করেছি।
বহত আচ্ছা কিয়া। বদমাস গাড়ির পাইলটকে এবার ভারী কমপেনশন দিতে হবে।
শমিতের এতই ক্লান্ত লাগছিল যে, ও ভজনচাঁদের কমপেনশন-কে আর শুধরে কমপেনসেশান করল না। গাড়ি গ্যারেজ করে ভজনচাঁদকে দশটাকা বকশিশ দিল।
ভজনচাঁদ ভক্তিভরে সেলাম ঠুকতেই শমিত রওনা হল সিঁড়ির দিকে।
শমিত অথবা ফ্ল্যাটের অন্যান্য মালিক ভজনচাঁদকে সময়ে-অসময়ে বকশিশ দেয়, বিনিময়ে সেলামও পায়। কিন্তু আজ শমিতের নিজেকে কেমন অপরাধী লাগছিল।
রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর মিষ্টু আর বাপ্পা যে-যার ঘরে ঘুমিয়ে পড়ল। কিন্তু শমিত আর পাপিয়ার ঘুম আসছিল না কিছুতেই।
শমিত একটা সিগারেট ধরিয়ে চেয়ারে গা ঢেলে দিল। ঘরের সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে বলল, এবার ব্যাপারটা পুলিশে জানানো দরকার…।
পাপিয়া গম্ভীর থমথমে মুখে একটা ডিভানের ওপরে বসে ছিল, শমিতের কথার উত্তরে বলল, পুলিশে গিয়ে তুমি কী বলবে?
প্রথম থেকে যা-যা হয়েছে তা-ই বলব– বাচ্চা ছেলের মতো বলল শমিত।
বলবে যে, একটু আগে তুমি কয়েকটা লোককে খুন করেছ? ধারালো গলায় জিগ্যেস করল পাপিয়া।
তার মানে?
তার মানে, ওই অ্যাম্বাসাডরের ভেতরে যারা ছিল তারা কেউ আর বেঁচে আছে মনে করেছ! সব শুনলে পুলিশ তো তোমাকেই আগে অ্যারেস্ট করবে।
এখন তো আর না বলে উপায় নেই। ক্লান্ত গলায় শমিত বলল, কাল-পরশুর মধ্যে পুলিশ আমাদের বাড়িতে আসবেই। এত বড় একটা অ্যাক্সিডেন্ট…পুলিশ খোঁজ করবেই। খোঁজ করতে করতে যদি ওরা…। কথা শেষ না করেই থেমে গেল শমিত।
যদি ওরা কী? জিগ্যেস করল পাপিয়া।
শমিত সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে সেটাই বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু ঠিক তখনই টেলিফোন বেজে উঠল।
পাপিয়া আর শমিত এ-ওর দিকে তাকাল।
তারপর শমিতই উঠে গিয়ে ফোন ধরল।
হ্যালো…।
শমিত রায়চৌধুরী বলছেন?
মিহি গলাটা ভালো করেই চিনতে পারল শমিত। ওর হাত-পা হঠাৎই ঠান্ডা হয়ে যেতে শুরু করল। ও কোনওরকমে বলল, হ্যাঁ বলছি।
অ্যাম্বাসাডর গাড়িটার দুজন লোক ছিল–বিনোদ আর সুধীর। সুধীর ড্রাইভ করছিল– ও মারা গেছে। একটু থামল নোকটা। তারপরঃ আর বিনোদ নার্সিংহোমে–মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা কষছে।
শমিত তাড়াতাড়ি বলে উঠল, আমার কোনও দোষ নেই ওরা আমার গাড়িতে আগে ধাক্কা মেরেছে–একবার নয়, তিন-তিনবার। আমি ভয় পেয়ে গাড়ি ছুটিয়ে দিয়েছি…আমাকে ফলো করতে গিয়ে অ্যাম্বাসাডরটা পেট্রল পাম্পে ঢুকে মেশিনে ধাক্কা মারে…তাতে…।
আমি খোঁজ নিয়েছি..সবই আমি জানি..কিন্তু সবকিছুর গোড়ায় তো ওই মেয়েটা মিষ্টু। ওকে আপনি মেরে ফেলুন…তা হলেই সব ঝামেলা মিটে যাবে। আর আমরা যদি ট্রাই করি তাহলে বহত খুন-খারাবা হতে পারে।
ওইটুকু একটা ফুলের মতো মেয়েকে আপনি মারতে চাইছেন কেন? অনুনয়ের সুরে জিগ্যেস করল শমিত, ওকে আপনারা ছেড়ে দিন…।
উত্তরে নোংরাভাবে হাসল লোকটা। তারপর বলল, যদি আপনারা মিষ্টুকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেন তাহলে সেটা খুব কস্টলি হবে। অনেক দুঃখ অনেক পরেশানি হবে আপনাদের…।
আমরা ওকে…ওকে…ওকে…।
তোতলামি ছাড়ুন! লোকটা ধমক দিয়ে বলল, কালকের মধ্যে কাজটা সেরে ফেলুন…নইলে আপনাদের যে কী হাল হবে, রাম জানে। রাম রাম। বলে ফোন ছেড়ে দিল লোকটা।
পাপিয়া সব শোনার পর ভয় পেয়ে বলল, এখন কী হবে?
শমিত সিগারেটের শেষটুকু একটা অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিয়ে চোয়াল শক্ত করে বলল, আমি ডিসিশান নিয়ে ফেলেছি–পুলিশে আমাদের খবর দিতেই হবে। আর কোনও পথ নেই।
কেন, পথ নেই কেন?
শমিত থেমে থেমে বলল, আমার গাড়ির পিছনের নাম্বার প্লেটটা দেখতে পাচ্ছি না। বোধহয় অ্যাম্বাসাডরের ধাক্কায় ওটা রাস্তাতেই খুলে পড়ে গেছে। অ্যাক্সিডেন্টটা নিয়ে খোঁজ করতে করতে যদি পুলিশ আমাদের গাড়ির নাম্বার প্লেটটা খুঁজে পায় তা হলে ওরা দু-চারদিনের মধ্যেই এই ফ্ল্যাটে এসে হাজির হবে। কথা বলতে বলতে হতাশায় মুখে হাত চাপা দিল শমিত। বড়-বড় শ্বাস টেনে বলল, এই টেনশন আমি আর সহ্য করতে পারছি না।
আমিও আর পারছি না। পাপিয়া ভয় পাওয়া গলায় বলল, কিন্তু মিষ্টুর কোনও ক্ষতি করতে পারব না। ওকে যে আমি ভালোবেসে ফেলেছি! কেঁদে ফেলল পাপিয়া : ওকে ছেড়ে আমি থাকতে পারব না। তুমি দ্যাখো, ওর গায়ে যেন কোনও আঁচ না লাগে। তুমি যা ভালো বোঝো করো–আমি আর পারছি না, আর পারছি না।
শমিত পাপিয়ার কাছে এসে ওর হাত ধরল, মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে বলল, কেঁদো না। আমাকে একটু ভাবতে দাও…।
.
০৪.
শুক্রবার সাতসকালে খবরের কাগজ হাতে নিয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিল শমিত। ও মার্কেটিং ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিতে কাজ করে। তাই সেই ধরনের খবরগুলোয় খুঁটিয়ে চোখ বোলাচ্ছিল।
পাপিয়া চ্যাম্পকে বিস্কুট খাওয়াচ্ছিল। আর রাস্তার দিকের ছোট্ট ঝুলবারান্দায় দাঁড়িয়ে মিষ্টু গান শোনাচ্ছিল বাপ্পাকে।
পাপিয়ার কান পড়ে ছিল মিষ্টুর গানের দিকে। ও শমিতকে বলল, শুনছ, তোমার মেয়ে গাইছে…।
শমিত কাগজ থেকে চোখ সরিয়ে দেখল পাপিয়ার দিকে। অবাক হয়ে বলল, মেয়ে!
পাপিয়া হেসে ইশারা করে মিষ্টুকে দেখাল।
ভোরের আলোয় মেয়েটাকে দেখে শমিত কেমন যেন হয়ে গেল। মুগ্ধ হয়ে শুনতে লাগল মেয়ে-র গান।
শুন লো শুন লো বালিকা,
রাখ কুসুমমালিকা,
কুঞ্জ কুঞ্জ ফেরনু সখি,
শ্যামচন্দ্র নাহি রে।
দুলই কুসুমমুঞ্জরি, ভমর ফিরই গুঞ্জরি,
অলস যমুন বহয়ি যায়…
