তন্ময় হাজরার গায়ের রং ময়লা। চেহারা বেঁটেখাটো। মাথায় টাক। চোখে সাধারণ চশমা। পরনের জামা-প্যান্টও মামুলি। বয়েস বড়জোর চল্লিশ কি বিয়াল্লিশ–শমিতের কাছাকাছি। কথাবার্তায় কেমন একটা মিনমিনে সঙ্কুচিত ভাব।
কিন্তু মালিনীকে দেখে একটু অবাক হলো শমিত।
ফরসা ছিপছিপে ধারাল রূপসি। পরনে দামি সিল্কের শাড়ি। বয়েস খুব বাড়িয়ে বললে সাতাশ কি আঠাশ। নাক-মুখ-চোখ এত সুন্দর যে, মালিনী সহজেই টিভি সিরিয়ালের নায়িকা হতে পারেন। তন্ময়ের স্ত্রী হিসেবে ওঁকে কেন যেন বেশ বেমানান লাগছিল।
তন্ময়ের হাতে বড় একটা মিষ্টির প্যাকেট ছিল। সেটা শমিতের হাতে ধরিয়ে দিলেন তিনি। মালিনীর হাতে এক বিশাল মাপের পলিথিনের ঝোলা–তাতে বেশ কয়েকটা রঙিন বাক্স চোখে পড়ছে। ওঁর চোখ চঞ্চলভাবে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিল–মিষ্টুকেই খুঁজছিল বোধহয়। কিন্তু একটু আগেই মিষ্টু উঠে টয়লেটে গেছে। তাই মালিনী আকুলভাবে শমিতের দিকে তাকালেন, তারপর তাকালেন স্বামীর দিকে।
চ্যাম্প তন্ময় আর মালিনীকে ঘিরে ঘুরপাক খাচ্ছিল, বারবার নাক ঠেকাচ্ছিল ওঁদের পোশাকে।
শমিত ওঁদের সোফায় বসতে বলল। তারপর অন্দরের দিকে তাকিয়ে একটু উঁচু গলায় হাঁক পাড়ল, পাপিয়া, তন্ময়বাবুরা এসেছেন…।
বাপ্পা হাঁ করে মিষ্টুর মা-বাবাকে দেখছিল। আজ সারাদিন ধরে বেড়ানোর সময় পাপিয়া ওকে সবকথা বলেছে। বলেছে, আজ মিষ্টুর মা-বাবা মিষ্টুকে নিতে আসবেন।
বাপ্পার ভীষণ মনখারাপ লাগছিল। মিষ্টু চলে যাবে ওদের বাড়ি ছেড়ে!
এমন সময় মিষ্টু আর পাপিয়া একসঙ্গে ড্রইং-ডাইনিং-এ এল। ওদের নজর সরাসরি গিয়ে পড়ল অতিথি দুজনের দিকে। শমিত লক্ষ করল মিষ্টুর চোখে কৌতূহল।
মালিনী হঠাৎ সোফা ছেড়ে ছিটকে উঠে পড়লেন। মিষ্টু– বলে এক তীব্র হাহাকার তুলে ছুটে গিয়ে জাপটে ধরলেন মিষ্টুকে। চুমোয়-চুমোয় ওকে অস্থির করে তুললেন।
মিষ্টু…আমার মিষ্টু সোনা! তুমি কোথায় চলে গিয়েছিলে, মা-মণি? তোমার জন্যে কেঁদে কেঁদে আমি তো মরেই যাচ্ছিলাম! মা-মণি আমার…। মালিনীর গলা কান্নায় জড়িয়ে গেল।
তন্ময়ও সোফা ছেড়ে উঠে চলে গেলেন মিষ্টুর কাছে। ওর মাথায় হাত বোলাতে লাগলেন।
শমিত লক্ষ করল তন্ময়ের চোখের কোণে জল চিকচিক করছে।
পাপিয়া আকুল বাবা-মাকে দেখছিল আর চোখ মুছছিল। হারানো-সন্তানকে ফিরে পাওয়া মানে শরীর আর প্রাণের মিলন। এ-দৃশ্য এত আনন্দের যে, আবেগকে ধরে রাখা যায় না।
এরপর যেন উৎসব শুরু হয়ে গেল শমিতদের ফ্ল্যাটে।
মালিনী ওঁর পলিথিনের ঝোলা থেকে রঙিন বাক্সগুলো বের করলেন। বাক্সগুলো খুলতেই বেরোল রং-বেরঙের খেলনা। সেগুলো দিয়ে ফিরে-পাওয়া মেয়েকে একেবারে মুড়ে দিলেন। বাবা মায়ের আদরে-আদরে মিষ্টু একেবারে অস্থির হয়ে উঠল। কিন্তু মেয়েটা সবসময়েই মালিনীকে অপরিচিতের চোখে দেখতে লাগল।
সারাদিন বাইরে ঘুরবে বলে কাজের লোককে শমিতরা ছুটি দিয়েছিল। তাই তন্ময়দের জন্য মিষ্টি কিনতে শমিত নিজেই বেরোল। তন্ময়দের কোনও আপত্তি শুনল না।
মালিনী আর তন্ময় বাপ্পার সঙ্গে আলাপে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। একটা খেলনা ওকে দিয়ে মালিনী বললেন, এই অটোমেটিক রিভলভারটা তুমি নাও মিষ্টু খুশি হবে।
ওদের কথাবার্তায় মাঝেই ফিরে এল শমিত। ওর হাত থেকে মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে তন্ময় আর মালিনীর আপ্যায়ন সারল পাপিয়া।
তারপর সবাই মিলে গোল হয়ে বসে দুনিয়ার গল্প শুরু হয়ে গেল।
শমিত বলল, কীভাবে মিষ্টুকে ওরা রাস্তায় পেয়েছে। তবে ভয়-দেখানো ফোনের কথাও বলল না, আর অ্যাম্বাসাডরের অ্যাক্সিডেন্টের কথাটাও বলল না। শুধু বলল, মিষ্টুর স্মৃতি হারিয়ে যাওয়ার কথা। ওকে নিয়ে গিয়ে যে সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানো হয়েছে সে কথা জানাল। আর সবশেষে বলল, নানান সাত-পাঁচ ভেবে ওরা মিষ্টুকে পেয়ে পুলিশে কোনও খবর দেয়নি। তখন পাপিয়া পুলিশে খবর না দেওয়ার কারণগুলোও বলল।
তন্ময় হঠাৎই একটু গম্ভীর হয়ে গেলেন। নীচু গলায় বললেন, আমরাও ওকে ডাক্তার…আই মিন…সাইকিয়াট্রিস্ট দেখাচ্ছিলাম। কিন্তু ইমপ্রুভমেন্ট তো সেরকম কিছু হল না। ডক্টর বলেছেন, চেষ্টা করতে করতে কোনদিন হঠাৎই ওর মেমোরি ফিরে আসবে…আই মিন…সব কথা মনে পড়ে যাবে।
তন্ময়ের কথা শুনতে-শুনতে আঁতকে উঠল পাপিয়া। মিষ্টুর যদি সবকথা মনে পড়ে যায় তা হলেই তো সর্বনাশ! টেলিফোনে ওই লোকটা বলেছিল, মিষ্টু অনেক কথা জানে। সেসব কথা মনে পড়ে গেলে ওদের যাচ্ছেতাই বিপদ হবে।
তন্ময় ও মালিনীর সঙ্গে চায়ের পালা শেষ করে একটা সিগারেট ধরিয়েছিল শমিত। টেলিফোনের কথাগুলো ওর মনেও একইসঙ্গে খোঁচা মারছিল। তন্ময় আর মালিনীকে কি টেলিফোনের ব্যাপারটা জানানো উচিত? কিন্তু সেটা বলতে গেলেই তো আরও অনেক কথা বলতে হবে। তারপর যে-জিনিসটা ওরা সবচেয়ে বেশি এড়াতে চাইছে, সেটাই ঘুরেফিরে এসে পড়বে : পুলিশ।
শমিত পাপিয়ার দিকে তাকাল। চোখে-চোখে কথা হল ওদের। পাপিয়া ছোট্ট করে এপাশ ওপাশ মাথা নাড়ল–যার মানে, না, বোলো না।
শমিত তখন তন্ময়দের জিগ্যেস করল, কিন্তু হঠাৎ করে ওর মেমোরি লস হলো কী করে? ও কি কোনও শক-টক পেয়েছিল?
তন্ময় হাজরাও চায়ের পর সিগারেট ধরিয়েছিলেন। শমিতের কথার উত্তরে মালিনী কী একটা বলতে যাচ্ছিলেন, তন্ময় সিগারেটসমেত হাত শূন্যে তুলে ইশারায় ওঁকে বাধা দিলেন। তারপর আড়চোখে তাকালেন মিষ্টুর দিকে।
