তাই ও ডেকে উঠল পিছন থেকে, স্যার, আপনি কি আবার বেরোবেন?
শমিত মুখ না ফিরিয়েই জবাব দিল, না। আমি ওপর থেকে এসে গাড়ি তুলে দিচ্ছি।
পাপিয়া তাড়াতাড়ি পা চালাচ্ছিল, সেইসঙ্গে বাপ্পাকেও হাত ধরে টানছিল। কিন্তু বাপ্পা ঠিক বুঝতে পারছিল না ভজনচাঁদকে ভয় পাওয়ার কী আছে।
ভজনচাঁদ কৌতূহল চাপতে পারল না। পিছন থেকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল, এ-লড়কিকে কোথা থেকে নিয়ে এলেন, স্যার? ওর কি বোখার হয়েছে?
পাপিয়ার বুকের ভেতরটা ধড়াস করে উঠল।
শমিত কী জবাব দেবে বুঝে উঠতে পারছিল না। তাই পাপিয়ার দিকে তাকাল।
আর বাপ্পা পিছন ফিরে ভজনচাঁদকে দেখছিল।
মাঝবয়েসি বোকা-বোকা মুখ। মাথায় কদমছাঁট চুল। মুখে বসন্তের দাগ। গায়ে স্যান্ডো গেঞ্জি আর পায়ে খাকি হাফ প্যান্ট। এমনিতে লোকটা বড়ই সাদাসিধে সরলমতি। শখ কিংবা নেশা বলতে দুটি জিনিস খইনি আর সিনেমা।
পাপিয়া ভজনচাঁদের দিকে ঘুরে তাকিয়ে অকারণেই হাসল। তারপর বলল, আমার বোনের ছোট মেয়ে, ভজন। তুমি ঠিকই ধরেছ, ওর জ্বর হয়েছে। ওর বাবা-মা কদিনের জন্যে দিল্লি গেছে– তাই ও এখন আমাদের কাছে দু-চারদিন থাকবে।
ভজনচাঁদকে এরকম সাতকাহন কৈফিয়ত দেওয়ার কোনও মানে হয় না। কিন্তু বানানো গল্পটা বলতে পেরে পাপিয়ার ভালো লাগল। কারণ, এই মেয়েটি সম্পর্কে অনেকেই অনেক প্রশ্ন করবে। তাদের মুখ বন্ধ করতে এই গল্প তৈরি করাটা খুব জরুরি। এই গল্পটা বারবার বলতে-বলতে এর ফাঁকফোকরগুলো ঠিকঠাক করে নেওয়া যাবে–অনেকটা নাটকের রিহার্সালের মতো। তখন এই বানানো গল্পটাই সত্যি ঘটনার মতো শোনাবে।
ওরা সিঁড়ি উঠে চলে এল তিনতলার।
পাপিয়া ব্যাগ থেকে চাবির গোছা বের করল। কোলাপসিবল গেটের তালা খুলল। তারপর পালিশ করা কাঠের দরজার নাইটল্যাচে চাবি ঢোকাল।
বাপ্পা মেয়েটার মুখ দেখার চেষ্টা করছিল। ওর মনে হচ্ছিল, ডাক্তার আঙ্কেলকে খবর দিলেই বাবা ভালো করত। কিন্তু মায়ের যতসব উলটোপালটা ভয়!
ফ্ল্যাটের দরজায় শব্দ হতেই ভেতর থেকে চ্যাম্পের চাপা ডাক শোনা গেল কয়েকবার। আর ওরা ফ্ল্যাটে ঢুকতেই ডোবারম্যান কুকুরটা কোথা থেকে বেরিয়ে এসে শমিত আর বাপ্পার পায়ের কাছে ঘুরঘুর করতে লাগল। বাপ্পা চ্যাম্প, চ্যাম্প বলে কয়েকবার ডাকল, ওর ঘাড়ে আলতো চাপড় মেরে হাত বুলিয়ে দিল।
বসবার ঘরের রট আয়রন সোফায় মেয়েটাকে খুব সাবধানে শুইয়ে দিল শমিত। তারপর হাঁপাতে হাঁপাতে পাপিয়াকে বলল, ভালো করে দ্যাখো ওর কোথাও চোট লেগেছে কিনা। আর চোখে-মুখে একটু জলের ছিটে দাও…হয়তো সেন্স ফিরে আসবে। আমি গাড়িটা গ্যারেজে তুলে আসছি।
বাপ্পা বলে উঠল, গাড়িতেই আমি জল দিয়েছিলাম…।
আর-একবার দিয়ে দ্যাখ– বলে শমিত ফ্ল্যাট ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
পিছন থেকে পাপিয়া ডেকে বলল, ভজনচাঁদের সঙ্গে এ-নিয়ে আর কোনও কথা বলবে না।
মিনিট দশেক পরেই ফ্ল্যাটে ফিরে এল শমিত।
এসে দ্যাখে মা আর ছেলে ফ্যাকাসে মুখে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওরা দুজনেই একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে মেয়েটার দিকে।
শমিত অবাক হয়ে জিগ্যেস করল, কী ব্যাপার? কী হয়েছে?
শমিতের কথার জবাব দিল না কেউ। শুধু পাপিয়া আঙুল তুলে মেয়েটার ফ্রকের দিকে দেখাল।
শমিত তাকাল সেদিকে, কিন্তু তেমন কিছু ঠাহর করতে পারল না।
তখন পাপিয়া কাঁপা গলায় বলল, রক্ত–ওর ফ্রকে রক্তের ছোপ লেগে রয়েছে।
এইবার বুঝতে পারল শমিত। মেয়েটার কাছে গিয়ে হাঁটুগেড়ে বসে পড়ল ও।
সত্যিই তো! ফ্রকের ওপরে যে চড়া রঙের সস্তা প্রিন্ট ও দেখেছিল তার মধ্যে নীল আর সবুজ রংটায় কোনও গোলমাল নেই। তবে লালের ছোপগুলো মোটেই রং নয়–রক্ত। কোনওভাবে ওর ফ্রকে ছিটকে গিয়ে ছোট-বড় ফোঁটা মিলিয়ে একটা এলোমেলো নকশা তৈরি করেছে।
রক্তের দাগগুলো আলতো করে পরখ করল শমিত। এগুলো কি মানুষের রক্ত, না কি অন্য কোনও পশুপাখির রক্ত? না কি মেয়েটা অ্যাক্সিডেন্টে চোট পেয়ে আহত হয়েছে? হয়তো ওর পায়ে টায়ে কোথাও কেটে গেছে।
সে কথাই পাপিয়াকে বলল ও।
তুমি ওকে একটু বাপ্পার বেডরুমে নিয়ে যাও। ভালো করে চেক করে দ্যাখো উন্ডেড হয়েছে কি না। আর ওর ড্রেসটা ছাড়িয়ে ওকে বাপ্পার একটা ড্রেস পরিয়ে দাও। কিছুক্ষণ চিন্তা করল শমিত। তারপর বিড়বিড় করে বলল, মনে হচ্ছে আমাদের কপালে পুলিশের হেনস্থা লেখা আছে।
পুলিশ! আঁতকে উঠে বলল পাপিয়া।
শমিত ক্লান্তভাবে মাথা নেড়ে সায় দিল। ধীরে-ধীরে উঠে দাঁড়াল।
আর ঠিক তখনই মেয়েটার মাথাটা সামান্য নড়ে উঠল। ওর ঠোঁট ফাঁক হল।
বাপ্পা চেঁচিয়ে উঠল, বাবা, দ্যাখো…দ্যাখো…!
মেয়েটা ততক্ষণে চোখ মেলে তাকিয়েছে।
ও চোখ মেলে তাকাতেই ওর মিষ্টি মুখটা আরও মিষ্টি হয়ে গেল। তখন বোঝা গেল, চোখেরও একটা নিজস্ব সৌন্দর্য আছে।
মেয়েটিকে চোখ মেলে তাকাতে দেখেই বাপ্পার মুখে হাসি ফুটে উঠল। একই সঙ্গে একটা স্বস্তির শ্বাস বেরিয়ে এল ওর বুকের ভেতর থেকে। যাক, আর ভয় নেই।
সামান্য হাসি পাপিয়াকেও ছুঁয়ে গেল। ও নিশ্চিন্ত হয়ে হাঁফ ছাড়ল। আর থানা-পুলিশ নার্সিংহোমের ঝামেলা নেই। মেয়েটার মুখ থেকে ঠিকানা-ফোননম্বর জানামাত্রই ওর বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ করে ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলা যাবে।
ও শমিতের দিকে তাকিয়ে হাসল। শমিত ওর হাসি ফিরিয়ে দিল।
