অফিস থেকে ফিরে পাপিয়ার কাছে সবই শুনেছে শমিত। শুনে পাপিয়ার কথাটাই মনে হয়েছে ওর : যারা ফোন করে মিষ্টুকে খুন করতে বলেছিল, তারা হাত গুটিয়ে বসে নেই! বাপ্পা কয়েকবার পুলিশে খবর দেওয়ার কথা বলেছিল, কিন্তু পাপিয়া আর শমিত ওর পরামর্শে কান দেয়নি। কারণ, পুলিশে গেলেই আরও পাঁচকথা উঠবে। ওদের নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া শুরু হবে। তার চেয়ে মিষ্টুকে আগলে-আগলে রাখাই ভালো। শমিত তখন বলেছিল, আজ সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানোর পর মিষ্টুকে আর বাড়ির বাইরে বের করার দরকার নেই। যদি কোনওরকমে ওর পুরোনো সবকথা মনে পড়ে যায় তা হলে তখন নতুন করে ভাবা যাবে।
কিন্তু এই বিপদটা শমিত আশা করেনি। ও বুঝতে পারল, ওর হিসেবে ভুল ছিল।
মারুতি গাড়িটা শমিতের খুব প্রিয়। নিজের হাতে গাড়ির যত্ন নেয় ও। সব-সময় ঝাড়পোঁছ করে গাড়ি টিপটপ রাখে। এ-নিয়ে পাপিয়া প্রায়ই ওকে ঠাট্টা করে, কিন্তু শমিত সে-ঠাট্টা গায়ে মাখে না।
শমিত বুঝল, মারুতির পিছনদিকটা ভালোই তুবড়ে গেছে। তাতে প্রথমটায় ওর মনখারাপ হল, কিন্তু তারপরই রাগ হল।
আর ঠিক তখনই অ্যাম্বাসাডরটা খ্যাপা বুনো শুয়োরের গোঁ নিয়ে তেড়ে এল, প্রচণ্ড শব্দে ভয়ঙ্কর এক ধাক্কা মারল আবার। মারুতির পিছনের কাচ ঝনঝন করে ভেঙে পড়ল।
পাপিয়া মিষ্টুকে জাপটে ধরে চিৎকার করে উঠল। মিষ্টুও ভয়ে আঁকড়ে ধরল ওকে। আচমকা ধাক্কায় বাপ্পার মাথার পিছনটা ঠুকে গেল হাইব্যাক সিটে। ও চেঁচিয়ে বলল, বাবা, কেয়ারফুল!
বৃষ্টির তেজ এখন অনেকটা বেড়ে গেছে। রাস্তায় ঠিকরে পড়ে লাফিয়ে উঠছে জলের কণা। ওয়াইপার প্রাণপণে কাজ চালাচ্ছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও সামনে ভালো করে নজর চলে না। রিয়ারভিউ মিরারে শমিত অ্যাম্বাসাডরটার হেডলাইটের আলো দেখতে পাচ্ছিল। বৃষ্টির ফোঁটার আড়ালে গাড়িটাকে গোঁ-গোঁ করে ছুটে আসা একটা অপার্থিব জন্তু বলে মনে হচ্ছিল।
শমিতের রাগটা পালটে গেল অন্ধ রাগে।
ওরা তো কারও কোনও ক্ষতি করেনি। বরং স্মৃতি-হারানো একটা মেয়েকে আপন করে নিয়েছে। কোনও অন্যায় না করেই এরকম নিগ্রহ সইতে হচ্ছে ওদের! বিচার বলে সত্যি কি কিছু নেই?
অ্যাকসিলারেটরে চাপ দিয়ে ওটা মেঝেতে মিশিয়ে দিল শমিত। ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটিয়ে দিল মারুতি। আয়নায় দেখল অ্যাম্বাসাডরটাও গতি বাড়িয়ে দিয়েছে।
সিঙ্গল লেন রাস্তায় সাপের মতো এঁকেবেঁকে ছুটতে লাগল শমিতের গাড়ি। অ্যাম্বাসাডরটাও প্রায় ছায়ার মতো আঁকাবাঁকা পথ ধরেই মারুতিটার পিছন পিছন ছুটে চলল।
হঠাৎ একটা পেট্রল পাম্প দেখতে পেল শমিত। তক্ষুনি ওর মাথায় খুন চেপে গেল।
পনেরো বছর বয়েস থেকেই ও গাড়ি চালায়। সেটা ছিল ওর বাবার অ্যাম্বাসাডর। তারপর যতই দিন গেছে ততই ধারালো আর নিখুঁত হয়েছে ওর গাড়ি চালানোর হাত। ওর হাতে পড়লে গাড়ি কথা বলে। এখন গাড়িকে দিয়ে কথা বলাতে ইচ্ছে করল ওর।
আচমকা মারুতিটাকে পেট্রল পাম্পে ঢুকিয়ে দিল শমিত। স্টিয়ারিং কাটিয়ে তেল নেবার মেশিন দুটোকে দুরন্ত গতিতে একটা পাক মেরে দিল।
পাম্পে গোটা চার-পাঁচেক গাড়ি গ্যারেজ করা ছিল। দুজন কর্মী কাচের প্যানেল দেওয়া অফিসঘরের মধ্যে বসে ছিল। কাচের ওপর দিয়ে বৃষ্টির জল গড়িয়ে পড়ে একটা অদ্ভুত লেন্স তৈরি করেছিল। ফলে লোক দুটোকে ঝাপসা বিকৃত দেখাচ্ছিল।
মারুতিটাকে মারাত্মক স্পিডে ঢুকতে দেখেই অফিসঘর থেকে একজন লোক ছুটে বেরিয়ে এল বাইরে। হাত দিয়ে বৃষ্টি আড়াল করে ব্যাপারটা বুঝতে চাইল। কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে।
শমিতের মারুতি একটা পাক মেরেই সাপের মতো পিছলে বেরিয়ে গেছে সামনের রাস্তায়। সেই গতিপথ অ্যাম্বাসাডরের ড্রাইভার হুবহু আঁচ করতে পারেনি। ফলে ঝড়ের বেগে পাম্পের ভেতরে ছুটে এসে স্টিয়ারিং কাটাতে গিয়েই বেচারি ধাক্কা মেরেছে তেল নেবার মেশিন দুটোকে। তারপর গাড়িটা মুখ উঁচিয়ে শূন্যে লাফিয়ে ছিটকে গেছে অফিসঘর লক্ষ্য করে। তবে কাচ ভাঙার শব্দের পর বাকি শব্দ আর শোনা যায়নি।
কারণ, প্রবল এক বিস্ফোরণ গোটা এলাকা কাঁপিয়ে দিল। হলদে-লাল আগুনের বিশাল একটা বল লাফিয়ে উঠল শূন্যে। পেট্রল পাম্পটা নিমেষে নেই হয়ে গেল।
শমিতের গাড়ি তখন অনেক দূরে চলে গেছে।
রিয়ারভিউ মিরারে আগুনের ছায়াটা দেখতে পেল শমিত। ওর সারা শরীর থরথর করে কাঁপছিল। কপালের পাশে একটা শিরা দপদপ করছিল।
পাপিয়া মিষ্টুকে আঁকড়ে ধরে রীতিমতো কাঁদছিল। কান্না-ভাঙা গলায় বারবার বলতে লাগল, আস্তে চালাও, আস্তে চালাও…।
শমিত চোয়াল শক্ত করে চুপ করে রইল। ভাগ্যিস, আশেপাশে কোনও পুলিশ ছিল না। যদি থাকত তা হলে…।
বাপ্পা জানলার কাচ নামিয়ে বৃষ্টির মধ্যেই গলা বাড়িয়ে আগুনের তাণ্ডবলীলা দেখতে চেষ্টা করছিল। কিন্তু শমিত এত জোরে গাড়ি চালাচ্ছিল যে, ছবিটা খুব তাড়াতাড়ি ছোট হয়ে যাচ্ছিল।
বাড়ি ফিরে গাড়ি গ্যারেজ করার সময় গাড়িটার শোচনীয় অবস্থা দেখতে পেল ভজনচাঁদ।
কেমন করে অ্যাক্সিডেন্ট হল, স্যার? কৌতূহলী ভজনচাঁদ জানতে চাইল।
শমিত বিড়বিড় করে একটা দায়সারা উত্তর দিল।
বাপ্পা আর মিষ্টুকে নিয়ে পাপিয়া ওপরে রওনা হতেই ভজনচাঁদ শমিতকে বলল, পুলিশে রিপোর্ট করেছেন, স্যার?
