শকটা পেল কী করে? তোমার গাড়িতে চোট পেয়েছে বলে তো মনে হয় না।
পাপিয়ার কথার জবাবে ঠোঁট ওলটাল শমিত। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, না, আমার গাড়িতে চোট পায়নি। অন্য কোনও প্রবলেম হবে। যাও, ওকে বাপ্পার ঘরে নিয়ে যাও। যদি সেরকম কোনও চোট না থাকে তা হলে ডাক্তারের ব্যাপারটা কাল ভাবা যাবে।
না, মিষ্টুর শরীরে কোনওরকম আঘাতের চিহ্ন দেখতে পায়নি পাপিয়া। ওকে বাপ্পার ড্রেসটা পরিয়ে দেওয়ার পর ওর ফ্রকটা হালকা গরম জলে ভিজিয়ে দিয়েছে। রক্তের দাগগুলো তুলে ফেলা দরকার। কাল সকালে পাপিয়া নিজে জামাটা কেচে ফেলবে। ঠিকে কাজের লোককে এটা কাচতে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
রাতে মিষ্টু পাপিয়ার সঙ্গে শুয়েছে। তার আগে পাপিয়া ওকে এগ চাউমিন তৈরি করে খাইয়েছে। খাওয়া দেখে মনে হয়েছে, ওর খুব খিদে পেয়েছিল।
কথায় কথায় পাপিয়া ওকে অনেক কিছু জিগ্যেস করেছে, কিন্তু মিষ্টু সেরকম কোনও উত্তর দিতে পারেনি। ওর স্মৃতির স্লেটটা ভেজা ন্যাকড়া দিয়ে কেউ যেন তাড়াহুড়ো করে মুছে দিয়েছে। ফলে দু-একটা খাপছাড়া স্মৃতির টুকরো ছাড়া মিষ্টুর কাছে বাকি সব আঁধার হয়ে গেছে।
প্রথমে শমিত ভেবেছিল মিষ্টুকে ডাক্তার দেখাতে হবে শরীরের ডাক্তার। কিন্তু এখন বুঝতে পারছে, শরীরের নয়–মনের ডাক্তার দেখাতে হবে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মিষ্টুর স্মৃতি ফিরিয়ে নিয়ে আসতে হবে।
অ্যামনেশিয়া বা স্মৃতিবিলোপের ঘটনা এর আগে শমিত বইয়ে পড়েছে, সিনেমায় দেখেছে। কখনও কখনও খবরের কাগজেও এরকম দু-একটা খবর চোখে পড়েছে। কিন্তু স্বপ্নেও ভাবেনি, কোনও অ্যামনেশিয়ার রুগি ওর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়বে।
মিষ্টুকে নিয়ে পাপিয়াও কম ভাবেনি।
অন্ধকার ঘরে বিছানায় চুপচাপ শুয়ে কত না আকাশ-পাতাল ভেবেছে!
যদি মিষ্টুর খবরটা থানায় জানানো হয়, তা হলে পুলিশ নিশ্চয়ই ওকে লিলুয়ার উদ্ধার আশ্রম কিংবা ওরকম কোনও জায়গায় পাঠিয়ে দেবে। তারপর কবে মিষ্টুর বাড়ির লোকের খোঁজ পাওয়া যাবে কে জানে! ততদিন ওসব আশ্রমে কী কষ্টই না পাবে মেয়েটা! তার চেয়ে এখানে থাকলে ক্ষতি কী! বাপ্পার ছোটবোনের মতো থাকবে, হাসবে, খেলবে–এমনকী ওকে স্কুলেও ভরতি করে দেবে পাপিয়া। কেউ ওর সম্পর্কে কোনও কথা জিগ্যেস করলে ভজনচাঁদের গল্পটাই বলবে– মিষ্টু ওর বোনের ছোট মেয়ে। এমনিতে পাপিয়ার কোনও বোন নেই। না-ই বা থাকল। মিষ্টুর জন্য এরকম মিথ্যে বলা যায়। কাল রাতে শমিতের সঙ্গে এ নিয়ে ওর কথা হয়ে গেছে।
সকালের আলো বাড়ছিল। রাস্তার ওপারের কৃষ্ণচূড়া গাছটার মাথায় রোদ পড়েছে। কয়েকটা পাখি গাছের ডালে, পাতার আড়ালে, চঞ্চলভাবে ঘোরাফেরা করছে। মিষ্টু বোধহয় সেদিকেই তাকিয়ে ছিল, কারণ, গান শেষ করেই ও পাপিয়ার দিকে ফিরে বলল, ওই দ্যাখো, আন্টি, পাখিরা গাছে খেলা করছে…।
পাপিয়া বিছানা থেকে নেমে ওর কাছে এগিয়ে গেল। ওর মুখটা দু-হাতের পাতায় ধরে মাথায় চুমো খেল। তারপর জিগ্যেস করল, তুই এত সুন্দর গান শিখলি কোথায়?
মিষ্টু হেসে বলল, সে জানি না–আমার গান ভালো লাগে।
তুই কখন উঠেছিস রে? আমি তো একটুও টের পাইনি!
আমি তো সবসময় ভোরবেলা উঠি।
ফুটফুটে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে পাপিয়া ভাবছিল, ওর সামনে এখন অনেক কাজ।
সকাল নটা বাজলেই শমিত অফিসে বেরোবে। আর দশটা বাজলেই পাপিয়া বাপ্পাকে নিয়ে স্কুলে যাবে। শমিত অফিসে গাড়ি নিয়ে চলে যায়। ফলে পাপিয়াকে বেশিরভাগ সময় বাসেই যাতায়াত করতে হয়। অবশ্য কখনও কখনও শমিতের সময় থাকলে বাপ্পাকে স্কুলে দিয়ে আসে, কিংবা নিয়ে আসে। বাপ্পার স্কুলের কার পুলের কোনও গাড়ি এদিকটায় এখনও আসে না বলেই যত ঝঞ্জাট।
পাপিয়া ঠিক করল, বাপ্পাকে নিয়ে স্কুলে যাওয়ার সময় মিষ্টুকে সঙ্গে নিয়ে বেরোবে। ফেরার পথে মানিকতলা বা হাতিবাগান থেকে মিষ্টুর জন্য কয়েকটা জামা-টামা কিনে নেবে। তারপর দুপুরবেলাটা গল্প করবে মিষ্টুর সঙ্গে। যদি আচমকা কোনও দরকারি সূত্র বেরিয়ে আসে।
সন্ধেবেলা শমিত অফিস থেকে ফিরলে ওরা ঠিক করবে কোনও সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে মিষ্টুকে দেখাতে নিয়ে যাবে কি না। শমিত বলেছে, অফিস থেকে ও ভালো কোনও সাইকিয়াট্রিস্টের খোঁজখবর জোগাড় করে নিয়ে আসবে। অফিসে বেরোনোর সময় কথাটা ওকে আর-একবার মনে করিয়ে দিতে হবে।
মনে করিয়ে দিতেই শমিত বলল, ভুলে যাব মানে! এখন মিষ্টুর ব্যাপারটাই আমার একমাত্র চিন্তা।
অফিসে ওর কথা কাউকে আবার গল্প কোরো না যেন। শমিতকে সাবধান করে দিল পাপিয়া।
শমিত হাত নেড়ে বলে উঠল, আরে না, না–পাগল!
বাপ্পাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে একইভাবে সাবধান করে দিল পাপিয়া। বাপ্পা বিজ্ঞের মতো মাথা নাড়ল। ব্যাপারটা যে গোপন রাখাই ভালো সেটা ও ভালো করেই বুঝতে পেরেছে।
পাপিয়া শুধু বলল, আমাদের পাড়াপড়শি কেউ জিগ্যেস করলে ভজনচাঁদকে যে-গল্পটা বলেছি, সেটাই বলবি। বলবি মিষ্টু তোর মাসির মেয়ে। মাসি নৈহাটিতে থাকে।
শমিতকেও পাপিয়া বারবার করে সাবধান করল, তিনজনের বলা গল্প যেন একরকম হয়– নইলে লোকে সন্দেহ করবে।
পাপিয়ার পরিচালনায় সবকিছু ঠিকমতোই চলল।
বাপ্পাকে স্কুলে দিয়ে ফেরার সময় মিষ্টুর জন্য তিনরকম পোশাক কিনল পাপিয়া। ফ্রক, চুড়িদার, নাইটি। আর কয়েকটা প্যান্টি। তারপর বাড়ি ফিরে স্নান খাওয়া-দাওয়া সেরে ওর সঙ্গে গল্প করতে বসল। কথায় কথায় জানতে চেষ্টা করল অনেক কিছু। কিন্তু কোনও লাভ হলো না। এমন কোনও কথা মিষ্টু বলতে পারল না যা থেকে ওর বাড়ির লোকদের কোনও হদিস পাওয়া যেতে পারে।
