শমিতের ক্লান্ত হাত থেকে ভোজালিটা খসে পড়ল।
দু-চারজন করে লোকের ভিড় জমতে শুরু করল। শমিতকে ধরে তুলল সবাই। কেউ একজন ওর হাতের কাটা জায়গাটা একটা রুমাল দিয়ে বেঁধে দিল। শমিতের ভীষণ ঘুম পাচ্ছিল। সেই অবস্থাতেই ও এদিক-ওদিক তাকিয়ে ব্রিফকেসটা খুঁজতে লাগল।
দু-তিনজন লোক তখন জল ঢেলে পলিথিনের আগুন নেভাতে চেষ্টা করছে। কয়েকজন ট্যাক্সি! ট্যাক্সি! করে হাঁক পেড়ে ছুটন্ত ট্যাক্সি দাঁড় করাতে চাইছে। দু-চারজন শমিতকে ঘিরে নানান প্রশ্ন করছে।
এরই মধ্যে কে যেন বলে উঠল, দাদাকে মানিকতলা থানায় নিয়ে চল।
আর-একজন বলল, তার আগে দত্ত মেডিকেল থেকে হাতটা ব্যান্ডেজ করিয়ে নে।
শমিত কিছু একটা বলতে চাইছিল, কিন্তু ওর ঠোঁট কাঁপছিল..মুখ দিয়ে কোনও কথা বেরোচ্ছিল না।
তিন-চারজন লোক ওকে নিয়ে একটা ট্যাক্সিতে উঠল। শমিত লক্ষ করল, একজনের হাতে ওর ব্রিফকেসটা রয়েছে, আর-একজনের হাতে রক্তমাখা ভোজালিটা। তবে ভোজালির বাঁটটা লোকটি খবরের কাগজ দিয়ে মুড়ে নিয়েছে।
শমিতের হাতে ওষুধপত্র লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করা হল। কী একটা ইনজেকশনও যেন দিয়ে দিল দোকান থেকে। তারপর ট্যাক্সি চলল মানিকতলা থানার দিকে।
শমিত মিনমিন করে বলল, আমি বাড়িতে একটা ফোন করব…।
আর তখনই ওর মোবাইল ফোনটার কথা খেয়াল হল।
ফোনটা সবসময় ওর বাঁ-পকেটে থাকে। দু-পকেট ছুঁয়ে দেখল শমিত। না, ফোনটা নেই। হয়তো কোথাও ছিটকে পড়ে গেছে।
মানিকতলা থানা খুব কাছেই–পৌঁছোতে কয়েক মিনিটের বেশি লাগল না।
একজন পুলিশ অফিসার ওদের কাছ থেকে সব জেনে নিয়ে জেনারেল ডায়েরি লিখলেন। শমিতদের অনেক প্রশ্নও করলেন।
মোটরবাইকের নম্বরটা কেউ দেখেছেন কি?
না।
লোকগুলো কীরকম দেখতে?
শমিত যথাসাধ্য বর্ণনা দিল।
আপনাকে হঠাৎ অ্যাটাক করতে গেল কেন?
কী জানি! হয়তো ছিনতাইয়ের মতলব ছিল। আমার সেলফোনটা তো পাচ্ছি না…।
অফিসার ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বহু প্রশ্ন করা সত্ত্বেও শমিত মিষ্টুর ব্যাপারে একটি কথাও বলল না।
অফিসার ভোজালিটা জমা নিলেন। একজন সাদা-পোশাক পুলিশকে বললেন অকুস্থলটা দেখে আসতে। শমিতের সঙ্গীদের কাউকে সঙ্গে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করলেন।
থানা থেকে বাড়িতে ফোন করার সুযোগ পেল শমিত।
পাপিয়া ফোন ধরতেই ও বলল, পাপিয়া, একটুও চিন্তা কোরো না। আমি ঠিক আছি। আধঘণ্টার মধ্যে বাড়ি পৌঁছোচ্ছি…।
পাপিয়া ধরা গলায় বলল, আমরা এদিকে ভেবে-ভেবে মরছি। মোবাইলে ফোন করলে শুধু রিং হয়ে যাচ্ছে। তুমি শিগগির চলে এসো…মিষ্টু আর বাপ্পা মনখারাপ করে বসে আছে…।
শমিত ফোনটা ছেড়ে দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু পারল না। ও-প্রান্ত থেকে মিষ্টু হঠাৎ আঙ্কল বলে শমিতকে ডেকে উঠেছে।
মেয়েটার গলা শুনতে পাওয়া মাত্রই শমিতের বুকের ভেতরটা কেমন হু-হু করে উঠল। আর একই সঙ্গে বাঁ-হাতের যন্ত্রণাটা কোন এক ম্যাজিকে মিলিয়ে গেল।
মিষ্টুসোনা, আমি এক্ষুণি বাড়ি যাচ্ছি…তুমি মনখারাপ কোরো না, লক্ষ্মীটি…।
আঙ্কল, তোমার কিছু হয়নি তো?
না, মা-মণি, কিচ্ছু হয়নি। বাপ্পাদাদা কী করছে?
ওদের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলার পর শমিতের টেনশনটা কমে এল। রিসিভার নামিয়ে রেখে ও অফিসারের সঙ্গে ফর্মালিটি মিটিয়ে নিল চটপট। কয়েকটা জায়গায় সই করে দিল। গোটা-গোটা হরফে নাম-ঠিকানা-ফোননম্বর লিখে দিল।
শমিতের সঙ্গী লোকজনও দরকারমতো সইসাবুদ করে দিল। তারপর ওরা দল বেঁধে থানা থেকে বেরিয়ে এল।
ওরাই শমিতকে ট্যাক্সি ডেকে তুলে দিল। গার্জেনি ঢঙে সাবধান করে দিল বারবার। ট্যাক্সি ড্রাইভারকেও সতর্ক করে দিল।
বাড়ি ফেরার পথে শমিত ভাবছিল, এই শহরের মানুষ শান্তিপ্রিয় বটে, তবে তারা অসময়ে বড় আপনজন, তাদের আদর-যত্নের কোনও জবাব নেই। ওদের কথা শমিতের বহুদিন মনে থাকবে।
.
মঙ্গলবার সকালবেলা শমিত তৈরি হয়ে অফিসে বেরোতে যাবে, ঠিক তখনই ফ্ল্যাটের কলিংবেল বেজে উঠল।
পাপিয়া ম্যাজিক আই-তে চোখ রেখেই ঘুরে তাকাল, শমিতকে ডাকল ইশারায়। শমিত কাছে এলে চাপা গলায় বলল, দুজন লোক..চিনি না…।
শমিতও একচোখ দিয়ে দেখল। ভারী চেহারার দুজন লোক। একজনের হাতে সিগারেট।
দরজা খুলতে দেরি হচ্ছে দেখে ফ্ল্যাটের কলিংবেল পরপর আরও দুবার বেজে উঠল।
শমিত পাপিয়াকে পিছিয়ে যেতে বলল। তারপর কাঠের পাল্লাটা সামান্য ফাঁক করে উঁকি মারল। তালাবন্ধ কোলাপসিবল গেটটা শমিতকে ভরসা জোগাচ্ছিল। গেটের লোহার গরাদের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা দুজনের একজন কথা বললেন।
শমিত রায়চৌধুরী?
হ্যাঁ– সায় দিয়ে মাথা নাড়ল শমিত।
আপনার মারুতি গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট করেছে? গত বুধবার?
হ-হ্যাঁ… ইতস্তত করে শমিত বলল। ওর গলাটা কেমন যেন শুকিয়ে যাচ্ছিল।
আমরা লালবাজার থেকে আসছি। ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের অফিসার। পকেট থেকে ফটোওয়ালা একটা আইডেন্টিটি কার্ড বের করে দেখালেন ভদ্রলোক : আপনার সঙ্গে জরুরি কথা আছে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই হয়ে যাবে…।
শমিত আমতা-আমতা করে বলল, আ-আমি এখন তো অফিসে বেরোচ্ছি। মানে…।
ভদ্রলোক হাসলেনঃ পুলিশ তো আর অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে আসবে না…খুলুন।
শেষ শব্দটায় আদেশের সুর ছিল। শমিত আর দেরি না করে দরজা হাট করে খুলে দিল। কোলাপসি গেটও খুলে দিল।
ভদ্রলোক দুজন এপাশ-ওপাশ তাকিয়ে ফ্ল্যাটের চারপাশটা জরিপ করতে লাগলেন। তারপর দুটো সোফায় দুজনে বসে পড়লেন। চ্যাম্প কোথা থেকে এসে হাজির হল। ওঁদের আশেপাশে ঘুরঘুর করতে লাগল আর গন্ধ শুঁকতে লাগল। দুজনের মধ্যে যার বয়েস একটু বেশি তিনি চ্যাম্পের মাথায়-ঘাড়ে কয়েকবার হাত বুলিয়ে দিলেন। হেসে বললেন, আমি কুকুর পুষি। আমার গায়ে কুকুরের গন্ধ পাচ্ছে বলে ও চেঁচামেচি করছে না।
