শরীর ভালো রাখবেন অবশ্যই,
কিন্তু মনের কথাটা ভুলে যাবেন না।
মন ভালো রাখা খুব জরুরি।
ছিমছামভাবে সাজানো ঘরে চারটে ছোট-ছোট চেয়ার আর একটা কাউচ। কাউচে কোনও রুগি আধশোওয়া হয়ে শুতে পারে। কে জানে, একটু পরেই মিষ্টুকে হয়তো ওখানে শুতে হবে। তারপর ডক্টর দাশগুপ্তের প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।
ডক্টর দাশগুপ্ত বললেন যে, প্রথমে তিনি শমিত আর পাপিয়ার সঙ্গে আলাদা কথা বলবেন। তখন পাপিয়া বাপ্পা আর মিষ্টুকে বাইরের ঘরে পেশেন্টদের মাঝে বসিয়ে দিয়ে গেল। বাপ্পাকে চাপা গলায় বলল, কারও সঙ্গে কথা বলবি না…কেউ কিছু দিলে খাবি না। আর কোনওরকম প্রবলেম দেখলেই চেঁচাবি–চেঁচিয়ে আমাদের ডাকবি। আমাদের বড়জোর পাঁচ-দশ মিনিট লাগবে।
সত্যি-সত্যি দশ মিনিটের কমেই ব্যাপারটা মিটে গেল।
ওদের কাছ থেকে সব শুনলেন ডক্টর দাশগুপ্ত। পাপিয়া ওঁকে মিষ্টুর গল্পটা একটু ঘুরিয়ে বলেছে। বলেছে, মিষ্টু ওরই মেয়ে…আচমকা এরকম হয়ে গেছে। তাই ও মনোবিদের শরণাপন্ন হয়েছে।
এরপর মিষ্টুর সঙ্গে চিত্রলেখা দাশগুপ্ত কথা বললেন।
যেসব প্রশ্ন তিনি করলেন, তার সবগুলোই গত দু-দিনে পাপিয়া আর শমিত করে ফেলেছে।
প্রায় আধঘণ্টা মিষ্টুকে স্টাডি করার পর ডক্টর দাশগুপ্ত বললেন, দেখুন, আপনাদের মেয়ের কেসটা পিয়োরলি অ্যামনেশিয়ার কেস। তবে ওর টাইপটা হচ্ছে সাইকোজিনিক অ্যামনেজিয়া। যেহেতু ও মাথায় কোনও চোট পায়নি বলছেন সেহেতু বলতে পারেন ব্যাপারটা ততটা মারাত্মক নয়। সেরকম হলে ওর মগজ স্মৃতি ধরে রাখতে পারত না। কিংবা কোনও ঘটনা স্মৃতি হিসেবে ওর স্মৃতিকোষে ঢুকতেই পারত না। মানে, ওর ব্রেইনে রিটেনশন ফেইলিয়োর হত…কিংবা কোনও ইনফরমেশন ওর ব্রেইনে রেজিস্টারই করত না। যে-স্মৃতি ওর হারিয়ে গেছে সেটা চিরকালের জন্যে হারিয়ে যেত।
একটু দম নিয়ে বড় করে শ্বাস ফেললেন চিত্রলেখা দাশগুপ্ত। টেবিল থেকে একটা বলপয়েন্ট পেন তুলে নিয়ে খসখস করে প্রেসক্রিপশন লিখতে লিখতে বললেন, সাইকোজিনিক অ্যামনেশিয়ায় খুব ভয়ের কিছু নেই। ওর মেমোরি সব ঠিকঠাক আছে–মানে পুরোনো কোনও স্মৃতি ওর হারায়নি– শুধু ওর রিকল মেকানিজমটা ফেইল করছে। আরও এক্সপ্লেইন করে বলতে গেলে, দরকার মতো পুরোনো কথা ওর মনে পড়ছে না। অথচ ওর সাবকনশাস লেভেলে…মানে, অবচেতন স্তরে…সব স্মৃতিই পারফেক্ট রয়েছে। একমাস পর ওকে নিয়ে আসুন…একটু হিপনোটাইজ করে দেখব পুরোনো কথা কিছু বের করা যায় কিনা। এখন শুধু একটা স্টিমুল্যান্ট লিখে দিলাম…একটা ফাইল খাওয়ান…।
শমিত অনেকক্ষণ ধরেই উশখুশ করছিল, একটু ফাঁক পেতেই জিগ্যেস করে বসল, আচ্ছা, ডক্টর দাশগুপ্ত, মিষ্টুর এরকম হল কী করে?
চোখ থেকে চশমাটা খুলে টেবিলে নামিয়ে রাখলেন ডক্টর দাশগুপ্ত। চেয়ারে আয়েশ করে হেলান দিয়ে ধীরে ধীরে বললেন, ও বোধহয় সাংঘাতিক একটা শক পেয়েছে–মেন্টাল শক–যেটাকে ট্রমা বলে। হতে পারে, আবার সেরকম একটা শক পেলে সাডেনলি ওর স্মৃতি ফিরে আসবে। তবে সেটা পিয়োরলি চান্সের ব্যাপার। টেবিলের দিকে ঝুঁকে এলেন ডক্টর দাশগুপ্ত। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ওয়েল, লেট আস হোপ ফর দ্য বেস্ট।
শমিতরা যখন বাইরে বেরিয়ে এল তখন ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে। ফুটপাথের দোকানগুলো তল্পিতল্পা গুটিয়ে চলে গেছে। দুটো দিশি কুকুর জিভ বের করে বৃষ্টিতে বসে ভিজছে।
পাপিয়া ছাতা খুলল, তার নীচে মিষ্টুকে ডেকে নিল। শমিত আর ছাতা খুলল না। ও আর বাপ্পা একছুটে পৌঁছে গেল গাড়ির কাছে।
বাপ্পা শমিতের পাশে বসল। আর পিছনের সিটে মিষ্টুকে নিয়ে পাপিয়া। গাড়ি স্টার্ট দিল শমিত। ওয়াইপার চালু করে হেডলাইট জ্বেলে দিল। গাড়ি ছুটল সি.আই.টি. রোড ধরে।
জলে ভেজা রাস্তায় গাড়িঘোড়া কম। বাস, মিনিবাসের কাচ তোলা–যাচ্ছেও বেশ ধীরে ধীরে। বাসস্টপের শেড আর গাড়িবারান্দার নীচে পথচারীর জটলা। ল্যাম্পপোস্টের সোডিয়াম-বাতির অস্পষ্ট ছায়া পড়েছে ভেজা রাস্তায়।
তিন-সাড়ে তিন কিলোমিটার পেরোনোর পরই ব্যাপারটা ঘটে গেল।
মিষ্টু তখন শমিতকে জিগ্যেস করেছে, আঙ্কল, আমার কী হয়েছে? আমি কি পুরোনো কথা সব ভুলে গেছি? হিপনোটাইজ মানে কী?
বাপ্পা তাড়াতাড়ি বলে উঠল, হিপনোটাইজ মানে সম্মোহন। অনেকটা ঘুম পাড়িয়ে দেওয়ার মতন…।
পাপিয়া মন্তব্য করল, হিপনোটাইজ করলে লোকে ঘুমিয়ে কথা বলে। ডাক্তারের সব প্রশ্নের উত্তর দেয়। যেমন ধর…।
পাপিয়ার কথা শেষ হওয়ার আগেই একটা সাদা অ্যাম্বাসাডর কোথা থেকে ছুটে এসে শমিতের মারুতির পিছনে ধাক্কা মারল।
সংঘর্ষের শব্দ হল। ব্যাকলাইটের কভার ভেঙে মারুতির পিছনটা তুবড়ে গেল। শমিতের গাড়িটা ধাক্কার চোটে আচমকা এগিয়ে গেল সামনে।
মিষ্টু আর বাপ্পা চিৎকার করে উঠল। পাপিয়া ভয়ের চোখে মারুতির পিছনের কাচ দিয়ে অ্যাম্বাসাডরটাকে দেখল। শমিত রিয়ারভিউ মিরারে একপলক তাকিয়েই গাড়ি থামিয়ে নামতে যাচ্ছিল। ভেবেছিল, অ্যাম্বাসাডরের ড্রাইভারকে দেখে নেবে। কিন্তু ঠিক তখনই গাড়িটা ছুটে এসে শমিতের মারুতিকে আবার ধাক্কা মারল। সঙ্গে-সঙ্গে অ্যাকসিলারেটরে পায়ের চাপ বাড়িয়ে দিল শমিত। কারণ, বুঝতে পারল, এটা মোটেই অ্যাক্সিডেন্ট নয়। অ্যাম্বাসাডরটা ইচ্ছে করেই ধাক্কা মেরেছে ওর গাড়ির পিছনে। বিশেষ করে বিকেলে পার্কের বিষাক্ত চকোলেটের ঘটনাটার পর এটাই ধরে নেওয়া স্বাভাবিক।
