ঠিক তখনই মেয়েটা উঠে বসল। ওদের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, আমার নাম মিষ্টু। তোমরা কে?
নতুন অতিথিকে প্রথম থেকেই বেশ ভালোরকম জরিপ করছিল চ্যাম্প। এখন, মিষ্টু উঠে বসামাত্রই, চ্যাম্প এগিয়ে এল ওর কাছে। চাপা গলায় কয়েকবার ডেকে উঠল।
.
০২.
সকালে পাপিয়ার ঘুম ভাঙতেই একটা গানের সুর কানে এল। খুব মিষ্টি গলায় কেউ গাইছেঃ
ভোরের আলো।
ভোরের বাতাস
ভোরের পাখির গান,
নয়ন মেলে
দেখ না মাগো
জুড়াবে তোর প্রাণ…
প্রথমটা পাপিয়া ভাবল, বাপ্পা বোধহয় ভোরবেলা উঠেই ফুল ভলিয়ুমে এফ.এম. চ্যানেল শুনছে। ওর মনে পড়ল, বাপ্পা ও-ঘরে শুয়েছে–ওর বাবার সঙ্গে। ও-ঘরে ট্রানজিস্টর রেডিয়ো চললে এ-ঘরে শুনতে পাওয়ার কথা নয়। তবুও…
তখনই পাপিয়া চোখ খুলল।
চোখ খুলেই যে-ছবিটা দেখল তাতে ওর মনটা কেমন হয়ে গেল। ওর মনে হল, এরকম সুন্দর ভোর ওর জীবনে আগে কখনও আসেনি।
রাস্তার ধারের একটা জানলার পাশে বসে বাইরের দিকে চোখ মেলে চেয়ে আছে মিষ্টু। আর অদ্ভুত তৈরি গলায় সুর করে গান গাইছে–যে-গান পাপিয়া এফ.এম. চ্যানেলের গান বলে ভুল করেছিল।
বিছানায় উঠে বসল পাপিয়া। মিষ্টুকে দেখতে লাগল। মিষ্টু মুখ ফিরিয়ে পাপিয়াকে একপলক দেখল, কিন্তু গান থামাল না। একচিলতে হাসল শুধু।
মেয়েটার গায়ে বাপ্পার নীল আর খয়েরি প্রিন্টের হাফশার্ট, পায়ে বাপ্পার হাফপ্যান্ট হাফপ্যান্টের রং হালকা বিস্কুট, আর তাতে একগাদা পকেট।
পাপিয়াদের ফ্ল্যাটের জানলা দিয়ে নীচের রাস্তা দেখা যায়। রাস্তার ওপারে একটা বিশাল কৃষ্ণচূড়া গাছ, আর তার পিছনেই টিনের চাল দেওয়া একটা মোটর গ্যারেজ। গ্যারেজের পাশে অনেকটা লম্বা জায়গা জুড়ে টিনের কৌটো তৈরির একটা কারখানা। তার দরজার পাশে দাঁড়িয়ে একটা কাঠগোলাপ গাছ।
বর্ষা শুরু হয়েছে বেশ কিছুদিন আগেই, কিন্তু দুটো গাছ ঋতুর কথা না ভেবে এখনও ফুল ফুটিয়ে চলেছে। গাছ দুটোর মাঝখান দিয়ে অনেক দূর পর্যন্ত নজর চলে যায়। দেখা যায় বিশাল আকাশ। আকাশের নীচে খুচরো বাড়ির জঙ্গলে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে একটা লম্বা চিমনি। ওটা দিয়ে কখনও ধোঁয়া বেরোতে দেখেনি পাপিয়া।
মিষ্টু গ্রিলে মুখ ঠেকিয়ে এসবই দেখছিল বোধহয়, আর গান গাইছিল।
কাল সারারাত পাপিয়ার ভালো ঘুম হয়নি। নানান চিন্তা ওকে কুরেকুরে খেয়েছে। তারপর, শেষরাতের দিকে, নেহাত ক্লান্ত হয়েই ঘুমিয়ে পড়েছে।
পাপিয়ার দুশ্চিন্তার কারণ মিষ্টু। কাল রাতে ওর জ্ঞান ফিরে আসার পর ওরা সবাই নিশ্চিন্ত হয়েছিল। ভেবেছিল সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেছে।
মিষ্টুর জ্ঞান ফেরার পরই পাপিয়া ওর পাশটিতে বসে পড়েছে। একহাতে ওকে জড়িয়ে ধরে সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে।
মিষ্টু, এই হল তোমার শমিত আঙ্কল, এ হল বাপ্পা-তোমার দাদা, আমি হলাম পাপিয়া আন্টি। আর এই যে সুন্দর ডোবারম্যান কুকুরটা দেখছ–ওর নাম চ্যাম্প।
মিষ্টু হাসিমুখে পরিচয়ের পালা সারছিল। একে-একে ও হাত বাড়িয়ে দিল শমিতের দিকে, বাপ্পার দিকে, পাপিয়ার দিকে। আর সবশেষে চ্যাম্পের ঘাড়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, আমার ডোবারম্যান ভালো লাগে। আমি ডোবারম্যান আগেও দেখেছি।
শমিত অধৈর্য হয়ে পড়ছিল, কিন্তু কোনও কথা বলল না। কারণ, ও জানে, পাপিয়ার বাস্তব বুদ্ধি অনেক বেশি। অনেক সময় ছোট-ছোট ছেলেমেয়েরা জেদ ধরে বসে–তখন ওদের কাছ থেকে কোনও কথা বের করা যায় না। মিষ্টুর বেলায় কোনওরকম ঝুঁকি নিতে চায় না পাপিয়া। ওর সঙ্গে সহজ-স্বাভাবিক ব্যবহার করে সব কথা জানতে হবে।
তোমার ভালো নাম কী? পাপিয়া মিষ্টুর মুখের কাছে ঝুঁকে পড়ে জিগ্যেস করল।
ভালো নাম জানি না। আমার নাম মিষ্টু।
একটু অবাক হলেও পাপিয়া হাল ছাড়ল না।
তোমার বাড়ি কোথায়?
জানি না। পা দোলাতে-দোলাতে নির্বিকার মুখে বলল মিষ্টু।
সে কী! বাড়ি কোথায় জানো না? শমিত জানতে চাইল এবার।
না, আঙ্কল, জানি না। শমিতের দিকে সরল চোখে তাকিয়ে বলল মেয়েটা।
তোমাদের বাড়ির ফোন নাম্বার মনে আছে? পাপিয়া ওর মাথায় হাত বুলিয়ে নরম করে জানতে চাইল।
না, মনে নেই।
বাবার নাম, মায়ের নাম?
এপাশ-ওপাশ মাথা নেড়ে না বোঝাল মিষ্টু।
তোমার জামায় রক্ত লাগল কীভাবে? প্রশ্নটা করে শমিত আবার হাঁটুগেড়ে বসে পড়েছে। মিষ্টুর কাছে।
রক্ত? কোথায়? মাথা নীচু করে গায়ের ফ্রকের দিকে তাকাল মিষ্টু। লাল ছোপগুলোয় বারতিনেক আঙুল ছুঁইয়ে মুখ বেঁকাল ও এ ম্যা! আমার ফ্রকটা শিগগির পালটে দাও। ওটা কাচতে হবে।
পাপিয়া ফ্যালফেলে চোখে শমিতের মুখের দিকে তাকাল।
বাপ্পা জিগ্যেস করল, কোন স্কুলে পড়ো তুমি?
মিষ্টু পালটা জানতে চাইল, তুমি কোন স্কুলে পড়ো?
ক্যালকাটা বয়েজ..। আর, তোমার স্কুল?
মিষ্টু ঘরের সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে মনে করার খুব চেষ্টা করল। তারপর মাথা নাড়ল : নাঃ, মনে পড়ছে না। ভুলে গেছি।
শমিত আর পাপিয়া মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। বাপ্পাও হতাশ হয়ে মা-বাবার দিকে দেখল।
মিষ্টু পাপিয়াকে বলল, আমার এই নোংরা ড্রেসটা চেঞ্জ করে দাও, আন্টি।
পাপিয়া কেমন অসহায়ভাবে শমিতের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল।
শমিত বিড়বিড় করে বলল, ওর কোনও কথা মনে নেই। মনে হয় কোনও শক-টক পেয়ে পুরোনো সব কথা পুরোপুরি ভুলে গেছে।
