অসম্ভব! বলে উঠলেন ক্রসওয়ার্ড।
আমি উত্তরে মৃদু হেসে এগিয়ে গেলাম মেঝেতে পড়ে থাকা আপ্তের দিকে। একটানে তুলে ফেললাম তার পরচুলা আর ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি। সানগ্লাসটা খুলে নিতেও ছাড়লাম না।
কিরণ শর্মা এক ফাঁকে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। এই সময় তিনি এসে ঘরে ঢুকলেন। সঙ্গে এক ভদ্রলোক, তার চোখে সবুজ রঙের সানগ্লাস, ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি।
অবাক এ কী কান্ড সব! বললেন নরসিংহ চৌধুরী।
হ্যাঁ, বললেন কিরণ শর্মা, ইনিই হলেন আসল কিষাণ আপ্তে বা এজেন্ট জেড। যাকে আমরা–মানে, আমি আর কাঞ্চনবাবু, একটা পোড়ো বাড়িতে বন্দি অবস্থায় পেয়েছি।
কিন্তু আপনি! অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন সর্বেশ্বর রায়।
অধমের নাম, অরুণ চৌধুরী ফ্রম ক্যালকাটা। পেশায় শার্লক হোমস–মানে, ডিটেকটিভ।
আপনিই! বিস্ময়াপন্ন স্বর বেরিয়ে এল অনেকের গলা দিয়ে।
হ্যাঁ, আমিই। আমি কাঞ্চনবাবুকে সব খুলে বলেছি–উনিই আপনাদের সব বুঝিয়ে বলবেন। আমি কোনওদিন এরকম জটিল রহস্যের মুখোমুখি হইনি।
ক্রসওয়ার্ড এগিয়ে গিয়ে ভূলুণ্ঠিত বর্মনকে দাঁড় করিয়ে হাতকড়া এঁটে দিলেন। বললেন, কিন্তু, মিস্টার চৌধুরী, কুমার রণজিৎকে খুন করল কে? সমর বর্মন?
না। বললাম আমি, সে কথায় পরে আসছি। প্রথম থেকেই বলা যাক সব। শ্রীনরসিংহ যেদিন হোটেলে গিয়ে আমার সঙ্গে পাণ্ডুলিপির ব্যাপারে কথা বলেন, তখন আমি বুঝিনি অন্য উপায় বলতে তিনি কী বলতে চেয়েছিলেন। পরে আমি ফোন পাই মেহেতা অ্যান্ড সন্স থেকে। তারা একজন রিপ্রেজেন্টেটিভ পাঠাচ্ছে পাণ্ডুলিপিটার জন্যে। সন্দেহ হওয়ায়, সঙ্গে-সঙ্গে আমি ফোন করি মেহেতা অ্যান্ড সন্সে। কিন্তু তারা আমাকে জানায় যে, তারা কোনও ফোনই করেনি। আমি তখন আসল পাণ্ডুলিপিটা হোটেল কন্টিনেন্টালের ভলটে রেখে নকল একটা প্যাকেট গজানন শিকদারের হাতে তুলে দিই।
এখনও তা হলে পাণ্ডুলিপিটা আপনার কাছেই আছে? প্রশ্ন করলেন মানেকজি।
হা-হোটেলের ভলটে। সে যাক, এর পরের ব্যাপার আরও ঘোরালো। চিঠিগুলো আমার কাছে থেকে চুরি করেছিল ইব্রাহিম। সে লাল পাঞ্জার হয়ে কাজ করছিল। পরে বোধহয় বেলাইনে চলার জন্যে সে মার্ডার হয়। তখন মার্ডারারকুমারের হত্যাকারী তাদের নির্দেশ দেয় সুচরিতাকে ফাঁসানোর জন্যে। কারণ? কারণ নিশ্চয়ই একটা ছিল।
আমি পুলিশী ঝামেলা এড়ানোর জন্যে ইব্রাহিমের বডি নিয়ে কী করেছি তা আপনারা জানেন। এদিকে ইব্রাহিমের কাছ থেকে চিঠিগুলো চলে যায় হত্যাকারীর হাতে। কিন্তু এর আগে একটা চিরকুটে সে ইব্রাহিমকে তার সঙ্গে কবুতরে দেখা করতে বলেছিল। সম্ভবত সে নেকলেসটা পাচার করতে চেয়েছিল। কিন্তু ইব্রাহিম মারা যাওয়ায় এবং চিরকুটের ব্যাপারটা ভুলে যাওয়ায় ওটা আমার হাতে পড়ে। আমি সেই রাতে কবুতরে আসি এবং কী ঘটেছিল তা আবার বলার বোধহয় দরকার নেই। হত্যাকারী যখন নেকলেসটা লাইব্রেরিতে খুঁজছিল তখন কুমার আচমকাই সেখানে এসে হাজির হন এবং তাকে চিনতে পারেন। সঙ্গে-সঙ্গে হত্যাকারী তাকে গুলি করে। এই নেকলেস নিয়ে এর আগেও একজন অজ্ঞাতপরিচয় লোক খুন হয়েছিল–এই কবুতরেই।
সমর বর্মনের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল হত্যাকারী। এবং প্রথম রাতে যখন বর্মন (আপ্তের পরিচয়ে) লাইব্রেরিতে ঢোকে তখন তার সঙ্গে মার্ডারার ছিল। সে সুচরিতার পাশ কাটিয়ে অন্ধকারেই বেরিয়ে যায়। সুচরিতাকে অরুণ চৌধুরী ইচ্ছে করেই আটকেছিলেন। কারণ, তখনও তিনি জানতেন যে, আসল এজেন্ট জেডই গোপনে তদন্ত করছেন। পরে তিনি বর্মনের ছদ্মবেশটা ধরে ফেলেন শুধু তার কানের জন্যে। আপনারা আসল জেডকে দেখুন–তাঁর কানের লতিটা গালের সঙ্গে লাগানো নয়। অথচ সমর বর্মনের কান লক্ষ করুন কানের লতিটা গালের সঙ্গে লাগানো। সুরেন্দ্র পালিত এই কথাই লিখেছিলেন তাঁর পাণ্ডুলিপিতে।
কিন্তু, কুমারের হত্যাকারী কে? প্রশ্ন করলেন প্রসাদজি।
রানী সুলক্ষণা সেন। কুমার রণজিৎ সেনের বোন অথবা শ্ৰীমতী নয়না কল্যাণী।
অবাক হয়ে সবাই তাকিয়ে রইল আমার দিকে।
মানেকজি কোনওরকমে বললেন, ইমপসিবল!
আমি ওঁর দিকে ফিরে হেসে বললাম, উনি আপনার দূরসম্পর্কের বোন। কিন্তু এখানে আসার আগে কি আপনি ওঁকে কখনও চোখে দেখেছেন?
মানেকজি হতভম্ব হয়ে মাথা নাড়লেন, বললেন, না।
ঠিক তখনই লাফিয়ে উঠল সুচরিতা, মনে পড়েছে, মনে পড়েছে, কাঞ্চন,–সেই রাতে আমি ল্যাভেন্ডারের গন্ধ পেয়েছিলাম–আর নয়না কল্যাণীর গা থেকে কাল ওইরকম গন্ধ পেয়েছি তখন আমার ঠিক মনে পড়েনি।
প্রসাদজি, মনে করে দেখুন যখন গুপ্তপথে আমরা ঢুকেছিলাম, তখন বর্মনের অতিআগ্রহের কথা–। নয়না কল্যাণী নিজেই চেষ্টা করেছিলেন চিঠিগুলো ডিকোড করতে। কিন্তু না পেরে কৌশলের আশ্রয় নিয়েছিলেন। সে-কথা আপনারা নকল জেডের কাছ থেকে শুনেছেন। কুমারের মৃত্যুর রাতে নয়না কল্যাণীর ঘরেই আলো জ্বলেছিল।
কিন্তু আসল নয়না কল্যাণী গেলেন কোথায়? প্রশ্ন করলেন শ্রীসর্বেশ্বর রায়।
তিনি কবুতরে আসার পথে বদল হয়েছেন। আসল নয়নার বদলে এসেছেন সুলক্ষণা সেন। সুলক্ষণা সেনকে আমি দেখিনি। আমি তখন নেপালে ছিলাম, কিন্তু সুচরিতা তাঁকে দেখেছিল। তাই, ও যদি চিনে ফ্যালে…তাই ওকে কবুতরে আসা থেকে আটকানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।
