এরপর ওরা চারজন লুডো খেলতে বসেছে ড্রইং-ডাইনিং-এ। আর চ্যাম্প মেঝেতে শুয়ে একমনে টিভি দেখছিল। অ্যানিম্যাল প্ল্যানেট কিংবা ন্যাশনাল জিয়োগ্রাফিক চ্যানেলে পশুপাখির ছবি দেখালেই চ্যাম্প একমনে সেগুলো দ্যাখে। তখন টিভি অফ করলেই ও চিৎকার শুরু করে দেয়। চ্যাম্পের এই অদ্ভুত নেশাটা বাপ্পার আবিষ্কার।
লুডো খেলতে খেলতে যখন ওরা মশগুল, পাকা ঘুঁটি-কাঁচা ঘুঁটির দান নিয়ে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া-চেঁচামেচি করছে, ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল।
শমিত উঠে গিয়ে ফোন ধরল। তার আগে আড়চোখে তাকাল দেওয়াল-ঘড়ির দিকে : সাড়ে নটা পেরিয়ে মিনিটদশেক হয়েছে।
হ্যালো।
শমিত রায়চৌধুরী? সেই মিহি গলা, তবে গলায় বিরক্ত ওপরওয়ালার সুর।
হ্যাঁ, বলছি…।
মিষ্টু এখনও বেঁচে আছে কেন?
এ-প্রশ্নের কী জবাব দেবে শমিত ঠিক বুঝতে পারল না। ও আমতা-আমতা করতে লাগল।
এখনও কেন বেঁচে আছে মেয়েটা? রুক্ষ অধৈর্য সুরে বুলেটের মতো ছুটে এল প্রশ্নটা।
শমিত আমতা-আমতা করে বলল, আমরা ওকে…ওকে..মারতে পারব না..আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়…প্লিজ… আপনি একটু বুঝতে চেষ্টা করুন…।
শমিত টেলিফোনে কাঁপা গলায় এইসব বলছিল আর তিনজন লুডো-খেলোয়াড় হাঁ করে ওর কথাগুলো গিলছিল।
বড় বেডরুমের দরজার কাছেই টেলিফোন। ফলে শমিতকে ওরা যেমন দেখতে পাচ্ছিল তেমন শুনতে পাচ্ছিল ওর কথা। শুনতে-শুনতে পাপিয়ার চোখ-মুখ কেমন যেন বদলে যাচ্ছিল।
ওসব বাজে বকওয়াস ছেড়ে কান খুলে শুনুন। এই সপ্তাহের মধ্যে কাজটা ফিনিশ করে দিন…দরকার হয় পাঁচ-দশ হাজার টাকাও দেব আপনাকে…গাড়িটা ভালো করে রিপেয়ার করিয়ে নিতে পারবেন। আর যদি এই উইকের মধ্যে কাজটা ফিনিশ করতে না পারেন, তাহলে মেয়েটাকে রাস্তায় একা বের করে দিন, আমরা কাজ ফিনিশ করে দেব। আপনার ফ্ল্যাটে গিয়েও আমরা কাজটা করতে পারি, কিন্তু তাতে মিষ্টুর সঙ্গে-সঙ্গে আরও দু-চার পিস জান বেহুদা খরচা হয়ে যাবে। সেটা তো ভালো হবে না…।
ঠিক আছে, ঠিক আছে…আমি দেখছি কী করা যায়…প্লিজ, আমাদের একটু ভাববার সময় দিন…প্লিজ…।
কিন্তু ততক্ষণে ও-প্রান্তের লোকটা ফোন রেখে দিয়েছে।
শমিত ঘামতে শুরু করেছিল। পাপিয়া, বাপ্পা আর মিষ্টু ওকে জরিপ করছিল। শমিতের ভয় হচ্ছিল, ওরা বোধহয় ওর বুকের ধড়াস ধড়াস আওয়াজগুলো শুনতে পাবে। ওর বারবার মনে হচ্ছিল, এই শহরে সাধারণ মানুষ কত অসহায়।
শমিত রিসিভার নামিয়ে রাখল।
কী হয়েছে, বাবা! কে ফোন করেছে? বাপ্পা জিগ্যেস করল।
আঙ্কল, তুমি এত ঘামছ কেন? মিষ্টু জানতে চাইল।
পাপিয়া ওদের প্রশ্নগুলো ধামাচাপা দেওয়ার জন্য তাড়াতাড়ি বলে উঠল, চল তো, তোরা এখন খেতে চল। চট করে হাত-মুখ ধুয়ে নে…। উঠে দাঁড়িয়ে ওদের তাড়া লাগাল পাপিয়া।
শমিত বেডরুমের দরজা থেকে ধীরে-ধীরে পা ফেলে ড্রইং-ডাইনিং-এ এল।
ওরা কাকে মেরে ফেলতে বলছে, আঙ্কল?
মিষ্টু প্রশ্নটা করতেই পাপিয়া ডুকরে কেঁদে উঠল। ওকে জড়িয়ে ধরে কান্না চাপতে-চাপতে বলল, ওটা পাগলের ফোন..ওসব কথা তোরা শুনিস না…।
ব্যাপারটা তখনকার মতো মিটে গেলেও বাপ্পা আর মিষ্টুর মনে খটকা লেগেই রইল।
রাতে বাপ্পা আর মিষ্টু ঘুমিয়ে পড়লে শমিত আর পাপিয়া ড্রইং-ডাইনিং-এ টিভি দেখতে বসেছে। কিন্তু টিভির ছবি কিংবা কথা ওদের মাথায় ঢুকছিল না। ঘরের আলো নিভিয়ে চুপচাপ বসে ছিল ওরা দুজনে। টিভির পরদার আলো ওদের থমথমে মুখে হাইলাইট তৈরি করেছে। শমিত একটার পর একটা সিগারেট ধরাচ্ছিল। আর পাপিয়া বারবার ভগবানের কাছে প্রার্থনা জানাচ্ছিল যেন তিনি এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার একটা পথ বলে দেন।
মিষ্টুকে কী করে খুন করবে ওরা! কী করে রাস্তায় বের করে দেবে মেয়েটাকে! মানুষ কখনও এমন কাজ পারে না। এমন কাজ করতে হলে অমানুষ হতে হয়–টেলিফোন করা ওই লোকটার মতো। যার বাইরের চেহারাটা মানুষের মতো–ভেতরটা নয়।
এক অদ্ভুত দোটানায় দুলতে-দুলতে কাল অনেক রাত পর্যন্ত জেগে বসে থেকেছে পাপিয়া আর শমিত। ভেবেছে, এখন ওদের কী করা উচিত। ভাবতে-ভাবতে মাথার যন্ত্রণা শুরু হয়ে গেছে, কিন্তু পথের হদিশ মেলেনি। সারাটা রাত প্রায় জেগে কাটিয়ে হঠাৎই শমিত দ্যাখে আকাশ কখন যেন ফরসা হয়ে গেছে।
তারপর আজ সকালের খবরের কাগজ ওদের সব সমস্যার সমাধান করে দিয়েছে। পুলিশের ভয় আর নেই। টেলিফোনে হুমকির ভয়ও আর থাকবে না। ভগবান নিশ্চয়ই পাপিয়ার আকুল প্রার্থনা শুনতে পেয়েছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও পাপিয়া বা শমিত খুশি হতে পারছে না কেন!
পাপিয়া খবরের কাগজটা ভাঁজ করে শোবার ঘরের আলমারির মাথায় তুলে রাখতে যাচ্ছিল, শমিত হঠাৎই চেয়ারে সোজা হয়ে বসল, ওকে ডাকলঃ কাগজটা দাও।
কেন?
মিষ্টুর বাড়িতে ফোন করব। এভাবে আমি আর পারছি না…এখন এটাই একমাত্র পথ। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল শমিত, বড় বেডরুমটার দিকে দু-পা এগিয়ে গেল।
পাপিয়া শমিতকে দেখল। ওর চোখে প্রতিজ্ঞা, চোয়াল শক্ত। সত্যিই ও আর পারছে না। এই কদিনেই চোখের কোল কেমন বসে গেছে।
হাতের পিঠ দিয়ে চোখের জল মুছে শমিতের কাছে এল পাপিয়া। শমিতের দিকে না তাকিয়ে কাগজটা ওর দিকে বাড়িয়ে দিল। ধরা গলায় অস্পষ্টভাবে বলল, যা ভালো বোঝো করো…।
