পাপিয়া মিষ্টু আর বাপ্পাকে ভেতরে নিয়ে গেল। যাওয়ার আগে বারকয়েক আশঙ্কার নজরে শমিতকে দেখল।
পরিচয়ের পালা শেষ হল।
প্রথমজন যিনি এতক্ষণ কথাবার্তা চালিয়েছেন–প্রফুল্ল পান। বয়েস পঞ্চাশের ওপাশে। রং ময়লা। মাথায় কদমছাঁট কাঁচা-পাকা চুল। বাঁ-গালে একটা আঁচিল। মুখে অনেক ভাঁজ। চোয়ালে সাদা দাড়ির খোঁচা উঁকি মারছে।
ভদ্রলোকের বোধহয় নস্যি নেওয়ার অভ্যেস আছে। কারণ, ওঁর নীল-রঙা হাফ শার্টের বেশ কয়েক জায়গায় নস্যির দাগ।
দ্বিতীয়জনের নাম যোগেশ দাশগুপ্ত। বয়েস পঁয়তাল্লিশের এদিক-ওদিক। মাথায় টাক তাকে ঘিরে চুলের ঝালর। ঠোঁটের ওপরে মোটা গোঁফ। চোখে গোল-গোল কাচের চশমা–অনেকটা পাচার চোখের মতন। শরীরের কাঠামো বেশ শক্তপোক্ত। মাথায় প্রফুল্ল পানের চেয়ে খাটো। আর মুখে সবসময় কেমন একটা হাসি-হাসি ভাব।
যোগেশের সিগারেটটা শেষ হয়ে এসেছিল। ওটা অ্যাশট্রেতে ফেলে দিয়ে তিনি ভুরু উঁচিয়ে আলতো করে জিগ্যেস করলেন, হাতে ব্যান্ডেজ কীসের?
শমিত থতমতো খেয়ে বলল, কাল একটু চোট পেয়েছি…।
উত্তর শুনে প্রফুল্ল পান হাসলেন, বললেন, অত তাড়াহুড়ো করে বানিয়ে বলার দরকার নেই। ধীরেসুস্থে সময় নিয়ে বলুন। কারণ, আমরা আপনার গল্পটার প্রতিটি ভাঁজ চেক করে দেখব গাদাগাদা প্রশ্ন করব। তখন আপনার গল্পটা লালবাতি জ্বেলে বসে থাকবে। যাই হোক, টেক ইয়োর টাইম…।
যোগেশ পকেট থেকে একটা ছোট নোটবই বের করে তার দু-চারটে পাতা উলটে দেখে তারপর প্রশ্ন করলেন, ডব্লিউ বি জিরো টু সিটু ওয়ান টু নাইন…এই নম্বরের মারুতি গাড়িটা আপনার?
হ্যাঁ–।
অ্যাক্সিডেন্টের ব্যাপারটা আমাদের খুলে বলুন…।
শমিত পালা করে দুজন অফিসারের দিকে তাকাচ্ছিল আর নখ খুঁটছিল। তারপর হোঁচট খেয়ে কথা বলতে শুরু করল, অ্যাক্সিডেন্ট…মানে…সেদিন…।
হাত তুলে ওকে ভরসা দিলেন প্রফুল্ল পান, বললেন, আপনি মিছিমিছি নার্ভাস হচ্ছেন। রুদ্রদা..মানে, রুদ্রপ্রতাপ সেনের সঙ্গে তো এ-ব্যাপারে আপনার আগেই কথা হয়েছে…।
শমিত যেন অকুল সমুদ্রে লাইফবোট খুঁজে পেল। তাড়াতাড়ি মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, হ্যাঁ– হ্যাঁ।
রুদ্রপ্রতাপ সেন লালবাজারের সিনিয়র ইন্সপেক্টর–চন্দ্রদেও আগরওয়ালের বন্ধু। ওঁর সঙ্গেই ফোনে কথা বলেছিল শমিত।
ও আর থাকতে পারল না। সরাসরি প্রফুল্ল পানের হাত চেপে ধরল। অনুনয় করে বলল, আমাদের আপনারা বাঁচান! এভাবে আমরা আর পারছি না!
ভরসা খুঁজতে চেয়ে শমিতের চোখে জল এসে গেল।
প্রফুল্ল ওর হাতে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, একটুও আপসেট হবেন না, মিস্টার রায়চৌধুরী, আমরা কিন্তু আপনাকে হেল্প করতেই এসেছি। রুদ্রদা আপনার সম্পর্কে আমাদের বলেছেন। আপনি নির্ভয়ে আমাদের সব খুলে বলুন। আমরা আপনার বন্ধু…।
শমিত কাঁপা হাতে পকেট থেকে সিগারেট বের করে যোগেশকে অফার করল। যোগেশ মাথা নেড়ে না বলায় নিজে একটা ধরাল। সিগারেটে বড়মাপের একটা টান দিয়ে ধাতস্থ হয়ে পাপিয়াকে চেঁচিয়ে ডাকল।
পাপিয়া ড্রইং-ডাইনিং-এ এলে শমিত ওকে বসতে বলল। অফিসার দুজনের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়ে বলল, ওঁরা আমাদের বন্ধু। আমাদের বিপদে হেল্প করতে চান…।
শমিত আর পাপিয়া পালা করে গোটা গল্পটা ওঁদের শোনাল।
প্রফল্ল পান আর যোগেশ দাশগুপ্ত চুপটি করে শুনলেন, দু-একবার হুঁ-হাঁ ছাড়া একটি কথাও বললেন না। তবে যোগেশ একটা বলপয়েন্ট পেন দিয়ে তার নোটবইতে যথেচ্ছ নোট নিচ্ছিলেন।
ওদের বলা শেষ হলে শব্দ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন প্রফুল্ল, পকেট থেকে নস্যির ডিবে বের করে শব্দ করে নস্যি নিলেন। শমিত লক্ষ করল, পাপিয়া ঘেন্নায় একটু শিউরে উঠল।
ব্যাপারটা প্রফুল্লর নজর এড়ায়নি। তিনি হেসে বললেন, সরি ম্যাডাম, আমার নেশাটা বড় বাজে। তা ছাড়া ডিউটির সময়ে নেশা করা ঠিক নয়। কিন্তু আমাদের দুজনের নেশার অভ্যেসটা ডিপার্টমেন্ট জানে। যোগেশ স্মোকার আর আমি স্নাফার…।
স্নাফার? অবাক হয়ে বলল শমিত।
হ্যাঁ, স্নাফ মানে নস্যি, আর স্নাফার মানে আমি। অবশ্য স্নিফারও বলতে পারেন নস্যি সিফ করি তাই! শব্দ করে হাসলেন প্রফুল্ল পান।
যোগেশ বললেন, আপনাকে একবার আমাদের দপ্তরে আসতে হবে। তখন আপনার ডিটেইলড স্টেটমেন্ট রেকর্ড করে নেব। এবারে কাজের কথা শুনুন…আপনার কাছে আমরা যে জন্যে এসেছি…।
এই পর্যন্ত বলে প্রফুল্ল পানের দিকে তাকালেন যোগেশ। ভাবটা এমন যেন অনুমতি চাইছেন। প্রফুল্ল ছোট্ট করে মাথা হেলিয়ে ইশারা করলেন, যার অর্থ বলো। তখন যোগেশ শমিতের দিকে তাকিয়ে বললেন, যে-অ্যাম্বাসাডরটার সঙ্গে আপনার গাড়ির ক্র্যাশ হয় তাতে দুজন হার্ড বয়েলড ক্রিমিনাল ছিল সুধীর পাণ্ডে আর বিনোদ শর্মা। ওদের নামে প্রায় গোটাদশেক করে কেস ঝুলছে –তাতে মার্ডার, কিডন্যাপিং থেকে শুরু করে সবই আছে। সুধীর মারা গেছে, কিন্তু বিনোদ শর্মা বেঁচে আছে–এখনও। তবে ওর অবস্থা ভালো নয়…এখনও আমরা ওকে জিজ্ঞাসাবাদ করে উঠতে পারিনি। লোকাল থানা ব্যাপারটা আমাদের রিপোর্ট করেছিল। পরে আমরা খতিয়ে দেখি যে, সুধীর আর বিনোদের বেশ কয়েকটা কেস আমাদের কাছে আছে। তখন ব্যাপারটা আমরা টেক আপ করি।
যাই হোক, আমাদের ধারণা সুধীর আর বিনোদের গ্যাং-ই আপনাদের ফোন করে থ্রেট করছিল…কী বলেন, প্রফুল্লদা? প্রফুল্ল পানের দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করলেন যোগেশ।
