সন্ধে সাতটা নাগাদ অফিস থেকে ফিরল শমিত।
প্রথমে মিষ্টুর খবর নিল পাপিয়ার কাছে। তারপর বলল, একজন সাইকিয়াট্রিস্টের খোঁজ পাওয়া গেছে। ডক্টর চিত্রলেখা দাশগুপ্ত। তিনি পার্ক সার্কাসে বসেন–সোম, বুধ, শুক্র। আজ মঙ্গলবার। সুতরাং আগামীকাল মিষ্টুকে নিয়ে ডক্টর দাশগুপ্তের কাছে যাওয়া যেতে পারে।
সন্ধেবেলা হোমওয়ার্ক করতে বসে বাপ্পা মিষ্টুকে পাশে নিয়ে বসল। মাকে ডেকে বলল, কয়েকটা ইংরেজি আর বাংলা গল্পের বই দিতে মিষ্টু ওগুলো পড়বে।
পাপিয়া লক্ষ করল, কয়েকটা বই বেশ সুন্দর পড়তে পারছে মেয়েটা। আবার অন্য কয়েকটা বই পড়তে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছে বিশেষ করে ইংরেজিগুলো।
ব্যাপারস্যাপার দেখে পাপিয়ার মনে হল, মিষ্টু বোধহয় ক্লাস ফোর বা ফাইভে পড়ে। ও ঠিক করল, ফোর-ফাইভের কয়েকটা বই জোগাড় করে মিষ্টুকে রোজ পড়াবে। হয়তো এইরকম একটা স্বাভাবিক জীবন শুরু করলেই মেয়েটার স্মৃতি তাড়াতাড়ি ফিরে আসবে।
বাপ্পার মিষ্টুকে খুব পছন্দ হয়েছিল। পাপিয়াকে বারবার বলছিল, মা, বোনটাকে কী সুন্দর দেখতে। ওইটুকু মেয়ে কী ফ্যান্টাস্টিক গান গায়…।
পাপিয়া আর শমিত বুঝতে পারছিল, মিষ্টুকে পাওয়ার পর মোটামুটি একটা দিন নিশ্চিন্তে গড়িয়ে যাওয়ায় ওদের টেনশন অনেক কমে এসেছে। ভয় আর উৎকণ্ঠা সরে গিয়ে মিষ্টুর জন্য একটা সরল মায়া সেখানে জায়গা করে নিচ্ছিল।
কিন্তু তখনও ওরা বুঝতে পারেনি আগামী কয়েক ঘণ্টায় ওদের জীবনটা বদলে যাবে।
টেলিফোনটা এল রাত প্রায় এগারোটা নাগাদ।
মিষ্টু আর বাপ্পা তখন যে-যার ঘরে ঘুমিয়ে পড়েছে।
ফোনটা ধরেছিল পাপিয়া। শমিত তখন ড্রইং-ডাইনিং-এ বসে টিভি দেখছিল।
হ্যালো।
মিস্টার শমিত রায়চৌধুরী আছেন?
একমিনিট ধরুন–দিচ্ছি। বলে পাপিয়া গলা তুলে শমিতকে ডাকল : তোমার ফোন…।
টেলিফোনটা শমিতদের বড় বেডরুমে। কর্ডলেস ফোন না থাকায় মাঝে-মাঝে ফোন ধরতে বেশ অসুবিধেই হয়। বাপ্পাও বাবার কাছে মাসকয়েক ধরে কর্ডলেসের বায়না করছে, কিন্তু এখনও বায়নার কোনও সুরাহা হয়নি।
শমিত এসে পাপিয়ার হাত থেকে রিসিভার নিয়ে হ্যালো বলল।
পাপিয়া ঘরের টুকিটাকি গোছগাছ করছিল–তাতেই মন দিল আবার।
শমিত রায়চৌধুরী বলছেন? ও-প্রান্ত থেকে মিহি গলায় প্রশ্ন ভেসে এল।
হ্যাঁ, বলছি।
গতকাল রাতে আপনি ভি.আই.পি. রোডে একটা মেয়েকে পিক আপ করেছেন?
পিক আপ…মানে…ইয়ে…মেয়েটা আমাদের গাড়ির সামনে হঠাৎ এসে পড়েছিল..তারপর…।
ব্যাপারটা যে মিষ্টুকে নিয়ে সেটা বুঝতে পারামাত্রই পাপিয়া হাতের কাজ ছেড়ে শমিতের কাছে এসে দাঁড়াল। ওর কথা শুনতে লাগল মন দিয়ে।
আমরা সবই দেখেছি। ঠান্ডা গলায় শমিতকে থামিয়ে দিল লোকটি।
শমিতের বুকের ভেতরে মেঘ ডেকে উঠল। লোকটা কী করে সব দেখল? এ কি পুলিশের লোক, নাকি অন্য কেউ? শমিতকে ফোন করেছে কেন? লোকটা কি ব্ল্যাকমেল করতে চাইছে?
লোকটি তখন কথা বলছিল ও মেয়েটাকে যে আপনারা পেয়েছেন সেটা পুলিশে না জানিয়ে ভালোই করেছেন। ইন ফ্যাক্ট জানানোর কোনও দরকার নেই–ভুলেও আর জানাবেন না।
না, না, জানানোর কোনও প্রশ্নই নেই। তাড়াহুড়ো করে সায় দিয়ে বলল শমিত।
দ্যাটস গুড। তারিফের সুরে বলল লোকটা।
মেয়েটা পুরোনো কথা সব ভুলে গেছে–টোটালি ব্ল্যাঙ্ক হয়ে গেছে। উত্তেজিতভাবে বলল শমিত, আমরা ওর বাড়ির লোকের খোঁজ করব। দরকার হলে নিউজ পেপারে অ্যাড দেব। যতদিন কোনও খোঁজ না পাই ও আমাদের কাছেই থাকবে।
টেলিফোনের ও-প্রান্তে হাসল লোকটা অদ্ভুত এক ঠাণ্ডা হাসি। তারপর থেমে-থেমে বলল, ওসবের কোনও দরকার নেই। বাড়ির লোকের খোঁজ করবেন না, কাগজে অ্যাড দেবেন না…আর মেয়েটাকেও আপনাদের কাছে রাখবেন না।
শমিত হতভম্ব হয়ে বলে উঠল, এ আবার কী ধরনের কথা! তা হলে কী করব ওকে নিয়ে? রাস্তায় আবার বের করে দেব? তা কখনও হয় না কি!
না, না, তা কেন করবেন। আপনি আমার কথা বুঝতে পারেননি! আবার একটু হাসল লোকটা : আপনারা মেয়েটাকে মেরে ফেলুন–তা হলেই সব প্রবলেম সলভ হয়ে যাবে। ওকে মেরে ফেলাটা খুব জরুরি…কারণ, মেয়েটা অনেক কথা জানে। সেসব কথা মনে পড়ে গেলেই আমাদের বিপদ হবে–বহত ভারি মুসিবত। সো কিল দ্য গার্ল!
যেন ইলেকট্রিক শক খেয়ে কেঁপে উঠল শমিত। টেলিফোনের রিসিভারটা ওর হাত থেকে খসে পড়ে গেল মেঝেতে।
পাপিয়া ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠল। শমিতকে আঁকড়ে ধরে পাগলের মতো জিগ্যেস করতে লাগল, কী হল? কী হল?
শমিত মোমের মূর্তির মতো চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। শুধু বুকের ভেতরে একটা কেউটে সাপের নড়াচড়া ও টের পাচ্ছিল।
.
০৩.
রোজ বিকেলে বাপ্পা চ্যাম্পকে নিয়ে বেরোয়।
ওদের বাড়ির কাছাকাছি একটা মাঝারি মাপের পার্ক আছে। এই পার্কটায় পাড়ার দুর্গাপুজো হয়। এ ছাড়া সারাবছর পাড়ার ছেলেরা ফুটবল, ক্রিকেট কিংবা ভলিবল নিয়ে মেতে থাকে।
পার্কের রেলিং জং ধরা–বহুদিন তাতে রং পড়েনি। মেন গেটের স্তম্ভে ফাটল ধরেছে। গোটাপাঁচেক ল্যাম্পপোস্টের মধ্যে একটা কি দুটোয় বাতি জ্বলে। পার্কের একপাশে লোহার জাল দিয়ে ঘেরা হাফডজন বকুল, কৃষ্ণচূড়া আর দেবদারু গাছ আছে। তার কাছাকাছি দুটো দোলনা আর একটা টেকিকল। তাতে ছোট-ছোট বাচ্চারা খেলা করে।
