মেয়েটা চিত হয়ে পড়ে ছিল রাস্তায়। গাড়ির হেডলাইটের আলো ওকে ভাসিয়ে দিয়েছে। বয়েস কত হবে? বড়জোর নয় কি দশ। পুতুল-পুতুল মিষ্টি মুখটাকে ঘিরে রেখেছে একরাশ কেঁকড়া চুল। দু-চোখ বোজা হয়তো অজ্ঞান হয়ে গেছে।
মেয়েটির পরনে লম্বা ফ্রক–তাতে হালকা রঙের কাপড়ে চড়া রঙের সস্তা প্রিন্ট। দুকানে রুপোর মাকড়ি, গলায় সরু ইমিটেশন চেন।
ওকে দেখে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না, কোথাও সেরকম চোট পেয়েছে কি না।
কেমন একটা ঘোরের মধ্যে এপাশ-ওপাশ দেখল শমিত। রাস্তা ফঁকা। কেউ নেই। শুধু কখনও কখনও ছুটন্ত গাড়ির জ্বলজ্বলে দুটো চোখ হুউস করে উড়ে যাচ্ছে।
ঝুঁকে পড়ে মেয়েটাকে শমিত তুলে নিল। ছিপছিপে হালকা শরীর–তেমন একটা ওজন নেই। শমিতের দু-হাতের ওপরে দেহটা ছোট্ট কোলবালিশের মতো নিথর হয়ে পড়ে আছে।
চটপট গাড়ির কাছে ফিরে এল ও। ওর মাথার মধ্যে ডাক্তার-হাসপাতাল-নার্সিংহোম– এইসব শব্দগুলো ঘুরপাক খাচ্ছিল।
বাপ্পা তীক্ষ্ণ চোখে সবকিছু দেখছিল। বাবাকে গাড়ির দিকে আসতে দেখেই ও গাড়ির দরজা খুলে ধরল। সুইচ টিপে গাড়ির ভেতরের আলোটা জ্বেলে দিল।
বাপ্পা আর শমিত যখন মেয়েটাকে পিছনের সিটে কসরত করে শুইয়ে দিচ্ছে তখন পাপিয়া কাঁপা গলায় জিগ্যেস করল, মেয়েটার সঙ্গে আর কেউ নেই! এত রাতে ভি.আই.পি. রোডে ও একা…।
শমিত সংক্ষেপে বলল, দেখছি তো আর কেউ নেই…।
ড্রাইভিং সিটে বসে সিট বেল্ট বাঁধল শমিত। তারপর ঝাঁকুনি দিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিল। বাপ্পা গাড়ির ভেতরের আলোটা নিভিয়ে দিল। কেমন একটা ভয় ওদের আঁকড়ে ধরতে চাইছিল।
গাড়ি খানিকটা এগিয়ে যেতেই পাপিয়ার চোখে পড়ল, রাস্তার বাঁদিক ঘেঁষে গাছগাছালির গায়ে একটা সাদা অ্যাম্বাসাডর দাঁড়িয়ে রয়েছে–তার পিছনের লাল লাইট দুটো জ্বলছে।
বাবা, ওর সিরিয়াসলি লাগেনি তো? বাপ্পা আর থাকতে না পেরে জিগ্যেস করল।
শমিত ঠান্ডা গলায় বলল, দেখে তো মনে হচ্ছে লাগেনি। চলো, ওকে ডক্টর চৌধুরীর কাছে নিয়ে যাই…উনি ভালো করে দেখে কনফার্ম করবেন।
পাপিয়া প্রায় আঁতকে উঠে বলল, পাগলের মতো কী বলছ তুমি! ডক্টর চৌধুরীর কাছে নিয়ে গেলেই উনি ব্যাপারটা পুলিশে ইনফর্ম করতে বলবেন। তারপর টানাহ্যাঁচড়া, পুলিশ-কেস…ওঃ, আমি আর ভাবতে পারছি না…।
পাপিয়া, তুমি ভুলে যাচ্ছ, ডক্টর চৌধুরী আমাদের ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান। তুমি যা ভাবছ ওসব কিচ্ছু হবে না।
বাই চান্স যদি হয় তখন কে বাঁচাবে? ভাগ্যিস, ভি.আই.পি.-র পুলিশ প্যাট্রল আমাদের দেখতে পায়নি!
হঠাৎই শমিতের মনে হল, পাপিয়ার কথা নিতান্ত আজগুবি নয়। ব্যাপারটা নিয়ে পুলিশের ঝাট হলেও হতে পারে। তাই ও পাপিয়াকে হাত নেড়ে শান্ত করার চেষ্টা করে বলল, ঠিক আছে, ঠিক আছে। আগে তো ওকে বাড়িতে নিয়ে যাই..।
শমিতের গাড়ির সিট কভারের সঙ্গে জলের বোতল রাখার ব্যাগ আছে। সেখানে সবসময় একটা প্লাস্টিকের বোতলে জল রাখা থাকে। বাপ্পা চুপ করে মা-বাবার কথাবার্তা শুনছিল। কিন্তু একইসঙ্গে ওর হাত কাজ করছিল।
জলের বোতলটা ব্যাগ থেকে বের করে নিয়ে ও ছিপি খুলল। কিছুটা জল হাতে ঢেলে নিয়ে ছিটিয়ে দিল মেয়েটির চোখে-মুখে। তারপর ভিজে হাতটা আলতো করে বুলিয়ে দিল মেয়েটির কপালে।
বোতলটা আবার জায়গামতো রেখে দিয়ে একদৃষ্টে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইল বাপ্পা। কিন্তু না–গাড়ির ঝাঁকুনির জন্য মেয়েটার শরীর যেটুকু নড়াচড়া করছে তার বাইরে বাড়তি কোনওরকম আলোড়ন দেখা গেল না।
ওকে নিয়ে তখনও আলোচনা করছিল শমিত আর পাপিয়া।
কার মেয়ে? কোথায় থাকে? বাড়ির লোকজনকে ঠিকমতো খবর দেওয়া যাবে কি না! ওর জ্ঞান ফিরলেই হয়তো ওর বাড়ির ঠিকানা কি ফোননম্বর জানা যাবে। তখন…।
এইসব নানান কথার মাঝে ওরা পৌঁছে গেল বাড়িতে।
অরবিন্দ সরণি থেকে রাজা দিনেন্দ্র স্ট্রিটে খানিকটা ঢুকেই গোলাপি রঙের একটা পাঁচতলা ফ্ল্যাটবাড়ি। শমিতরা এ-বাড়িরই তিনতলার ফ্ল্যাটে থাকে। বাড়ির নীচতলাটা গ্যারেজ। শমিতের গাড়ি সেখানে থাকে।
শমিত হর্ন দিতেই বড় লোহার দরজা খুলল দারোয়ান ভজনচাঁদ।
পাপিয়া চাপা গলায় বলল, গাড়িটা গ্যারেজে ঢোকানোর দরকার নেই। গাড়ি এখানে রেখে আগে ফ্ল্যাটে চলো। আমি মেয়েটাকে কোলে নিয়ে এতটা সিঁড়ি ভাঙতে পারব না।
শমিত ভুরু কুঁচকে জিগ্যেস করল, কেন? গ্যারেজে গাড়ি রেখে তারপরেও তো ওই কাজগুলো করা যায়।
মেয়েটাকে এই অবস্থায় দেখলে ভজন সন্দেহ করতে পারে…।
এখন গাড়ি থেকে নামলেও তো দেখতে পাবে সন্দেহও করতে পারে যে, আমরা একটা বাচ্চা মেয়েকে কিডন্যাপ করে এনেছি।
শমিতের ঠাট্টায় পাপিয়া মুখ বেঁকাল: আমার বুদ্ধি কখনও তুমি নেবে না।
তখন বাপ্পা বলল, বাবা, মা যা বলছে তাই করো। আমরা এখানেই নেমে যাই। তুমি পরে নীচে এসে গাড়ি গ্যারেজ করে দিয়ো–
অগত্যা শমিত রাজি হল।
ওরা সবাই নেমে পড়ল গাড়ি থেকে। শমিত মেয়েটাকে কোলে নিয়ে ওর মাথাটা শুইয়ে দিল নিজের ডানকাঁধের ওপরে। তারপর সদর দরজা দিয়ে ঢুকে গ্যারেজের পাশের পথ ধরে হাঁটা দিল ফ্ল্যাটবাড়ির দরজার দিকে।
ভজনচাঁদ লোহার গেটের একটা পাল্লার পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল কখন শমিতের মারুতি গ্যারেজে ঢুকবে। তার বদলে ওদের হেঁটে যেতে দেখে সে বেশ একটু অবাক হল। ভাবল, শমিতবাবু বোধহয় গাড়ি নিয়ে আবার বেরোবে।
