ওইটুকু পুঁচকে মেয়ে, অথচ কী অসামান্য সুরের দখল! অবহেলায় সুরকে খেলাচ্ছে!
শমিতের চোখ আবেশে বুজে আসছিল।
আশ্চর্য! পুরোনো সবকথা ভুলে গেলেও গানটাতো ও ভোলেনি! এরকম কি হয়?
পাপিয়া শমিতের পাশটিতে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল–খবরের কাগজের হেড-লাইনগুলো আনমনাভাবে পড়তে চেষ্টা করছিল। হঠাৎই ও চমকে উঠল।
কাগজের দুইয়ের পাতায় মিষ্টুর ছবি ছাপা হয়েছে।
ও এক ঠেলা মারল শমিতকে। বলল, শিগগির দ্যাখো! মিষ্টুর ছবি দিয়েছে কাগজে। ছবিটায় আঙুল ছোঁয়াল পাপিয়া। নীচু গলায় জিগ্যেস করল, এটা মিষ্টু না?
শমিতের আবেশ-টাবেশ তখন ছুটে গেছে। কারণ, ও ততক্ষণে ছবির নীচের চার-ছলাইন লেখাটাও পড়ে ফেলেছে:
আমাদের দশ বছরের মেয়ে মিষ্টু, ভালো নাম সঙ্গীতা, গত সোমবার বাগুইআটি বাসস্টপ থেকে নিখোঁজ। একটা শক পেয়ে পুরোনো সব কথা ও ভুলে গেছে। কোনও সহৃদয় বন্ধু দয়া করে ওর সন্ধান দিলে আমরা সাধ্যমতো পুরস্কার দেব, প্রাণে বাঁচব।
তন্ময় ও মালিনী হাজরা ফোন ৯৮৩১১০৪২৩২
বারবার মির ফটোগ্রাফটা দেখল শমিত।
নাঃ, ভুল হওয়ার কোনও প্রশ্নই নেই।
সঙ্গে-সঙ্গে ওর বুকটা স্বস্তিতে হালকা হল, কিন্তু তারপরই ভারী হয়ে উঠল আবার। মিষ্টুর বাবা-মায়ের খোঁজ পাওয়া গেছে। ওঁরা এবার নিয়ে যাবেন ওঁদের আদরের মেয়েকে।
শমিতের বুকের ভেতরে একটা পাথর গড়াতে লাগল। ওর সেঁক গিলতে কষ্ট হচ্ছিল। এই চারদিনে ছোট্ট মেয়েটা ওদের সঙ্গে এত জড়িয়ে গেছে যে, এই সম্পর্ক ছিন্ন করতে গেলে বুকের ভেতরে রক্তক্ষরণ হবেই।
পাপিয়ার মুখের দিকে তাকাল শমিত। প্রায় কাঁদো কাঁদো মুখে মিষ্টুর ফটোটার দিকে তাকিয়ে রয়েছে ও। শমিত বুঝতে পারল পাপিয়ার বুকের ভেতরে ঢেঁকির পাড় পড়ছে।
মিষ্টুর মা-বাবার কষ্টটা একবার ভেবে দ্যাখো…। আলতো করে বলল শমিত।
পাপিয়া চুপ করে রইল। ভাবল, আজকের সকালটা না হলেই ভালো হত।
শমিত বলল, কাগজটার কিছু একটা ব্যবস্থা করো…মিষ্টু বা বাপ্পা যেন ছবিটা না দ্যাখে। আমাকে একটু ভাবতে দাও।
চা খাওয়া ছেড়ে চেয়ারে গা এলিয়ে দিল শমিত। চোখ বন্ধ করে ডান হাতটা ভাঁজ করে রাখল চোখের ওপরে। ওর চা ঠান্ডা হতে লাগল।
পাপিয়া মিষ্টুর দিকে অপলকে তাকিয়ে খবরের কাগজটা ভাঁজ করতে লাগল।
মিষ্টুর গান শেষ হয়ে গিয়েছিল। এখন বাপ্পা ওকে অনভ্যস্ত গলায় দু-চারলাইন হিন্দি গান শোনাচ্ছিল। এরপরই হয়তো দুজনে অন্তাক্ষরী খেলা শুরু করে দেবে। তারপর অনেক বকাঝকা করলে বাপ্পা একটু বই নিয়ে বসবে।
শমিত গতকালের কথা ভাবছিল। গতকালটা খুব ঝামেলার মধ্যে কেটেছে শমিতের।
ওর দিনের প্রথম কাজ ছিল গাড়িটাকে গ্যারেজে পাঠানো। কিন্তু তার আগেই বেশ কয়েকজন প্রতিবেশীর সমবেদনা ওকে শুনতে হয়েছে।
কলকাতার মতো বিচ্ছিরি ট্র্যাফিক ব্যবস্থা পৃথিবীর আর কোনও শহরে নেই।
দেখুন গিয়ে, ড্রাইভারটা হয়তো নেশা-টেশা করে গাড়ি চালাচ্ছিল।
গ্যারেজে তো আপনার প্রায় পাঁচ-সাত হাজার টাকা লেগে যাবে।
ওই গাড়িটার কাছ থেকে কত টাকা আদায় করতে পারলেন?
গাড়ি সারানোর খরচা আপনার অফিস দেবে না? আপনার তো মশাই সাহেব-কোম্পানি!
শমিত মামুলি উত্তর দিয়ে পাশ কাটিয়ে গেছে।
গ্যারেজে গাড়িটাকে জমা করে দিয়ে এসে পুলিশের ব্যাপারটা নিয়ে পড়ল শমিত। অফিসে বেরোনোর সময় পাপিয়াকে ও বলল, আমাদের অফিসের প্রজেক্ট ম্যানেজার চন্দ্রদেও আগরওয়ালের পুলিশে কিছু জানা-চেনা আছে। আজ ওর সঙ্গে কথা বলে ওর চেনা কোনও অফিসারের সঙ্গে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করব। তারপর ওকে সঙ্গে নিয়ে সেই পুলিশ অফিসারের সঙ্গে কথা বলতে যাব। তাঁকে সব বলে দেখি কী সাজেশান দেন…।
কী হয় আমাকে ফোন করে জানিয়ো…নইলে খুব টেনশন হবে। পাপিয়া বলল।
শমিত মাথা নেড়ে বলল, করব। শোনো, আজ ফিরতে আমার একটু দেরি হতে পারে। তুমি ওদের নিয়ে খুব সাবধানে থাকবে। বাপ্পাকে স্কুলে দিয়ে আসা বা নিয়ে আসার সময় অ্যালার্ট থাকবে। আনোন কোনও লোককে ফ্ল্যাটের দরজা খুলবে না। বিকেলে পার্কে বেরোলে চ্যাম্পকে তো সঙ্গে নেবেই, তা ছাড়া লোকজনের মাঝে থাকবে..ফাঁকা জায়গায় একা-একা তোমরা ঘুরবে না। আর কোনও প্রবলেম হলেই আমাকে মোবাইলে ফোন করে দেবে।
শমিত অফিসে বেরিয়ে যাওয়ার পর পাপিয়া বাপ্পাকে ডেকে সাবধান করে দিয়েছে। বলেছে, অচেনা কোনও লোকের কাছে যাবি না, কথা বলবি না…আর কিছু দিলেও নিবি না।
চকোলেটের ঘটনাটা বাপ্পার মাথায় আছে। সুতরাং হেসে মাকে আশ্বস্ত করল ও, বলল, ডোন্ট উয়ারি, মা, আমি কেয়ারফুল থাকব।
এরপর পাপিয়া যখনই রাস্তায় বেরিয়েছে তখনই বাজপাখির চোখে চারদিকে নজর রেখেছে। আর বাপ্পাও কম যায় না! সবসময় মাকে আর মিষ্টুকে ভিড়ের মধ্যে দিয়ে চলাফেরার কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। বিকেলে পার্কে বেড়াতে যাওয়ার সময়েও ওরা যথেষ্ট সাবধান ছিল।
রাতে প্রায় পৌনে আটটার সময় শমিত অফিস থেকে ফিরেছে।
পাপিয়া সারাটা দিন ওর বাড়ি ফেরার প্রহর গুনেছে, বারদুয়েক ফোনও করেছে শমিতকে। এখন ও বাড়ি ফিরে জামাকাপড় ছেড়ে হাত-মুখ ধুয়ে বসামাত্রই পাপিয়া ওকে চেপে ধরেছে : অফিসের কনট্যাক্টে পুলিশ অফিসারের সঙ্গে কথাবার্তা কিছু হল?
শমিত বলল, কথা হয়েছে, তবে ফোনে। সেই অফিসার বলেছেন, মিষ্টুর ব্যাপারটা আর অ্যাক্সিডেন্টের ব্যাপারটা সেপারেটলি ট্রিট করতে। ভদ্রলোক আগরওয়ালের খুবই ক্লোজ। উনি বলেছেন, লালবাজারের মিসিং পারসন্স স্কোয়াডে একবার কথা বলবেন। আর একটা ইমপরট্যান্ট অ্যাডভাইস দিয়েছেন : পুলিশ যদি কখনও মিষ্টুর ব্যাপারে কোনও প্রশ্ন করে তাহলে যেন সত্যি কথাই বলা হয়।
