শমিত কোনও কথা বলল না। রোবটের মতো আবেগহীনভাবে চলে গেল টেলিফোনের কাছে। খবরের কাগজ দেখে মোবাইল নম্বরটা ডায়াল করল।
পাপিয়া পাথরের মূর্তি হয়ে শমিতকে দেখতে লাগল। ওর সবরকম বোধ কেমন যেন অসাড় হয়ে যাচ্ছিল।
হ্যালো, মিস্টার তন্ময় হাজরা বলছেন?
হ্যাঁ বলছি। ওপাশ থেকে উত্তর ভেসে এল।
লাইনটা একটু ডিসটার্ব করছিল। তাই শমিত একটু গলা তুলেই বলল, আপনাদের দেওয়া অ্যাডটা দেখে ফোন করছি। আমার নাম শমিত রায়চৌধুরী। আপনাদের মেয়ে মিষ্টু আমাদের কাছে আছে…।
সত্যি? সত্যি বলছেন? ভদ্রলোক আকুল গলায় জিগ্যেস করলেন।
হ্যাঁ, সত্যি… কথা বলতে গিয়ে মনের আবেগ চাপতে পারছিল না শমিত। তাই সংক্ষেপে কথা শেষ করার জন্য বলল, আজ সন্ধেবেলা সাতটা নাগাদ আপনারা আমাদের বাড়িতে আসুন…এলে ডিটেইলসে সব জানতে পারবেন…।
তারপর শমিত ওঁদের ফ্ল্যাটের ঠিকানা দিল। কীভাবে এই ফ্ল্যাটে আসতে হবে তাও বলে দিল।
তন্ময় হাজরা শমিতকে বারবার ধন্যবাদ জানালেন। বললেন, মেয়েকে হারিয়ে ওঁর স্ত্রী মালিনীর প্রায় পাগলের মতো অবস্থা। এরকম অবস্থায় আরও এক-দু-সপ্তাহ কেটে গেলে ওঁর কী হত বলা যায় না। আজ সন্ধে সাতটার সময় তিনি অবশ্যই স্ত্রীকে নিয়ে আসবেন।
ফোনটা করা হয়ে গেলে শমিত কিছুক্ষণ মনমরা হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। পাপিয়াকে দেখল, দেখল মিষ্টু আর বাপ্পাকেও। শমিতকে দেখে বোঝা যাচ্ছিল, মনে-মনে ও কিছু একটা ভাবছে।
মিনিটখানেক পরেই ও বাপ্পা আর মিষ্টুকে কাছে ডাকল। ওরা আসতেই শমিত হেসে বলল, শোন, তোদের একটা দারুণ খবর দেব। আজ আমি অফিস ছুটি নিচ্ছি। আর, বাপ্পা, তুই আজ স্কুলে যাবি না…।
কেন, বাবা?
আজ সারাটা দিন আমরা হইহই করে ছুটি কাটাব। ট্যাক্সি নিয়ে গোটা কলকাতা ঘুরব। তাজ বেঙ্গলে লাঞ্চ খাব। দুপুরের শো-তে একটা সিনেমা দেখব…তারপর ময়দানে হাওয়া খাব, ভিক্টোরিয়ায় বেড়াব, তোদের জন্যে নতুন ড্রেস কিনব, মিষ্টুর জন্যে খেলনা কিনব..যা খুশি তাই করব। বলো, দারুণ জমবে না?
শেষ প্রশ্নটা শমিত করেছে পাপিয়ার দিকে তাকিয়ে।
পাপিয়া মানুষটার ভেতরের কষ্ট বুঝতে পারছিল। ওর মন ঝলসে যাওয়ার গন্ধ পাচ্ছিল নাকে। শমিতের বাইরেটা হাসিখুশিতে টগবগে, কিন্তু ওর চোখের কোণে জলের ফোঁটা চিকচিক করছিল।
পাপিয়া কষ্ট করে হাসল, উজ্জ্বল হওয়ার চেষ্টা করল। তারপর বলল, সত্যি, দারুণ হবে। আজকের দিনটা মিষ্টুর বহুদিন মনে থাকবে।
তারপরই সাজ-সাজ রব পড়ে গেল ওদের ফ্ল্যাটে। শমিত অফিসে ফোন করে বলে দিল, আজ ও ছুটি নিচ্ছে। পাপিয়া দশভুজা হয়ে রোজকার কাজ সারতে লাগল। তারপর কোনওরকমে ব্রেকফাস্ট সেরে ওরা চারজন বেরিয়ে পড়ল রাস্তায়। চ্যাম্পকে ওরা জমা রেখে গেল পাশের ফ্ল্যাটের নিরঞ্জনবাবুর কাছে। খুব বেশি সময়ের জন্য বাইরে বেরোলে শমিত আর পাপিয়া চ্যাম্পকে নিরঞ্জনবাবুর জিম্মায় দিয়ে যায়।
সত্যি, আজ ওদের চারজনের যেন স্বাধীনতা দিবস।
শুধু ট্যাক্সিতে ওঠার সময় পাপিয়া চাপা গলায় শমিতকে মনে করিয়ে দিল, সাড়ে ছটার মধ্যে কিন্তু আমাদের ফিরতে হবে। ওঁরা সাতটার সময় আসবেন…।
শমিত ছোট্ট করে হুঁ বলল।
.
০৫.
ফ্ল্যাটের কলিংবেল বেজে উঠল ঠিক সাতটায়।
বেলের আওয়াজে পাপিয়া চমকে উঠল।
শমিত তাকাল মিষ্টুর দিকে।
মেয়েটা এখনও কিছু জানে না। অনেকবার বলতে চেয়েও শমিত কিংবা পাপিয়া ওকে কিছু বলতে পারেনি। শুধু কয়েকবার ওকে সঙ্গীতা বলে ডেকে দেখেছে, কিন্তু মিষ্টু সে-ডাকে সাড়া তো দেয়ইনি, উলটে অবাক হয়ে জানতে চেয়েছে, কে সঙ্গীতা? কাকে সঙ্গীতা বলে ডাকছ?
সারাদিন উদ্দামভাবে বেড়ানোর পর ওরা ভীষণ ক্লান্ত হয়ে সওয়া ছটা নাগাদ ফিরেছে। কিন্তু বাপ্পা আর মিস্তুর উৎসাহে ভাটা পড়েনি। ওরা নতুন কিনে আনা ড্রেস আর খেলনা নিয়ে ড্রইং-ডাইনিং-এ বসে পড়েছে। প্রতিটি জিনিস ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে চকচকে চোখে দেখছে, তারিফ করছে।
শমিত পাশের ফ্ল্যাট থেকে চ্যাম্পকে নিয়ে আসামাত্রই ও কুঁইকুঁই করে বাপ্পাকে ঘিরে ঘুরপাক খেতে লাগল, বারবার নাক ছোঁয়াল বাপ্পার গায়ে।
শমিত একটা চেয়ারে বসে একের পর এক সিগারেট খাচ্ছিল আর মিষ্টুকে দেখছিল। পাপিয়া নানান কাজে এ-ঘর সে-ঘর করছিল বটে, কিন্তু শমিত লক্ষ করল ওর সারা মুখে বর্ষার মেঘ।
বিকেল থেকে ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছিল। একটু আগে সেটা কয়েক ডিগ্রি বেড়েছে। কোথায় যেন ছড়ছড় করে জল পড়ার শব্দ হচ্ছে।
কলিংবেল বাজতেই শমিত উঠে গিয়ে দরজা খুলল।
দরজায় দাঁড়িয়ে একজন ভদ্রলোক আর ভদ্রমহিলা।
ভদ্রলোক আমতা-আমতা করে বললেন, আমরা শমিতবাবুর সঙ্গে দেখা করতে এসেছি। আমাদের…আই মিন..সাতটায় সময় আসার কথা ছিল..মানে…।
আপনার নাম? শমিত বুঝতে পারছিল প্রশ্নটা অবান্তর, কিন্তু ও এতটুকুও সন্দেহের ফাঁক রাখতে চাইল না। কারণ, টেলিফোনের ভয়-দেখানো কথাগুলো ওর কানে ভাসছিল।
আ-আমি তন্ময় হাজরা। থতিয়ে বললেন ভদ্রলোক। পাশে দাঁড়ানো মহিলার দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন, আমার ওয়াইফ..মালিনী। আমরা…আই মিন…মিষ্টুর…মানে, ইয়ে…সঙ্গীতার খোঁজে এসেছি…।
কোথায়? আমার মেয়ে মিষ্টু কোথায়? কাঁপা গলায় জানতে চাইলেন মালিনী।
শমিত ওঁদের ভেতরে আসতে বলল।
