এবার শুধু অপেক্ষা।
বড় জমি পেয়ে এক্স-এর তেজ অনেক বেড়ে গেছে। আস্পর্ধাও।
আজ থেকে আমি ওকে কন্ট্রোল করার রিসার্চ শুরু করেছি। এমন একটা কেমিক্যাল আমাকে আবিষ্কার করতে হবে যা ছড়িয়ে দিলে এক্স-এর অ্যাকটিভিটি স্লো হয়ে যাবে। ও রাতের বেলাতেও নিস্তেজ কিংবা অকেজো হয়ে পড়বে।
রাতে আমি বাড়ি থেকে আর বেরোই না। তবে হঠাৎ করে ঘুম ভেঙে গেলে দেখেছি এক্স বাড়ির চারদিকে আলো জ্বেলে গন্ধ ছড়িয়ে বসে আছে। কখনও কখনও ওর বাদুড় কিংবা পাচা ধরার শব্দ শুনেছি। তবে এক্স-এর টেনট্যাকলগুলো এত দ্রুত কাজ করে যে, বেশিরভাগ সময়েই কোনও শব্দ শোনা যায় না–অথবা, খুব চাপা শব্দ হয়।
অনেক সময় মাটিতে চাবুক আছড়ানোর মতো সপসপ শব্দ শুনেছি। আন্দাজে আমার মনে হয়েছে, খিদের টানে এক্স-এর শুঁড়গুলো অস্থির হয়ে মাটিতে আছাড় খাচ্ছে।
এক্স-এর বড় বাড় বেড়েছে। যে করে হোক ওকে কন্ট্রোল করতে হবে।
ওর অ্যান্টিডোট আমাকে বের করতেই হবে।
আশার আলো দেখতে পাচ্ছি। এক্স-এর একটা অ্যান্টিডোট বোধহয় আমি বের করে ফেলেছি। সামনের শনিবার রাতে বাইরে বেরিয়ে অ্যান্টিডোটটা পরীক্ষা করব। তবে খুব সাবধানে আমাকে পরীক্ষা চালাতে হবে। কারণ, এক্স-কে বিশ্বাস নেই।
এটাই ডায়েরির শেষ লেখা। লেখাটার তারিখ প্রায় তিনমাসের পুরোনো।
ডায়েরিটা শব্দ করে বন্ধ করল টনি। শানদের দিকে মুখ তুলে তাকাল।
শান বলল, এরপর কী হয়েছে সেটা মোটামুটি বোঝাই যাচ্ছে।
টনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, হ্যাঁ, অ্যান্টিডোটটা কাজ করেনি। অথবা সোমেশ চ্যাটার্জি ভুল করে প্লান্ট এক্স-এর ফাঁদে পা দিয়েছেন। তারপর…।
তারপর আর ফিরতে পারেননি। হারা যেন টনির কথাটা শেষ করল।
টুনি বলল, চল, তাড়াতাড়ি রেডি হয়েনে…দেরি হয়ে যাচ্ছে।
টনি উঠে দাঁড়াল। ডায়েরিটা মেঝেতে রাখা কাগজের থাকের ওপরে রাখল। তারপর চাদরের চারটে খুঁট জড়ো করে গিঁট বাঁধতে লাগল।
টুনি, শান আর হারা গোছগাছের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
যেকরে হোক, একঘণ্টার মধ্যেই ওরা এ-বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়বে। তারপর খবর দেবে পুলিশে, খবরের কাগজে আর নানান টিভি চ্যানেলে।
যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সবাই জেনে যাক এই নিষিদ্ধ এলাকার কথা।
সত্যি, ওদের সামনে এখন অনেক কাজ।
রুদ্ধশ্বাস
হেডলাইটের আলো বাচ্চা মেয়েটার মুখের ওপরে একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
ফরসা ফুটফুটে অথচ ভয় পাওয়া মুখ। গাড়ির ঝাঁজালো হ্যালোজেন আলোয় একেবারে যেন ঝলসে যাচ্ছে।
চোয়াল শক্ত করে প্রাণপণে ব্রেক কষল শমিত। কালো পিচের ওপরে ঘষটে গেল গাড়ির চাকা। রবার পোড়া গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল বাতাসে। শমিতের পাশে বসা পাপিয়া এই-ই-ই বলে চেঁচিয়ে উঠে ভয়ে চোখ বুজে ফেলল। ওর শরীরটা সামনের উইন্ডশিল্ডের দিকে ছিটকে যেতে চাইছিল, কিন্তু সিট বেল্ট ঠিকমতো বাঁধা থাকায় সেটা এড়ানো গেল।
পিছনের সিটে বাপ্পার বসে থাকার কথা কিন্তু ও বসে ছিল না। ও দাঁড়িয়ে বাবা আর মা-কে সাতকাহন করে শোনাচ্ছিল, ও কটা লুচি খেয়েছে, কটা ফিশ বাটার ফ্রাই, কটুকরো মাটন আর কটা রসগোল্লা। ওর ফর্দ শোনানোর মাঝখানে ব্যাপারটা ঘটে যাওয়ায় ওর থুতনিটা সামনের সিটের একপাশে ঠুকে গেল।
বারাসাতে বিয়েবাড়ির নেমন্তন্ন খেয়ে ফিরছিল শমিত, পাপিয়া আর বাপ্পা। শমিত গাড়ি চালাচ্ছিল। তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার জন্য অ্যাকসিলারেটরে পায়ের চাপ একটু বাড়িয়েই দিয়েছিল। ফ্ল্যাটে ওদের পোষা কুকুর চ্যাম্প একা রয়েছে। যদিও ওর ঘণ্টা চার-পাঁচ একা থাকার দিব্যি অভ্যেস আছে, তা হলেও দুশ্চিন্তা একটা থাকেই।
এমনিতে ভি.আই.পি. রোডে গাড়ি-টারি একটু জোরেই যায়। তার ওপর রাত এখন প্রায় সাড়ে দশটা। সুতরাং রাস্তা সুনসান। শমিত বেশ মেজাজেই গাড়ি চালাচ্ছিল।
পাপিয়া একবার সাবধান করে বলে উঠেছিল, এত জোরে চালানোর কী হয়েছে। বাড়ি ফিরতে না হয় একটু দেরিই হল…।
শমিত পাপিয়ার কথার জবাব না দিয়ে ছেলেকে লক্ষ করে হেসে মন্তব্য করেছে, বাপ্পা, তোর মা ভয় পেয়ে গেছে। যো ডর গয়া।
সমঝো মর গয়া। বাবার অর্ধেক কথাটা শেষ করল বাপ্পা।
শমিত মাঝে-মাঝেই ঠাট্টা করে এই কথাটা বলে। তাই শুনে-শুনে বাপ্পার কথাটা মুখস্থ হয়ে গেছে।
সুতরাং রাত সাড়ে দশটার ভি.আই.পি. রোডের ওপরে শমিতের মারুতি আটশো বলতে গেলে বেপরোয়াভাবে উড়ছিল।
দমদম পার্ক পেরোনোর পরেই ঘটনাটা ঘটেছে। রাস্তার বাঁদিকের গাছপালার আড়াল থেকে বলতে গেলে আচমকাই ছুট্টে বেরিয়ে এসেছে মেয়েটা। শমিত পোড়খাওয়া ড্রাইভার না হলে মেয়েটাকে নির্ঘাত ধাক্কা মেরে বসত।
কিন্তু মেয়েটা ছিটকে পড়েছে রাস্তায়। স্টিয়ারিং-এ বসে ওর একটা পা শুধু দেখতে পাচ্ছিল শমিত। তা হলে কি ওর গায়ে ধাক্কা লেগেছে? গাড়ির ব্রেক কষার তীব্র শব্দে সংঘর্ষের কোনও শব্দ শমিতের কানে আসেনি। আর গাড়িতে বসে ঠিক বোঝাও যায়নি ধাক্কা লেগেছে কি না।
সিট বেল্ট খুলে তাড়াতাড়ি গাড়ি থেকে নেমে পড়ল শমিত। বাপ্পাও সর্দারি করে নামতে যাচ্ছিল, কিন্তু পাপিয়া ওকে ধমকে উঠল। বাপ্পা বিরক্ত হয়ে মায়ের দিকে তাকাল। ও ক্লাস এইটে পড়ে। এমন কিছু কচি খোকা নয় যে, বাবাকে একটু সাহায্য করতে পারবে না! কিন্তু মা সেটা বুঝলে তো!
