শমিত রাস্তা পার হয়ে দিগভ্রান্তের মতো ছুটতে লাগল। কোনও একটা দোকানঘর কি বাড়ির দরজা খোলা পেলেই ও সটান ঢুকে পড়বে। তারপর দেখবে লোক দুটো কেমন করে ওকে কজা করে!
কিন্তু শমিতের কপাল খারাপ। কোনও বাড়ি বা দোকানের দরজা ও খোলা পেল না।
রাস্তার ভাঙা ফুটপাথে কয়েকটা বড়-বড় গাছ। সেগুলোর অন্ধকার পাতা থেকে টপটপ করে জল পড়ছে। তারই একটা গাছের নীচে একটা চায়ের স্টল। তার মাথায় পলিথিনের চাদর। চা তৈরির উনুনের পাশে হ্যারিকেন জ্বলছে। রোগা টিংটিঙে দোকানি ছাড়া ভাঙা বেঞ্চিতে বসে আছে ছায়া-ছায়া একজন খদ্দের।
পাগলের মতো ছুটে যাওয়ার সময় শমিত খেয়াল করেনি। পলিথিন টাঙানোর একটা দড়ি ওর বুকের কাছটায় আটকে গেল। সঙ্গে সঙ্গে দড়িটা ছিঁড়ে গেল বটে, কিন্তু শমিত লাট খেয়ে হুড়মুড় করে আছড়ে পড়ল চায়ের দোকানটার ওপরে। ওর ব্রিফকেস ছিটকে গেল হাত থেকে।
এতক্ষণ শমিত চিৎকার করেনি। কিন্তু এইবার চিৎকার করল। যন্ত্রণার আর্তনাদ বেরিয়ে এল ওর মুখ থেকে।
দড়ি ছিঁড়ে পলিথিনের শিটটা ঝুলে পড়ল দোকানের ওপরে। তার একটা কোনা বোধহয় উনুনে ঠেকে গিয়েছিল, কারণ প্লাস্টিক-পোড়া গন্ধ শমিতের নাকে এল।
ও টাল খেয়ে পড়েছিল বেঞ্চির লোকটার ঘাড়ে, সেখান থেকে পাক খেয়ে উনুনের মুখের কাছে। একপাশে রাখা কয়লার টুকরোগুলো ওর শরীরের নানা জায়গায় খোঁচা মারছিল, আর অসহ্য তাপে ওর মুখ ঝলসে যেতে চাইল।
ওই অবস্থাতেই শমিত দেখল, চায়ের দোকানদার ও তার একমাত্র খদ্দের পড়িমড়ি করে ছুটে পালাচ্ছে। কারণ, ওরা হিংস্রভাবে ধেয়ে আসা দুটো লোককে দেখতে পেয়েছে। দেখতে পেয়েছে সামনের লোকটির হাতে বাগিয়ে ধরা চকচকে ভোজালিটাও।
একমুহূর্তের মধ্যে শমিত বুঝে গেল ওকে বাঁচাতে কেউ আর আসবে না। কারণ, এই শহরের বেশিরভাগ মানুষ শান্তিপ্রিয় অশান্তিতে জড়াতে কেউ চায় না।
অশ্রাব্য গালিগালাজ করতে করতে তোক দুটো ঝুঁকে পড়ল শমিতের ওপরে। শমিত চিত হয়ে শুয়ে অসহায়ভাবে ওদের ভয়ংকর মুখের দিকে চেয়ে রইল। ওর মুখ দিয়ে অর্থহীন চাপা আর্তনাদ বেরিয়ে আসছিল।
সামনের লোকটা হাসতে-হাসতে ভোজালি তুলল। তার শাকরেদ মন্তব্য করল, একটু-আধটু পালিশ দিয়ে ছেড়ে দে। দু-চার পোঁচড়া–ব্যস। জানে খতম করলে বস খেপে যাবে–সেরকম হুকুম নেই।
ভোজালি হাতে লোকটা দাঁত বের করে হাসল, শমিতের দিকে তাকিয়ে মন্তব্য করল, ব্যাটা কেমন কুত্তার মতো কুঁইকুঁই করছে দেখ। এখানে হাজার চিল্লালেও কুত্তাভি আসবে না।
সবকিছুই খুব দ্রুত ঘটে যাচ্ছিল, অথচ শমিত যেন দেখছিল স্লো-মোশনে।
ভোজালিটা নেমে আসছে। শমিত তা হলে কুত্তারও অধম–চ্যাম্পেরও অধম।
মিষ্টুর মুখটা মনে পড়ছে বাপ্পার মুখ, পাপিয়ার মুখও। আর কি ওদের সঙ্গে দেখা হবে? কিন্তু শমিত যে ওদের সঙ্গে দেখা করতে চায়। মিষ্টুকে ও আদর করতে চায় প্রাণভরে।
যো ডর গয়া, সমঝো কে মর গয়া।
মানুষ মরার আগে কখনও মরে না।
শমিতের বাঁ-হাত একগাদা কয়লার টুকরো খুঁজে পেল।
উনুনের তাপে মুখ জ্বলছে।
ওর ডানহাত একটা কিছু আঁকড়ে ধরার চেষ্টায় অন্ধের মতো খামচাচ্ছিল, হঠাৎই উনুন খোঁচানোর বাঁকানো শিকটা পেয়ে গেল।
ভোজালির প্রথম কোপটা নেমে এল ওর বাঁ-হাত লক্ষ্য করে। কিন্তু শমিত ততক্ষণে বাঁ হাতে মুঠো করা কয়লার টুকরোগুলো ছুঁড়ে দিয়েছে লোকটার মুখে। একইসঙ্গে কবজি আর কনুইয়ের মাঝামাঝি ভোজালিটা কেটে বসল।
জন্তুর মতো দাঁত খিঁচিয়ে চিৎকার করে উঠল শমিত। ওই অবস্থাতেই উঠে বসার চেষ্টা করল। এবং ডানহাতে ধরা লোহার শিকটা অলৌকিক এক শক্তিতে ঢুকিয়ে দিল ভোজালিওয়ালার পেটে।
ক্ষমা সবসময় পরম ধর্ম নয়। দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালনও প্রয়োজন। দাঁতের বদলে দাঁত, চোখের বদলে চোখ।
সামনের লোকটা ভোজালি আবার তুলেছিল শূন্যে, কিন্তু শমিতের কয়লার গুঁড়ো আর শিক ওর সব অঙ্ক গোলমাল করে দিল। ওর হাত থেকে ভোজালি খসে পড়ল। ও চোখ কচলাতে কচলাতে মাথা নীচু করে অবাক হয়ে তাকাল পেটের দিকে। সেখান থেকে শিকের খানিকটা অংশ বেরিয়ে আছে দেখেও ব্যাপারটা ও যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না। শিকটা এত সহজে ঢুকে গেল পেটে!
ওর সঙ্গের লোকটা ভয় পেয়ে গেল। সঙ্গীর হাত ধরে টান মারল। শমিত কাত হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল ভোজালিটার ওপরে। অবশ হয়ে আসা রক্তাক্ত বাঁ-হাত আর ডানহাত একসঙ্গে জড়ো করে অতিকষ্টে ভোজালির বাঁট খামচে ধরল। পাগলের মতো চিৎকার করে ভোজালি উঁচিয়ে ধরল। ওকে অবাক করে দিয়ে গালাগালির স্রোত বেরিয়ে আসতে লাগল ওর মুখ থেকে। বোঝা গেল, দাঁত নখের লড়াইয়ে ওর ভেতরের আদিম মানুষটা বেরিয়ে এসেছে বাইরে। ও অন্ধরাগে ভোজালিটা শুন্যে এপাশ-ওপাশ চালাতে লাগল, আর একই সঙ্গে আহত জন্তুর মতো গর্জন করতে লাগল।
পলিথিন-শিটটায় কখন যেন আগুন ধরে গেছে। কটু গন্ধে ভরে যাচ্ছে চারদিক। শমিতের মাথার ভেতরটা ঝিমঝিম করছিল। হাত-পা কাঁপছিল থরথর করে। বাঁ-হাতে অসহ্য যন্ত্রণা।
সেই অবস্থাতেই ও দেখল, লোক দুটো পালিয়ে যাচ্ছে। একজন খোঁড়াচ্ছে, আর-একজন তাকে জাপটে ধরে হাঁটছে।
ওরা মোটরবাইকে উঠে রওনা হয়ে গেল। আহত লোকটা পিছনে বসে সামনের সঙ্গীর গায়ে এমনভাবে এলিয়ে পড়ে আছে যেন ঘুমিয়ে পড়েছে।
