পার্কের মেন গেট দিয়ে ঢুকে দোলনার দিকটায় চলে আসে বাপ্পা। এদিকটায় ঘাস-ছাওয়া জমি আছে অনেকটাই। তার প্রান্ত ঘেঁষে তিনটে সিমেন্টের বেঞ্চি। বাচ্চারা যখন ছুটোছুটি করে খেলা করে তখন তাদের গার্জেনরা এই বেঞ্চিগুলোতেই বসে থাকেন।
পার্কের বাকি অংশটায় শুধু ধুলো আর কাকড় ঘাসের ছিটেফোঁটাও থাকে না। এখন বর্ষায় ছবিটা সামান্য বদলেছে। বড়দের ফুটবল, ক্রিকেট ইত্যাদি সেখানেই চলে। বড় মাঠের দু-প্রান্তে লোহার পাইপ দিয়ে দুটো গোলপোস্ট তৈরি করা আছে।
আজ চ্যাম্পকে নিয়ে বেরোনোর সময় মিষ্টুকেও সঙ্গে নিতে চাইল বাপ্পা। কিন্তু পাপিয়া যে বারণ করতে পারে সেটা ও স্বপ্নেও ভাবেনি।
আসলে পাপিয়া কাল রাতের টেলিফোনের কথাগুলো ভুলতে পারছিল না। শমিতের মুখ থেকে কথাগুলো শোনার সময় পাপিয়া ভয়ে শিউরে উঠেছে। এত নৃশংস হতে পারে কেউ! মিষ্টুর মতো ফুটফুটে মেয়েটাকে মেরে ফেলতে চায়! তাও আবার ওদের দিয়েই!
মিষ্টুকে ভালো করে দেখল পাপিয়া।
পরনে গোলাপি-সাদা চুড়িদার, মাথার লম্বা চুলে দুটো বিনুনি–তাতে রঙিন ব্যান্ড আঁটা। কপালে কালো টিপ। গলায় পাউডারের আবছা ছাপ।
এ-মেয়েকে দেখলেই গাল টিপে আদর করতে ইচ্ছে করে।
পাপিয়া ফোনের কথাগুলো বাপ্পাকে বলতে পারছিল না। ও ভয় পাচ্ছিল, মিষ্টু রাস্তায় বেরোলেই যদি কোনও বিপদ হয়! কী অনেক কথা জানে মিষ্টু, যার জন্য ওকে খুন করতে বলছে।
কিন্তু বাপ্পা কিছুতেই ওর জেদ ছাড়বে না। ও বারবার জিগ্যেস করছে, কেন তুমি বারণ করছ তোমাকে বলতেই হবে। নইলে বাবা অফিস থেকে ফিরলে আমি তোমার নামে কমপ্লেন। করব।
বাপ্পার সঙ্গে-সঙ্গে মিষ্টুও বায়না করছিল। সুতরাং কোনও উপায় না দেখে পাপিয়া নিমরাজি হলো। তবে সাবধানের মার নেই–একথা ভেবে ও বাপ্পাকে বলল, চল, আজ আমিও তোদের সঙ্গে যাব।
বাপ্পা একটু অবাক হলেও কিছু বলল না।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে ওরা দিব্যি ফুর্তিতে হাঁটা দিল পার্কের দিকে। চ্যাম্প দুলকি চালে বাপ্পার পাশে-পাশে চলতে লাগল।
চ্যাম্পের দিকে তাকিয়ে মিষ্টু বাপ্পাকে জিগ্যেস করল, আচ্ছা, বাপ্পাদাদা, ডোবারম্যানদের লেজ কাটা থাকে কেন?
বাপ্পা বিজ্ঞের মতো ভঙ্গি করে জবাব দিল, ডোবারম্যানের লেজ ঠিক টিকির মতো দেখতে। তাতে কুকুরের শো নষ্ট হয় বলে ডোবারম্যানের লেজ কাটা একেবারে মাস্ট। একদম ছোটবেলায় ওটা কেটে ফেলতে হয়। চ্যাম্পের লেজ আমাদের ডক্টর আঙ্কল কেটে দিয়েছে।
কথা বলতে বলতে ওরা চলে এল পার্কে।
দোলনাগুলোর কাছাকাছি একটা বেঞ্চিতে বসে পড়ল পাপিয়া।
সকালে দু-একপশলা বৃষ্টি হয়েছিল। তারপর রোদ উঠলেও পার্কের মাটি ভিজে সঁতসেঁতে। কিন্তু সেসব হৃক্ষেপ না করেই বাচ্চারা কলকলিয়ে ছুটোছুটি করছিল। মিষ্টু আর বাপ্পা একটা রবারের বল ছোঁড়াছুড়ি করে খেলতে লাগল। আর চ্যাম্প সেই বল ধাওয়া করে ওদের হুল্লোড়ের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিল। দু-একটা দিশি কুকুর চ্যাম্পকে লক্ষ করে ঘেউঘেউ করছিল, কিন্তু চ্যাম্প ওদের মোটেও পাত্তা দিচ্ছিল না।
তিনটে বেঞ্চিতে বেশ কয়েকজন পুরুষ-মহিলা বসে ছিলেন। এ ছাড়া দু-চারজন বয়স্ক মানুষ গল্প করতে করতে পায়চারি করছিলেন। আর কয়েকটা বেওয়ারিশ দিশি কুকুর এপাশ-ওপাশ ঘোরাঘুরি করছিল।
আকাশে বর্ষার কালো মেঘের টুকরো ভেসে বেড়াচ্ছিল। সূর্যের আলো সেখানে সোনালি জরির পাড় বসিয়ে দিয়েছে। আর পার্কের মাঠে, গাছের পাতায়, ঝকঝকে রোদ্দুর। একঘেয়ে বৃষ্টির ফাঁকে এই সুন্দর বিকেলটা সবাই উপভোগ করছিল।
খেলাধুলো ছুটোছুটিতে প্রায় আধঘণ্টা কেটে গেল। চ্যাম্পকে অনেকেই লক্ষ করছিল, ওকে নিয়ে মজা করছিল। ওর পিছনে ছুটতে ছুটতে হঠাৎ হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল মিষ্টু। বাপ্পা ওর কাছে ছুটে যাওয়ার আগেই শার্ট-প্যান্ট পরা রোগা মতন একজন লোক মিষ্টুকে ধরে তুলল, ওর জামা কাপড় হাত দিয়ে ঝেড়ে দিল। তারপর সামান্য হেসে পকেট থেকে জাম্বো সাইজের একটা ক্যাডবেরি চকোলেট বের করে মিষ্টুর হাতে দিল।
পাপিয়া দূর থেকে মিষ্টুর পড়ে যাওয়াটা লক্ষ করেছিল। ও বেঞ্চি ছেড়ে উঠে হাঁটা দিল মিষ্টুর দিকে।
বাপ্পা আর চ্যাম্প মিষ্টুর কাছে পৌঁছোতেই লোকটি বাপ্পাকে হেসে বলল, ভয় নেই, সেরকম কিছু লাগেনি। তারপর মিষ্টুর থুতনি ধরে আদর করে বলল, ক্যাডবেরিটা তুমি পুরোটা একা-একা খেয়ো না দাদাকে দু-এক কামড় দিয়ো। টা-টা…।
লোকটি অলস পায়ে পায়চারি করতে করতে চলে গেল।
মিষ্টু আর দেরি করল না। চকচকে চোখে ক্যাডবেরি চকোলেটটার মোড়ক ছিঁড়তে লাগল। বাপ্পার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল, বলল, বাপ্পাদাদা, আমি কিন্তু বেশি খাব–তোমাকে দুটো ব্লক দেব। আর আঙ্কল-আন্টির জন্যে..।
আচমকা মিষ্টুর হাত ফসকে ক্যাডবেরিটা পড়ে গেল মাটিতে।
কথা বলতে-বলতে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল ও। আর তখনই একটা ছুটন্ত বাচ্চা ওকে আলতো ধাক্কা দিয়ে চলে গেছে। ফলে চকোলেটটা আর সামলাতে পারেনি।
মিষ্টু ঝুঁকে পড়ে চকোলেটটা তুলে নিতে গেল। ততক্ষণে পাপিয়া ওর কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। পাপিয়া চেঁচিয়ে বলে উঠল, মিষ্টু, ওটা তুলবে না–খাবার জিনিস পড়ে গেলে কক্ষনও তুলতে নেই।
কিন্তু পাপিয়ার বারণ করার কোনও দরকার ছিল না। কারণ, চকোলেটটা পড়ে যাওয়ামাত্রই ঘুরঘুর করা দুটো দিশি কুকুর ওটার ওপরে বলতে গেলে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়েছে। দুটোর মধ্যে যেটা গায়েগতরে বেশ মোটাসোটা সেটাই জিতে গেল। চকোলেটটা মুখে নিয়ে রাংতার মোড়কসমেত আয়েশ করে চিবোতে লাগল।
