুন?
আমি ঠোঁট উলটে কাঁধ কঁকালাম। যার অর্থ যা তোক কিছু একটা হলেই চলবে। মদ আর অস্ত্রের ব্যাপারে আমার খুব একটা বাছবিচার নেই।
এরপর সুন্দর কাচের গ্লাসে বরফ ডোবানো মদিরা নিয়ে বসে পড়েছি আমি আর নজর মহম্মদ মুখোমুখি।
নজরের কাছ থেকে গল্পটা যা জানা গেল তা সংক্ষেপে এই
চুনিবাবু হীরাকে ছোটবেলা থেকে দেখছে। আর কোম্পানির প্রায় শুরু থেকেই মিত্ৰসাহেবের ডান হাত হয়ে কাজ করে গেছে। শরদিন্দু মিত্রের বিপদে-আপদে চুনি ব্যানার্জি যা করেছে তা ভোলার নয়। মিত্ৰসাহেবও ওকে খুব স্নেহ করেন–অন্তত করতেন, হীরাকে নিয়ে ভেগে পড়ার আগে। হীরা মিত্রসাহেবের চোখের মণি। তাঁর মেটাল বিজনেসের রাজত্ব আর রাজকন্যা কার হাতে তুলে দেবেন তা ঠিক না করলেও, সেই ভাগ্যবান যে চুনি বন্দ্যোপাধ্যায় নয়, সেটা বোধহয় তিনি ঠিক করে ফেলেছিলেন। তাই যখন টের পেলেন চুনির সঙ্গে হীরার আশনাই চলছে, তখন বিরক্ত হয়েছিলেন, রেগেও গিয়েছিলেন। তারপর একদিন নজর আর খুদের সামনে চুনিকে একা ডেকে শাসিয়েছিলেন। শরদিন্দু মিত্রের শাসানিকে ভয় পায় না এমন লোক খুব বেশি নেই। চুনি ভয় পেয়েছিল। কিন্তু হীরাকে না পাওয়ার ভয়টা ছিল আরও বেশি। তাই কেঁদেকেটে বলেছিল, আপনার ব্যবসা চাই না, একটা ফুটো পয়সাও চাই না, শুধু হীরাকে চাই। ওকে আমি, আমি…।
