আসল ঘটনাটা ঘটল তার পরেই।
মিনিটখানেকের মধ্যেই কুকুরটা হঠাৎ কাত হয়ে পড়ে গেল মাটিতে। পা দাপিয়ে লেজ নেড়ে সরু গলায় ককিয়ে উঠল দুবার। তারপরই সব চুপচাপ।
কুকুরটার চোয়াল ঝুলে পড়ল। জিভ বেরিয়ে এল বাইরে। তার সঙ্গে খানিকটা সাদা ফেনা। ছিন্নভিন্ন রাংতার মোড়কটা ওর মুখ থেকে গড়িয়ে পড়ে গেল ঘাসের ওপরে।
ভয়ে পাপিয়ার মুখ দিয়ে একটা চাপা চিৎকার বেরিয়ে এল। বাপ্পা আর মিষ্টু অবাক হয়ে মরা কুকুরটাকে দেখতে লাগল। ছোট-বড় তিনটে নেড়িকুকুর কান্নার কুঁইকুঁই শব্দ তুলে মৃতদেহটা শুঁকতে লাগল বারবার। আর চ্যাম্প চাপা গর্জন করতে লাগল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই মরা কুকুরটাকে ঘিরে ছোটখাটো জটলা তৈরি হয়ে গেল। পাপিয়া আর দেরি না করে বাপ্পা আর মিষ্টুর হাত চেপে ধরে হাঁটা দিল বাড়ির দিকে। চ্যাম্পও ওদের সঙ্গে পা মিলিয়ে রওনা হল।
পাপিয়া টের পেল ওর শরীরটা থরথর করে কাঁপছে।
মায়ের সঙ্গে যেতে-যেতে বাপ্পা এদিক-ওদিক তাকিয়ে সেই রোগা মতন লোকটাকে খুঁজতে লাগল, কিন্তু কোথাও তাকে দেখতে পেল না।
মিষ্টু পাপিয়াকে বারবার জিগ্যেস করতে লাগল, আন্টি, কুকুরটা হঠাৎ মরে গেল কেন? চকোলেট খেয়ে কি ওর অসুখ করেছে?
পাপিয়া অবোধ মেয়েটার দিকে তাকাল। ওর কান্না পেয়ে গেল। আর-একটু হলে কী হত, সেকথা ভেবে ও শিউরে উঠল। যারা টেলিফোন করেছিল, তারা তা হলে হাত গুটিয়ে বসে নেই! তারা পাপিয়াদের ওপরে নজর রাখছে, সুযোগ পেলে মিষ্টুকে খতম করার চেষ্টাও করছে! কিন্তু কেন?
আন্টি, বলো না, চকোলেট খেয়ে কুকুরটার কি অসুখ করেছিল?
মিষ্টুর প্রশ্নে বিব্রত হল পাপিয়া। কী জবাব দেবে বুঝে উঠতে পারছিল না।
বাপ্পা তাড়াতাড়ি বলে উঠল, হ্যাঁ, অসুখ করেছিল।
যদি চ্যাম্প ওটা খেত তা হলে কী সাংঘাতিক কাণ্ড হত বলো, বাপ্পাদাদা!
পাপিয়া আর থাকতে পারল না। মিষ্টুকে একহাতে জাপটে ধরে কেঁদে ফেলল ও। কান্না ভাঙা গলায় বলল, তুই ওটা খেলে কী সর্বনাশটা হতো সেটা একবার ভেবে দেখেছিস! এখনও বুঝিসনি চকোলেটটায় বিষ ছিল!
মিষ্টু অবাক চোখে পাপিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। পাপিয়া হাতের পিঠ দিয়ে চোখ মুছল।
বাপ্পা জিগ্যেস করল, পুলিশে খবর দেবে, মা?
পাপিয়া মাথা নাড়ল? না, এখন না। আগে তোর বাবা অফিস থেকে ফিরুক, তারপর আলোচনা করে ঠিক করা যাবে।
মিষ্টু, বাপ্পা আর চ্যাম্পকে নিয়ে খুব সাবধানে রাস্তা পার হল পাপিয়া। সন্ধের আবছা অন্ধকার নেমে এসেছে। গাড়ি, বাস, মিনিবাস হেডলাইট জ্বেলে ছুটে যাচ্ছে। চারপাশের ব্যস্ততা আর হর্নের শব্দ পাপিয়াকে যেন পাগল করে দিচ্ছিল। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ও ফ্ল্যাটের নিরাপদ ঘেরাটোপে পৌঁছোতে চাইছিল।
ফ্ল্যাটে ফিরে হাঁফ ছাড়ল পাপিয়া। শমিত কখন বাড়ি ফিরবে এই চিন্তায় বারবার দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকাতে লাগল। আজ আবার মিন্ধুকে নিয়ে সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে যাওয়ার কথা। পার্কের ঘটনাটা শোনার পর শমিত কী বলবে কে জানে!
.
ডক্টর চিত্রলেখা দাশগুপ্তের চেম্বারে ঢুকতেই ফিনাইল কিংবা স্পিরিটের মতো একটা গন্ধ পাপিয়ার নাকে এল। অথচ ও ভালো করেই জানে, মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের চেম্বারে এরকম ওষুধপত্রের গন্ধ পাওয়ার কথা নয়। হয়তো এটা মনেরই কোনও কারসাজি।
ডক্টর দাশগুপ্তের চেম্বারটা খুঁজে পেতে তেমন কষ্ট হয়নি। পার্ক সার্কাসের গোলচক্করের একপাশে বেশ বড় একটা মিষ্টির দোকান। তার ঠিক পাশেই একটা পুরোনো বাড়ির দোতলায় ডক্টর দাশগুপ্ত বসেন সন্ধে সাতটা থেকে দশটা।
ফুটপাথে ঘেঁষাঘেষি করে বসা ফলের দোকানদারদের পাশ কাটিয়ে বাড়িটার ছোট্ট সদর দরজা দিয়ে ঢুকে পড়ল ওরা। দোতলায় ওঠার সিঁড়ি এবড়োখেবড়ো, ভাঙাচোরা। দেওয়ালে ড্যাম্পের কালচে ছোপ। সিঁড়ির আলো বলতে একটা বালব।
ওপরে ওঠার সময় বেশ কয়েকজন ওদের পাশ দিয়ে নীচে নেমে গেল।
চেম্বারে যদি পেশেন্টের খুব ভিড় থাকে তা হলে বাড়ি ফিরতে রাত হয়ে যাবে। এত লোককে নামতে দেখে পাপিয়াকে বিড়বিড় করে বলল শমিত।
উত্তরে পাপিয়া শুধু মাথা নাড়ল।
বাড়ির বাইরের চেহারার তুলনায় চেম্বারটা দারুণ ঝকঝকে। চেম্বার দেখলেই ডাক্তারের ওপরে ভক্তি বেড়ে যায়। শমিত আর পাপিয়া কেমন যেন স্বস্তি পেল। বাপ্পা আর মিষ্টুর দিকে তাকিয়ে দেখল ওরা ওদের খোশগল্পে মশগুল।
পেশেন্টের ভিড় বেশ ভালোই ছিল, কিন্তু আগে থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করা ছিল বলে আধঘণ্টা মতন অপেক্ষা করার পরই ডাক পেল শমিত।
কাচের সুইংডোর ঠেলে ডক্টর দাশগুপ্তের ঘরে ঢুকল ওরা।
ভদ্রমহিলা রিভলভিং চেয়ারে বসে আছেন। গায়ে হালকা সবুজ জমিতে বাদামি পাড়-বসানো তাঁতের শাড়ি। চোখে রিমলেস চশমা। ফরসা লম্বাটে মুখ। বয়েস বোধহয় পঁয়তাল্লিশ পেরিয়েছে, কিন্তু মুখের মেকআপ তাকে প্রাণপণে পিছনদিকে টানছে। চোখের চাউনি আর চোয়ালের রেখা বলছে, ডক্টর দাশগুপ্তের অভিজ্ঞতা কিছু কম নেই।
ওঁর চেয়ার থেকে একটু দূরে ছোটমাপের চেয়ার-টেবিল নিয়ে একজন সেক্রেটারিগোছের মেয়ে বসে আছে। বয়েস কুড়ি কি বাইশ। ছিপছিপে, ফরসা, চোখে মেটাল ফ্রেমের চশমা। একটা নোটবই আর পেন নিয়ে লেখালিখির জন্য তৈরি।
ডক্টর দাশগুপ্তের রিভলভিং চেয়ারটার পিছনে ঘষা কাচের প্যানেল। তার ওপরে নানান সুন্দর সুন্দর পোস্টার লাগানো। তার ঠিক মাঝখানে একটা পোস্টারে বড়-বড় হরফে লেখা রয়েছে?
