সুলক্ষণা সেন কি বিপ্লবের সময় মারা যাননি? মানেকজি প্রশ্ন করলেন।
না, কারণ তার মৃতদেহ শনাক্ত করা যায়নি। আমি এটা সন্দেহ করেছিলাম। সুলক্ষণা সেন অভিনেত্রী ছিলেন। তিনি তার দাসীর ছদ্মবেশে পালিয়ে বাঁচলেন, আর তার দাসী মারা পড়ে বিপ্লবীদের আগুনে।
এবার একটা কথা বলি–তা হল ঠিকানা লেখা চিরকুটটার কথা। ওটা সমরের পকেট থেকেই পড়েছিল–ওর অজান্তে। আমি ইন্সপেক্টরকে বলেছিলাম কেউ যেন কবুতর ছেড়ে না যায়। তাই বর্মন বেরোতে পারেনি। কিন্তু অরুণ চৌধুরীর পরিচয় ক্রসওয়ার্ড জানতেন। তাই তাকে যেতে দিয়েছিলেন। মিস্টার চৌধুরীও প্রথমে আমাকেই সন্দেহ করেছিলেন।
সুলক্ষণাকে যদি সুচরিতা চিনে ফেলত তবে ওর বিপদ হত, তাই আমি চিঠি দিয়ে ওকে ডেকে পাঠিয়েছিলাম। আমি একটু অভিনয় করাতে ও দারুণ ভয় পেয়ে গিয়েছিল। আমি সুর দিকে তাকিয়ে হাসলাম।
আপনার আসল পরিচয়টা সবাইকে এবার বলুন, ইয়োর মেজেস্টি। অরুণ চৌধুরী বললেন।
তার মানে! আটটি কণ্ঠস্বর একসঙ্গে বলে উঠল।
আমিই শুদ্ধসত্ত্ব রায়ের ছেলে–অতলান্ত রায়। আমিই রটিয়ে দিয়েছিলাম যে, অতলান্ত রায় নেপালে দুর্ঘটনায় মারা গেছেন।
কিন্তু, কুমার, নেকলেসটা কোথায় গেল? মানেকজি প্রশ্ন করলেন।
গোলাপ বাগানের নীচে। সারি-সারি গোলাপের ইঙ্গিতই ছিল ওই সাঙ্কেতিক চিঠিতে। বললেন অরুণ চৌধুরী।
তোমার পরিচয় আমাকে আগে বলোনি কেন? অনুযোগের সুরে বলল সুচরিতা।
তা হলে আমি অ্যারেস্টেড হতাম। কারণ রণজিতের পর আমিই ছিলাম সিরাজনগরের অধিপতি। হেসে জবাব দিলাম আমি।
রিভলভারটা আমার সুটকেশে তা হলে নয়নাই রেখে দিয়েছিল? সর্বেশ্বর রায় জানতে চাইলেন।
ঘাড় কাত করে সম্মতি জানালাম আমি।
চলুন, এবার মিসেস সেনের খোঁজ নেওয়া যাক। ক্রসওয়ার্ড বললেন।
তাই তো! কারওরই খেয়াল ছিল না কথাটা। সবাই মিলে দৌড়ে গেলাম ওপরে।
গিয়ে দেখলাম নিজের ঘরে নিপ্রাণ দেহে পড়ে আছেন নয়না কল্যাণী।
আত্মহত্যা করেছেন। বললেন কিষাণ আপ্তে।
সম্ভবত মরফিনের সাহায্যে। জানালাম আমি।
.
এরপর হীরের নেকলেসটা খুঁজে পাওয়া গেল গোলাপ বাগান খুঁড়ে। আবার শান্ত হল কবুতর। সুচরিতার সঙ্গে আমার বিয়েটা হয়ে যাওয়ার পরদিন কাগজে দেখি একটি বিজ্ঞাপন।
কবুতর বিক্রি হচ্ছে। উৎসুক ক্রেতারা খোঁজ নিন।
–মানেকজি প্রসাদজি লিমিটেড কোং
যার হাতেই তুমি যাও, তোমার কথা আমার চিরদিন মনে থাকবে কবুতর।
সুচরিতার বুক থেকে একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল।
চুনি-হীরা
ঘরটা মাপে বিশাল। এ-প্রান্তে দাঁড়িয়ে ও-প্রান্তের মানুষকে বোধহয় ঝাপসা দেখায়। কারণ, ঘরের দূরতম কোণে প্রকাণ্ড এক সেক্রেটারিয়্যাট টেবিল সামনে রেখে যে-মানুষটি বসে আছেন তাকে আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম না। আমার পাশে দাঁড়ানো লম্বা-চওড়া জোয়ান লোকটা কর্কশ গলায় বলল, এগিয়ে যান। উনিই মিস্টার মিত্র।
আমি চোখ ফিরিয়ে লম্বা-চওড়া সঙ্গীর দিকে তাকালাম। নাক থ্যাবড়া, চৌকো চোয়াল, কুতকুতে চোখ। গায়ের রং মাঝারি, তবে শুধু ওইটুকুই মাঝারি। বাকি সব কিছুই মাঝারির চেয়ে বাড়াবাড়ি রকমের। যেমন হাতের পেশি, তেমনি দৈর্ঘ্য এবং প্রস্থ। হিন্দি ছবির ফর্মুলামাফিক শেষদিকে এর সঙ্গে আমার মোকাবিলা হওয়া উচিত। আর তাই যদি হয়, তা হলে এখন থেকেই বিষ্টু ঘোষের আখড়ায় গিয়ে আমার ব্যায়াম শুরু করা দরকার।
আসুন, আসুন, মিস্টার শিকদার–।
ঘরের দূরপ্রান্তের সেক্রেটারিয়্যাট টেবিলের পিছন থেকে আপ্যায়নবাণী ভেসে এল অনেকটা দৈববাণীর মতোই। মাখনের মতো মোলায়েম স্বর এবং সুর। কিন্তু পরক্ষণেই রুক্ষ আদেশ শোনা গেল, খুদে, তুই নজরকে ডেকে দে। তারপর দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে থাকবি। দেখবি কেউ যেন আমাদের কথাবার্তায় বাগড়া না দেয়। এবারে গলার স্বর ও সুর শজারুর পিঠের মতো মসৃণ।
আমি খুদের দিকে তাকালাম। এই জিনিস যদি খুদে হয় তা হলে দামড়া কী জিনিস তা ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।
আসুন, মিস্টার শিকদার। আবার মাখনে ফিরে গেছেন মিত্র সাহেব। পিছনে টুকিটাকি শব্দ পেয়ে বুঝলাম, খুদে চলে গেছে। ঘরে শুধু আমরা দুজন।
টেবিলের এপাশে মিত্ৰসাহেবের মুখোমুখি বসলাম।
কলকাতার নামি মেটাল মার্চেন্ট শরদিন্দু মিত্র। কলকাতার ওপরতলার মানুষরা ওঁকে উঁদে ব্যবসায়ী বলে চেনেন। আর নীচুতলার মানুষরা চেনে তাদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে। সেই কারণেই খুদেকে চিনে নিতে আমার কোনও অসুবিধে হয়নি। ওর শিক্ষাগত যোগ্যতার মধ্যে যে অন্তত গোটাদুয়েক খুন রয়েছে তা রীতিমতো হলফ করে বলা যায়।
সেক্রেটারিয়্যাট টেবিলটা ভারি অদ্ভুত। কুচকুচে কালো কাঠের ওপরে চকচকে পালিশ। এবং তার মাঝে অনেকটা জায়গা জুড়ে বিমূর্ত আকারের একটা স্টেইনলেস স্টিলের পাত বসানো। হঠাৎ দেখলে আয়না বলে ভুল হতে পারে। তারই ওপরে নানান সরঞ্জাম–একজন নামজাদা ব্যবসায়ীর টেবিলে যা যা থাকে। তবে একটা তফাত রয়েছে। প্রায় প্রতিটি বস্তুর সঙ্গেই কোনও না কোনও ধাতু জড়িত। যেমন প্রতিটি কলমে সোনালি পাতের পটি। অ্যাশট্রে কারুকাজ করা তামার তৈরি। কলমদানিটি ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য। পিনকুশন অ্যালুমিনিয়াম আধারে বসানো। ডেট ক্যালেন্ডারও একই ধাতুর তৈরি। এইরকম সবকিছু।
