এক্স রাতে অ্যাটিভ হতে পেরেছে।
কাল রাতে ও একটা ইঁদুর ধরেছে।
আমি পাশের ঘরটাতেই ছিলাম। অন্য টুকিটাকি কাজে ব্যস্ত থাকলেও মন পড়েছিল ছাদের দিকে।
হঠাৎই একটা চি-চি গোছের চাপা শব্দ পেয়েই টর্চ নিয়ে ছুটে গেছি ছাদে। আলো ফেলেই দেখি এক্স একটা নেংটি ইঁদুরকে জড়িয়ে ধরেছে।
আলো পড়তেই এক্স-এর শুঁড়গুলো কেমন যেন থমকে গেল। তারপর বেশ ধীরে ওর কাজ শুরু করল।
কিন্তু আমি টর্চের আলো নিভিয়ে দিতেই এক্স-এর কাজের গতি আবার বেড়ে গেল।
আকাশে চাঁদ ছিল। চাঁদের আলোয় এক্স-কে আমি পর্যবেক্ষণ করে চললাম।
শেষ পর্যন্ত বুঝলাম, আলো পড়লেই এক্স কেমন যেন ঝিমিয়ে পড়ছে। আর অন্ধকার হলেই ও চঞ্চল, চনমনে হয়ে উঠছে।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ইঁদুরটা শেষ হয়ে গেল।
তা হলে কি এক্স-এর মধ্যে নকটার্নাল ক্যারেকটার ডেভেলাপ করছে? বুঝতে পারছি, আমার ইনজেকশান চালিয়ে যেতে হবে। থামলে চলবে না।
..আজ মন খুব খারাপ।
কারণ, এক্স বোধহয় মারা যাবে–আর ঠেকানো যাবে না।
ওর পাতা, শুঁড়, সব শুকিয়ে বাদামি হয়ে গেছে। শত চেষ্টা করেও আমি কিছু করতে পারছি না। আমার এতদিনের পরিশ্রম শেষ পর্যন্ত পণ্ডশ্রম হয়ে দাঁড়াল।
এক্স আর নেই। আমি ভীষণ হতাশ হয়ে পড়েছি। ওকে নিয়ে লেখা আমার রিসার্চ পেপারটা প্রায় কমপ্লিট হয়ে এসেছিল, এখন সেটা অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। ভেবেছিলাম, এই আবিষ্কারের কথা সারা দুনিয়াকে বেশ ঘটা করে জানাব। তারপর আমাকে নিয়ে কত হইচই হবে সারা পৃথিবী জুড়ে। সমস্ত আশায় এখন ঠান্ডা জল পড়ে গেল। ওই টবটার দিকে তাকিয়ে আমার কান্না পাচ্ছে।
অবাক কাণ্ড! এক্স আবার শিকার ধরেছে কিন্তু কীভাবে জানি না। কারণ, আজ সকালে দেখি এক্স-এর টবের মাটির ওপরে সবুজ রঙের পাখির পালক পড়ে আছে। পালকের রং দেখে মনে হল পাখিটা বসন্তবৌরী। কিন্তু পাখিটাকে মারল কে? আর তার দেহটাই বা কোথায় গেল?
যদি বেড়াল পাখিটা মেরে থাকে তা হলে পালকগুলোকে এত গুছিয়ে রেখে যেতে পারত না।
তা হলে কে?
এক্স-এর পাশের কোনও টব থেকে কোনও মাংসাশী গাছ এই অপকীর্তি করেনি তো? জানি না, এক্স-এর মধ্যে কোনও ছোঁয়াচে জীবাণু আছে কি না।
ভাবলাম, রাতে একটা পরীক্ষা করে দেখব।
রাত দশটা নাগাদ একটা ব্যাং নিয়ে ছাদে এলাম। এসে বেশ একটু অবাক হলাম। এক্স-এর টবের দিকটায় অন্ধকারে কয়েকটা আলোর ফুটকি দেখতে পেলাম। রঙিন আলোর বিন্দুগুলো স্থির হয়ে স্কুলে আছে। সেইসঙ্গে একটা গন্ধও আমার নাকে এল। গন্ধটা মিষ্টি পারফিউমের গন্ধের মতন। কেমন যেন নেশা ধরিয়ে টানছে।
আমি টবটার কাছে গেলাম। ঝুঁকে পড়ে দেখলাম। হ্যাঁ, এক্স-এর টবেই জ্বলছে আলোগুলো। আর গন্ধটাও মনে হল একটু জোরালো। কিন্তু এক্স তো এখন নেই। শুধু ভেজা মাটি পড়ে আছে।
আমি আর দেরি না করে ব্যাংটাকে টবের মাটিতে ছেড়ে দিলাম। সঙ্গে-সঙ্গে, বলতে গেলে চোখের পলকে, এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে গেল।
আমি চাঁদের আলোয় সবকিছু দেখতে পাচ্ছিলাম, তবে আবছাভাবে। তা সত্ত্বেও ঘটনাটা দেখতে কোনও অসুবিধে হল না। আমি পাথর হয়ে গেলাম।
এ কী দেখছি আমি!
ব্যাংটাকে টবের মাটির ওপরে ছাড়ামাত্রই কয়েকটা শুঁড় মাটি খুঁড়ে বেরিয়ে এল। চাবুকের মতো শিস তুলে জড়িয়ে গেল ব্যাংটার শরীরে। ব্যাংটাকে দেখতে হল অনেকটা সুতো জড়ানো লাটাইয়ের মতো। তারপর পাঁচ-দশ সেকেন্ডের মধ্যেই সব শেষ। ব্যাং উধাও হয়ে গেল। শুঁড়গুলো সড়সড় করে ফিরে গেল গর্তে।
ঘটনাটা আমাকে হতবাক করে দিলেও আনন্দ পেলাম এই কথা ভেবে যে, আমার পরিশ্রম শেষ পর্যন্ত তা হলে পণ্ডশ্রম হয়নি।
..গত কয়েকদিন আমার চিন্তা-ভাবনা কেমন যেন জট পাকিয়ে গিয়েছিল। এ কোন মারাত্মক গবেষণায় জড়িয়ে গেলাম আমি।
এ কটা দিন আমি রাতে ভালো করে ঘুমোতে পারিনি। বিবেকের তাড়নায় শুধু ছটফট করেছি। আমি কি আমার গবেষণা এখানেই থামিয়ে দেব, না কি আরও এগিয়ে নিয়ে যাব?
শেষপর্যন্ত আমার কৌতূহল জিতেছে। অথবা বলা ভালো, বিজ্ঞান জিতেছে।
এক্স-কে নিয়ে আমি আরও কয়েকবার পরীক্ষা চালালাম। ব্যাং, ইঁদুর, টুনটুনি পাখি এসব ছেড়ে দিয়ে দেখলাম।
দেখলাম, ফলাফল সেই একই। তবে শিকার ধরার সময় আলো ফেললে ও সঙ্গে-সঙ্গে থমকে যাচ্ছে। আলো কোনও-না-কোনওভাবে ওর কোশকে নিস্তেজ করে দিচ্ছে।
অর্থাৎ, আমি একটা ভয়ংকর নিশাচর শিকারি গাছ তৈরি করে ফেলেছি। কারণ, দিনের বেলা এক্স নিষ্কর্মা হয়ে থাকে, আর রাতে সজাগ হয়ে ওত পেতে থাকে।
রঙিন আলোগুলো ওর রাতের অ্যাট্রাক্টর-সূর্যশিশিরের শিশিরবিন্দুর মতো। আর মিষ্টি ওর গন্ধটাও আর-একটা অ্যাট্রাক্টর। রাতে এক্স আলো আর গন্ধ দিয়ে শিকারকে কাছে টানে। আর দিনের বেলা মাটির নীচে ও স্রেফ ঘুমিয়ে থাকে–মানে, ইনঅ্যাকটিভ হয়ে থাকে।
ছোট্ট এইটুকু টবে এক্স-এর বাহাদুরি রীতিমতো তাক লাগিয়ে দেয়। যদি এক্স বড় জমি পেত তা হলে নিশ্চয়ই আরও শক্তিশালী, আরও ভয়ংকর হয়ে উঠত।
আমার মনের মধ্যে একটা কৌতূহল মাথাচাড়া দিল। বাইরের ঘাস-জমিতে এই টবটা মাটি খুঁড়ে বসিয়ে দিলে কেমন হয়!
কয়েকটা দিন টানাপোড়েনে কাটার পর মনস্থির করলাম।
আজ সকালে আমি বাড়ির দরজা থেকে অন্তত দশমিটার দূরে এক্স-এর টবটা মাটির তিনহাত নীচে পুঁতে দিয়েছি।
