তখন মুষলধারে বৃষ্টি নেমে গেছে। তারই মধ্যে আমরা দুজনে কাকভেজা হয়ে মিষ্টুকে খুঁজতে লাগলাম। এ-রাস্তা সে-রাস্তা আর অলিগলি করে আমরা হন্যে হয়ে পড়লাম। কোত্থাও মেয়েটাকে পেলাম না। হতাশায় মাথা নাড়লেন তন্ময়। তারপর শমিত আর পাপিয়ার দিকে পালা করে তাকিয়ে বললেন, আমাদের অবস্থাটা একবার বুঝুন! মালিনীর পাগলের মতো কান্নাকাটি দেখে আমি ভয় পেয়ে গেলাম…ও আবার না উলটোপালটা কিছু করে বসে…আই মিন সুইসাইড টাইপের কিছু।
একটু থামলেন তন্ময়। চোয়ালে বার-দুয়েক হাত বুলিয়ে বললেন, এবার তো থানা-পুলিশ করতেই হল। তারপর পুলিশের ভরসায় থাকতে না পেরে কাগজে বিজ্ঞাপন দিলাম। সত্যি, ঈশ্বরের লীলার কোনও জবাব নেই। শেষ পর্যন্ত তিনিই মেলালেন। ওপরদিকে মুখ তুলে হাতজোড় করে নমস্কার করলেন তন্ময়।
মালিনীও চোখের জল মুছে প্রণাম জানালেন ভগবানকে। তবে ওঁর বেলায় এই ভক্তিটা শমিতের কাছে কেমন যেন বেমানান ঠেকল। সেটা বোধহয় ওঁর সাজপোশাকের জন্য।
হঠাৎই ঘড়ির দিকে তাকিয়ে তন্ময় হাজরা বলে উঠলেন, মিস্টার রায়চৌধুরী, আর রাত করব না–নটা বেজে গেছে, এবার আমরা উঠব। আপনারা আমাদের যা উপকার করলেন…জীবনে কখনও ভুলব না। আপনারা..আই মিন…আমাদের প্রাণ ফিরিয়ে দিলেন।
মালিনী দু-হাতে পাপিয়ার হাত চেপে ধরলেন : আপনাদের কী পুরস্কার দেব জানি না…।
পাপিয়া ঘন-ঘন চোখ মুছছিল। মাথা নেড়ে বলল, পুরস্কারের কী আছে! এ তো যে-কোনও মানুষের কর্তব্য।
মিষ্টু বোধহয় ওই এরিয়াতেই পথ হারিয়ে এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করছিল। আপনারা ওকে খুঁজে না পেলে কী হত ভাবুন তো! এবার একটু মিষ্টুকে ডাকুন…।
তন্ময় আর মালিনী একইসঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন।
মিষ্টু আর বাপ্পা খেলতে-খেলতে কখন যেন বড় বেডরুমটায় ঢুকে পড়েছিল। পাপিয়া গলা তুলে মিস্তুকে ডাকল।
ডাক শুনে মিষ্টু আর বাপ্পা ড্রইং-ডাইনিং-এ এল। আর তারপরই শুরু হল সাংঘাতিক কাণ্ড।
মিষ্টু জেদ ধরে বসলঃ কিছুতেই ও তন্ময় আর মালিনীর সঙ্গে যাবে না–ও আঙ্কল আর আন্টির কাছেই থাকবে।
পাপিয়া আর শমিত মিলে ওকে অনেক করে বোঝাল। বলল যে, ওঁরা ওর বাবা-মা। মিষ্টু ওঁদের সঙ্গে নিজের বাড়িতে ফিরে গেলে সবাই খুশি হবে। কিন্তু কে শোনে কার কথা! ওর মুখে সেই এক বুলি : আমি আঙ্কল আর আন্টি আর বাপ্পাদাদাকে ছেড়ে অন্যলোকের সঙ্গে কিছুতেই যাব না। আমাকে তোমরা তাড়িয়ে দিয়ো না…তা হলে আমি মরে যাব..প্লিজ..।
তন্ময় আর মালিনীও অনেক চেষ্টা করলেন। মিষ্টুর গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে অনেক আদর-টাদর করে বোঝাতে চাইলেন। কিন্তু কিছু করা গেল না। মালিনীর প্রবল কান্নাকাটিতেও মিষ্টুর মন নরম হল না।
শেষে বাপ্পাও ওকে বোঝাতে চেষ্টা করল। বলল, তুই তোর বাবা-মায়ের সঙ্গে এখন যা কাল আবার আমাদের বাড়িতে আসিস..আমরা একসঙ্গে পার্কে গিয়ে খেলব।
উত্তরে মিষ্টু বলল যে, সেরকম হলে তন্ময় আর মালিনী রোজ এ-বাড়িতে মিষ্টুর সঙ্গে দেখা করতে আসতে পারেন, কিন্তু মিষ্টু কিছুতেই বাপ্পাদের ছেড়ে যাবে না।
সব মিলিয়ে তখন রীতিমতো একটা হইচই চলছে। চ্যাম্প ব্যাপার-স্যাপার কিছু বুঝতে না পেরে বারবার এর-ওর দিকে তাকাচ্ছে আর ঘেউঘেউ করছে। মিষ্টু পাগলের মতো মাথা নেড়ে না-না বলছে, কাঁদছে। আর বাকি পাঁচজন ওকে নানাভাবে বোঝাতে চেষ্টা করছে।
এইসব কারণেই টেলিফোনটা যে বাজছে সেটা প্রথমটায় কেউ খেয়াল করেনি।
ব্যাপারটা প্রথম খেয়াল করল বাপ্পা। ও শমিতকে ডেকে বলল, বাবা, টেলিফোন।
শমিত তাড়াতাড়ি টেলিফোন ধরতে ছুটল।
আজ ও অফিসে যায়নি। তাই অফিস থেকেই কোনও কলিগ হয়তো ফোন করে থাকতে পারে। সামনের মাসে একটা বড়সড় ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রুপের সতেরোজন এক্সিকিউটিভকে ট্রেনিং দেওয়ার ব্যাপারে খুব জোর কথাবার্তা চলছে। হয়তো সেই ব্যাপারেই মদনলাল জানা কিংবা শংকর ভাসওয়ানি ফোন করে থাকতে পারে। যদি…।
হ্যালো।
হ্যালো, রায়চৌধুরীসাহেব, মুন্নাকা সমাচার কেয়া? সেই মিহি গলা। তবে তাতে বেশ খানিকটা ধারালো ব্যঙ্গ মিশে রয়েছে।
কে মুন্না? কে বলছেন আপনি? ভয়ে কাঠ হয়ে গেলেও প্রশ্নগুলো করল শমিত।
আহারে আমার ন্যাকাগঙ্গারাম! মেয়েলি ঢঙে বলল লোকটা। তারপর রীতিমতো শাসানি দিয়ে বলল, মিষ্টুর ব্যাপারটা কী হল? আর মাত্র দু-দিন টাইম আছে। তারপর একদম ঘড়ি বন্ধ…পাক্কা বন্ধ..বুঝতে পারলেন কিছু, নাকি…।
বুঝেছি…বুঝেছি।..আ-আমি..আমরা কিছু একটা করব। এখন ঘরে সব গেস্টরা রয়েছে..প্লিজ..।
বাই সানডে করতেই হবে। ওটাই ডেডলাইন…নইলে ডেড.. মুখে গুলি ছোঁড়ার শব্দ করল লোকটা। তারপর ফোন রেখে দিল।
শমিতের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। ও অদ্ভুত এক স্লো মোশনে রিসিভারটা নামিয়ে রাখল। তারপর পাপিয়াদের দিকে তাকিয়েই অবাক হয়ে গেল।
ওরা সবাই হাঁ করে শমিতের দিকে তাকিয়ে আছে। বোধহয় টেলিফোনের কথাবার্তা শুনতে পেয়েছে।
শমিত তক্ষুণি কোনও কথা বলতে পারল না।
পাপিয়া ব্যাপারটা বুঝতে পেরে তন্ময়দের দিকে তাকিয়ে বলল, আপনারা কিছু মাইন্ড করবেন না। মানে…একজনের কাছ থেকে ও টাকা লোন নিয়েছিল…ভীষণ বাজে লোক। তো সেই লোকটা যখন-তখন ফোন করে হুমকি দেয়…যা-তা বলে। অথচ ও ঠিক মাসে-মাসে অল্প-অল্প করে পোন শোধ করে যাচ্ছে…।
