মিষ্টু তখন বাপ্পার সঙ্গে ক্রিকেট খেলা শুরু করে দিয়েছে।
মালিনীর আদরের হাত থেকে নিষ্কৃতি পেয়েই মিষ্টু চলে গেছে বাপ্পার কাছে। বাপ্পা কোথা থেকে একটা ক্রিকেট ব্যাট নিয়ে এসেছিল, সেটা দেখেই মিষ্টু একটা বল নিয়ে ওর সঙ্গে মেতে উঠেছে। বাবা-মায়ের সম্পর্কে ওর কোনওরকম আগ্রহ আছে বলে মনে হল না।
ওর দিকে ইশারা করে তন্ময় বললেন, দেখেছেন, আমাদের নিয়ে মিষ্টুর কোনওরকম মাথাব্যথা নেই! এটা আমাদের কাছে কত পেইনফুল ভাবুন তো! ভাবুন তো, আপনার ছেলে আপনাকে…আই মিন…চিনতে পারছে না! কেমন লাগবে সেটা! ওঃ! মাথা নীচু করলেন তন্ময় ও আসলে কী জানেন? ওর এই মেমোরি লসের জন্য আমরাই ইনডিরেক্টলি দায়ী।
কেন, আপনারা দায়ী কেন? পাপিয়া প্রশ্ন করল।
মালিনী আবার কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, তন্ময় ওঁকে বাধা দিয়ে বললেন, মালিনী, প্লিজ, আমাকে বলতে দাও। আমার যদি কোথাও গ্যাপ পড়ে যায়…আই মিন ভুল-টুল হয়, তখন তুমি আমাকে শুধরে দিয়ো।
সিগারেটে বারদুয়েক টান দিলেন তন্ময়। চ্যাম্পকে একবার দেখলেন। তারপর খানিকটা আনমনাভাবে বললেন, সবই আমাদের কপাল, মিস্টার রায়চৌধুরী! আমাদের বাড়ি তালতলা অঞ্চলে…আই মিন…এস.এন.ব্যানার্জি রোডে। মাসখানেক আগে আমরা মিষ্টুকে বউবাজারে ওর এক বন্ধুর বাড়ি নিয়ে যাই। পরদিন ওর ফিরে আসার কথা। শ্রেয়া…আই মিন ওর বন্ধু…বলেছিল, আঙ্কল, সঙ্গীতা আমাদের বাড়িতে দু-তিনদিন থাকুক, তারপর বাপি ওকে বাড়ি দিয়ে আসবে। আমরা..আই মিন আমি আর মালিনী…রাজি হইনি। মিষ্টু আমাদের এমনই একটা জ্যান্ত খেলার পুতুল যে, ওকে ছেড়ে আমরা একটুও থাকতে পারি না। যাই হোক, পরদিন বিকেলে মিষ্টুকে দিয়ে আসার জন্যে শ্রেয়ার বাপি…আই মিন সুদেববাবুকে..আমি বারবার করে রিকোয়েস্ট করলাম। তিনি রাজি হলেন। আমরা চলে এলাম…।
কিন্তু পরদিন বিকেলে মিষ্টু এল না। তখন আমি ওদের বাড়িতে ফোন করলাম। ফোন বেজেই চলল–কেউ ধরল না। তখন আমার আর মালিনীর খুব দুশ্চিন্তা হল। বুঝতেই পারছেন, কোয়াইট ন্যাচারাল। মালিনী তো কান্নাকাটি শুরু করে দিল। ওকে অনেক কষ্টে শান্ত করে সন্ধে সাড়ে সাতটা নাগাদ আমি শ্রেয়াদের বাড়ি রওনা হলাম। পথে ভাবতে-ভাবতে গেলাম যে, শ্রেয়ার বাপিকে…আই মিন সুদেববাবুকে…আচ্ছা করে দু-চারকথা শুনিয়ে দেব। বলব যে, মশাই, এই আপনার কাণ্ডজ্ঞান! এদিকে চিন্তায়-চিন্তায় আমরা মরছি!
ওদের বাড়ি পৌঁছে দেখি ভারী অদ্ভুত ব্যাপার। বাড়ি একেবারে খাঁ-খাঁ…আই মিন বাড়িতে কেউ নেই। শ্রেয়াদের ছোট একতলা বাড়ি–নিজেদের বাড়ি, কোনও ভাড়াটে নেই। তাই সদরের ভেজানো দরজা ঠেলতেই খুলে গেল দেখে আমার সন্দেহ হয়েছিল।
গোটা বাড়ি অন্ধকার। আমার তো বেশ ভয়-ভয় করছিল। শ্রেয়া আর মিষ্টুর নাম ধরে অনেক ডাকাডাকি করেও কোনও সাড়া পেলাম না। তবুও সাহসে ভর করে শুধুমাত্র মিষ্টুর জন্যে আমি সবকটা ঘর, রান্নাঘর, বাথরুম তন্নতন্ন করে খুঁজলাম। কিন্তু ওর কোনও হদিস না পেয়ে আমার কান্না পেয়ে গেল। অন্ধকার ঘরের মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসে কপাল চাপড়াতে লাগলাম। কী করে বাড়ি ফিরে আমি মালিনীকে মুখ দেখাব!
বেশ কিছুক্ষণ পর…আই মিন প্রায় আধঘণ্টামতন হবে…নিজেকে ধীরে-ধীরে সামলে নিলাম। আর ঠিক তখনই একটা চাপাকান্নার শব্দ আমার কানে এল। একটা ছোট ছেলে বা মেয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
কে? মিষ্টু না! আমি ওর নাম ধরে ডেকে উঠলাম : মিষ্টু! মিষ্টু! আর সঙ্গে-সঙ্গে সাড়া পেলাম। কান্না থামিয়ে কে যেন বলে উঠল, এই যে, আমি.. এখানে…। একলাফে উঠে দাঁড়ালাম আমি। অন্ধকার ঘরে এদিক-ওদিক খুঁজতে লাগলাম। একটু পরেই ওকে পেলাম। খাটের নীচ থেকে বেরিয়ে এল। আমি ওকে জাপটে ধরলাম। টের পেলাম, ও বাচ্চা খরগোশের মতো ভয়ে কাঁপছে।
ওকে নিয়ে ছুটে বেরিয়ে এলাম বাইরে। তারপর সোজা রওনা হলাম বাড়ির দিকে। শ্রেয়াদের ব্যাপার নিয়ে একটিবারের জন্যেও ভাবলাম না। হয়তো আমার পুলিশে খবর দেওয়া উচিত ছিল, কিন্তু…।
তন্ময় হাজরা থামলেন। হাতের সিগারেটটা শেষ হয়ে এসেছিল–এটা অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিলেন।
শমিত আর পাপিয়া একমনে তন্ময়ের কথা শুনছিল। শমিত আনমনাভাবে সিগারেটে টান দিচ্ছিল আর ভাবছিল, শ্রেয়াদের হঠাৎ উধাও হওয়ার ব্যাপারটা তন্ময় পুলিশে জানাননি। শমিতরাও তা হলে মিষ্টুর ব্যাপারটা থানায় না জানিয়ে খুব একটা অন্যায় করেনি!
মালিনী বললেন, ও আমাকে ফোন করে সব বলেছিল..তখন আমিও পুলিশে খবর দিতে বারণ করেছি। কারণ, থানা-পুলিশ হলেই আবার সতেরো ঝামেলা…।
কিন্তু আপনাদের কাছ থেকে মিষ্টু আবার হারিয়ে গেল কেমন করে? তন্ময়কে জিগ্যেস করল শমিত। ফিলটার পোড়া গন্ধ পেতেই ও সিগারেটের টুকরোটা ফেলে দিল অ্যাশট্রেতে।
তন্ময় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, সে আর-এক অদ্ভুত গল্প। লাস্ট সোমবার ওকে ডাক্তার দেখিয়ে নিয়ে আমি আর মালিনী বাগুইআটি থেকে বাড়ি ফিরছিলাম। বাগুইআটির বাস স্টপেজে দাঁড়িয়ে ছিলাম বাসের জন্যে। আমাদের চারপাশে লোকজনের বেশ ভিড় ছিল। খিদে পেয়েছে বলাতে মিষ্টুকে একটা বিস্কুটের প্যাকেট কিনে দিয়েছিলাম। ও প্যাকেট ছিঁড়ে বিস্কুট খাচ্ছিল আর বাসস্টপে ঘুরে বেড়ানো কয়েকটা নেড়ি কুকুরকে মাঝে-মাঝে বিস্কুটের টুকরো ছুঁড়ে দিচ্ছিল। হঠাৎই দেখি মিষ্টু আমাদের সঙ্গে নেই। আমরা আশপাশের লোকজনকে জিগ্যেস করাতে তারা বলল, মেয়েটা তো দুটো কুকুরের উৎপাতে তাড়া খেয়ে ওদিকটায় চলে গেল! ও আপনাদের সঙ্গে ছিল?
